আপত্তিকর লেখালেখির অভিযোগে গ্রেফতারকৃত চার ব্লগারের বিরুদ্ধে গতকাল বুধবার তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনে প্রতিবেদন দাখিল করেছে গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। এর ফলে চার ব্লগারের বিরুদ্ধে আনিত অভিযোগের উপর বিচারের কাজ চলবে। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের ৯৭ (২) ধারায় ব্লগার আসিফ মহিউদ্দিনের বিরুদ্ধে ১টি এবং মশিউর রহমান বিপ্লব, রাসেল পারভেজ ও সুব্রত অধিকারী শুভকে আসামি করে ১টিসহ মোট ২টি প্রতিবেদন দাখিল করেন গোয়েন্দা পুলিশের পরিদর্শক মাইনুল ইসলাম। একই সঙ্গে বুধবার তারা জামিনের আবেদন জানালে তা নামঞ্জুর করা হয়। তবে চার ব্লগারকে ৫৪ ধারার অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে।
আদালত সূত্রে জানা গেছে, গত ১ এপ্রিল ভোররাতে মশিউর রহমান বিপ্লব, রাসেল পারভেজ ও সুব্রত অধিকারী শুভকে রাজধানীর পলাশী, ইন্দিরা রোড ও মনিপুরিপাড়া এলাকায় অভিযান চালিয়ে গ্রেফতার করা হয়। আসিফ মহিউদ্দিনকে গত ৩ এপ্রিল সকালে সেগুনবাগিচায় অবস্থিত তার বোনের বাসা থেকে গ্রেফতার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ ধারায় গ্রেফতার করে তাদের বিভিন্ন মেয়াদে রিমান্ডে নেয়া হয়। এর মধ্যে মশিউর রহমান বিপ্লব, রাসেল পারভেজ ও সুব্রত অধিকারী শুভকে সাতদিন এবং আসিফ মহিউদ্দিনকে দুই দফায় চারদিনের রিমান্ডে নেয়া হয়।
রিমান্ড শেষে গত ১০ এপ্রিল ঢাকার সিএমএম আদালতে হাজির করা হয়। সেদিন নতুন করে ডিবির পক্ষ থেকে রিমান্ডের আবেদন করা হয়নি। ওই দিন তাদের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মো. আলাউদ্দিন ও অ্যাডভোকেট প্রাণনাথ চার ব্লগারের জামিনের আবেদন করেন। জামিন আবেদনের শুনানি শেষে মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ এরফান উল্লাহ মামলার তদন্ত কর্মকর্তার উপস্থিতিতে গত সোমবার অধিকতর শুনানির জন্য দিন ধার্য করেছিলেন। সোমবার ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মাদ তারেক মাঈনূল ইসলাম ভূঁঞার আদালতে এ শুনানি শেষে ম্যাজিস্ট্রেট বুধবার আরও অধিকতর শুনানির দিন ধার্য করে ৫৪ ধারার মামলার বিষয়ে পুলিশি প্রতিবেদন দাখিলের আদেশ দেন।
গোয়েন্দা পরিদর্শক মাইনুল ইসলাম প্রতিবেদনে জানিয়েছেন, ব্লগে আসামিদের লেখালেখির বিষয়ে বিটিআরসি’র কাছে তথ্য চাওয়া হয়। বিটিআরসি’র সরবরাহ করা কাজগপত্রে আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত হয়েছে। তাই তাদের বিরুদ্ধে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনে বিচারের অনুমোদন চান তিনি।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, মশিউর রহমান বিপ্লব-ফেসবুকে আল্লামা ‘শয়তান’, সামহোয়ারইন ব্লগে ‘শয়তান’, নাগরিক ব্লগে ‘শয়তান’ এবং আমার ব্লগে ‘নেমেসিস’ ছদ্মনামে লিখতেন। রাসেল পারভেজ আমার ব্লগে ‘রাসেল পারভেজ’, সামহোয়ারইন ব্লগে ‘রাসেল’ ও ‘অপবাক’ ছদ্মনামে লিখতেন। সুব্রত শুভ সামহোয়ারইন ব্লগে ‘সাদা মুখোশ’, আমার ব্লগে ‘সুব্রত শুভ’, নাগরিক ব্লগে ‘আজাদ’ ও ইস্টেশন ব্লগে ‘লাল কসাই’ ছদ্মনামে লিখতেন।
আসামিরা ইন্টারনেট ব্যবহারের মাধ্যমে ইসলাম ও মহানবীসহ (স.) অন্যান্য ধর্ম সম্পর্কে কটূক্তি, ব্যঙ্গচিত্র ও অশালীন বক্তব্য প্রচার করে জনগণের ধর্মীয় অনুভূতিতে প্রচণ্ড আঘাত করে আসছেন।
মুক্তির দাবিতে ঢাবিতে ধর্মঘট
বিশ্ববিদ্যালয় রিপোর্টার জানান, গ্রেফতারকৃত তিন ব্লগারের মুক্তির দাবিতে আগামী ২৫ এপ্রিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ধর্মঘট ডেকেছে আন্দোলনরত শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। একই দাবিতে ১৮ এপ্রিল বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাজেয় বাংলার সামনে বিক্ষোভ সমাবেশ, কালো পতাকা উত্তোলন এবং ২৪ এপ্রিল সকালে অপরাজেয় বাংলার সামনে সমাবেশ ও সন্ধ্যায় ক্যাম্পাসে মশাল মিছিল কর্মসূচিও ঘোষণা করেছেন তারা।
গতকাল বুধবার বিকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাকসু ভবনের দোতলায় এক সংবাদ সম্মেলনে ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষক-শিক্ষার্থীবৃন্দ’র ব্যানারে এ কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়।
সাংবাদিক সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী জয়নাব শান্ত বলেন, মৌলবাদীদের দাবির মুখে তাদের খুশি করতে মুক্তমনা অনলাইন লেখকদের গ্রেফতার করা হয়েছে। তাদের মুক্তি না দিয়ে উল্টো এখন মামলায় ফাঁসানো হচ্ছে। লিখিত বক্তব্যে আরো বলা হয়, সরকারও যেন তাদের আচরণে ভীত। এই একটি বিশেষ কুচক্রি মহলকে সন্তুষ্ট করবার জন্য তারা যেন দেশের এই তরুণ প্রগতিশীল অনলাইন লেখকদের গ্রেফতার করেছে। এটি মুক্তবুদ্ধি চর্চার জন্য হুমকিস্বরূপ, গণতন্ত্র চর্চার জন্য, বিজ্ঞান, দর্শন, জ্ঞানের বিকাশের ক্ষেত্রেও অশনিসংকেত।
সংবাদ সম্মেলনে অন্যান্যের মধ্যে বাংলা বিভাগের অধ্যাপক রফিক উল্লাহ খান, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক রোবায়েত ফেরদৌস ও কাবেরী গায়েন উপস্থিত ছিলেন।
