বিজ্ঞাপনের ভাষা

মনোযোগ আকর্ষণের প্রয়াস

আপডেট : ১৮ এপ্রিল ২০১৩, ১৮:৫২
ভাষা মানুষের সামাজিক সম্পদ এবং সমাজ-বন্ধন সংহত করার অন্যতম হাতিয়ার। ভৌতিক হাতিয়ার যতটা না, তার চেয়ে বেশি মননের হাতিয়ার। যেকোনো হাতিয়ার ব্যবহারকারীর মতো ভাষারূপ হাতিয়ার ব্যবহারকারীও নানা ক্ষেত্রে, নানা পরিস্থিতিতে নানাভাবে ভাষা ব্যবহার করেন। বিজ্ঞাপন দেওয়া ভাষা ব্যবহারকারীর ভাষিক মানবীয় অধিকার (Linguistic human rights)। এসব ক্ষেত্রে ব্যবহারের পরিসীমা নির্ধারণ খুব একটা সুফল বয়ে আনে না। মানুষ সুবচনের মাধ্যমে যেমন সুরুচির পরিচয় প্রদান করে, তেমনি গালির মাধ্যমে কুরুচির পরিচয় অনাবৃত করে। বিজ্ঞাপনের ভাষা হচ্ছে মনোযোগ আকর্ষণের ভাষা। মনোযোগ আকর্ষণের কলাকৌশলের ওপর উত্পাদিত দ্রব্য ভোক্তার কাছে পৌঁছানোর বিষয় জড়িত। একেক বিজ্ঞাপনসংস্থা একেক রকম ভাষা, শব্দ, উচ্চারণ, অঙ্গভঙ্গি ও বাচিক মানসিকতায় ভোক্তার মনোযোগ আকর্ষণের চেষ্টা করে। ভাষিক ব্যবহারে বিজ্ঞাপনদাতা সংস্থার ভাষিক যোগ্যতার পরিচয় পাওয়া যায়। সুতরাং, কোনো একটি সংস্থার একটি বিজ্ঞাপনের ভাষায় কিংবা শব্দে, অর্থে কিংবা ইঙ্গিতে, সংজ্ঞায় কিংবা প্রজ্ঞায় বাংলাভাষার দীর্ঘপ্রতিষ্ঠিত অবয়ব সংগঠনে মারাত্মক কোনো ঝুঁকির সৃষ্টি করবে বলে আমার মনে হয় না। বাংলাভাষার দুটি অন্তর্নিহিত ক্ষমতা আছে; তার একটি হচ্ছে বর্জনের ক্ষমতা। বিভিন্ন সময়ে বাংলা ভাষায় অপ্রয়োজনীয় বিদেশি শব্দ এসেছে, আবার যুগের হুজুগ কেটে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেগুলো বর্জিত হয়েছে। যেমন পাকিস্তান আমলে উর্দুর চাপে পড়ে উজীর আজম, উজীরআলা, উজীরে খাজানা, সদরে রিয়াসত, পাক ওয়াতন, বেরাদরানে ইসলাম—এরকম অনেক শব্দ এসেছিল। একটি দৈনিক পত্রিকা ‘আজাদ’ এছলাম, একবাল, এরাক—এরকম অনেক অগতানুগতিক ও প্রথাবিরোধী শব্দের প্রচলন করতে চেয়েছিল। দীর্ঘদিনের চেষ্টার পরও সেগুলো প্রচলিত হয়নি। পাকিস্তান যুগের শেষ পর্যায়ে রাজাকার, আলবদর, আলশামস—প্রভৃতি শব্দকে সম্মানজনক অর্থে বাংলা ভাষায় প্রচলনের চেষ্টা হয়েছিল। এখন সেগুলো বর্জিত হয়েছে। শুধু তা-ই নয়, যখন ব্যবহূত হয় তখন অপরাধজগতের শব্দ হিসেবে ব্যবহূত হয়। এখনো যদি কোনো বিজ্ঞাপনসংস্থা কিংবা মিডিয়া অবাঞ্ছিত ও রুচিবিরোধী প্রকাশভঙ্গি প্রচলন করে তাদের বিজ্ঞাপনকার্য পরিচালনা করতে চায়, তারা তা করতে পারে। সামাজিক ঘৃণার বহিঃপ্রকাশ তাদের বর্জনে বাধ্য করবে। তাতে বাংলা ভাষা নামের যে ঐতিহাসিক শক্তি, তাকে পর্যুদস্ত করতে পারবে বলে মনে করার কোনো কারণ নেই। মনে রাখা দরকার, প্রায় দু-শ বছর আগে ইংরেজির হুজুগ এসে কলকাতার বাজার ছেয়ে গিয়েছিল। তারপর সমাজে প্রতিরোধ-প্রবণতা দেখা দেয় এবং একটি ইংরেজি শব্দ কথায় ব্যবহার করলে বন্ধুদের কাছ থেকে জরিমানা আদায়ের মতো স্বদেশি চেতনা জাগ্রত হয়। সেটা বাড়তে বাড়তে এমন অবস্থায় পৌঁছে যায়, যখন বিদেশি দ্রব্য বর্জন ও স্বদেশি আন্দোলন তুঙ্গে ওঠে। লোকজন বিদেশি দ্রব্য পোড়াতে শুরু করে। তারপর একসময় পাকিস্তানি মনোভাব প্রকাশ করার জন্য দোকানপাট, রাস্তাঘাট ইত্যাদির নাম উর্দুতে দেওয়া শুরু হয়; গুলশান, গুলবাগ, জিন্না এভিনিউ, আইউব গেট—তখন হতে শুরু করে। তারপর বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা হলে সেগুলো রাতারাতি বদলে যায়। আইউব গেট যেমন হয়ে গেছে আসাদ গেট, জিন্না এভিনিউ হয়েছে বঙ্গবন্ধু এভিনিউ। একসময় এরশাদ আর্মি স্টেডিয়াম নাম দিয়ে একটি স্টেডিয়াম তৈরি হয়েছিল। সরকার-পতনের পর প্রথম অংশটি বাদ দিয়ে নাম হয়ে যায় আর্মি স্টেডিয়াম। এখন আমাদের ইংরেজির হুজুগ চলছে, গ্লোবালাইজেশনের নামে এই হুজুগ সংক্রামক জ্বরের মতো সবাইকে স্পর্শ করছে। ‘কম্পিউটার বিচিত্রা’র প্রথম পৃষ্ঠায় ‘মোবাইল ফিক্সড ফোন’ এই বিজ্ঞাপন আছে। ভিডিও এডিটিং, কপিরাইট, বাংলা এসএমএস বিশ্ব, সাইবার গেমস, ব্যাংকক আইসিটি এক্সেল, ইকোকম—ইত্যাদি ছাপানো হয়েছে। এটি বাংলা ভাষার মূল শক্তিকে বিঘ্নিত করবে না; সাময়িক বিচলিত করবে। যখন বিজ্ঞাপনঅলাদের চৈতন্য ফিরে আসবে, ইংরেজির ‘গোলমালাইজেশন’ বা গ্লোবালাইজেশন শেষ হয়ে নতুন অধ্যায় শুধু হবে তখন। অনেকের আশঙ্কা অমূলক প্রতিপন্ন হবে। তবে একুশের চেতনার সঙ্গে যাঁরা সংলগ্ন আছেন, তাঁদের মতো অনেকেই সচেতন হচ্ছেন, তা পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিক্রিয়া থেকে বোঝা যায়। মনে রাখা দরকার, কোনো অস্বাভাবিকতা দীর্ঘদিন টিকে থাকে না। যুগের হুজুগ কেটে গেলে তখন এসব অরুচিকর বিজ্ঞাপনের ভ্রান্তির দিগ্ভূত যথাস্থানে ফিরে আসবে। বাংলা ভাষা বিজ্ঞাপনের ভাষার চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী, অনেক পরিব্যাপ্ত, অনেক দৃঢ়। সাম্প্রতিককালে বাংলাভাষার বিজ্ঞাপনে উপভাষার ব্যবহার যেমন লক্ষ করা যায়, তেমনি দেখা যায় শিষ্টভাষা বা প্রমিত ভাষার ব্যবহারও। তবে এও সত্য, অপভাষার প্রয়োগ কোনো কোনো ক্ষেত্রে জ্ঞাপনের কারণ না হয়ে বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষ করে যৌনতাপীড়িত বিজ্ঞাপনের রিরংসাখচিত ভাষার পাশাপাশি ‘আল্লার নামে ছলিলাম’ (চলিলাম) ‘আল্লাহ সর্বশক্তিমান’, ‘মায়ের দোয়া’—ইত্যাকার বাক্যাংশের ব্যবহার বড় বেমানান ঠেকে।