কেমন হবে উন্নয়ন-যোগাযোগের ভাষা? একবাক্যে বলা চলে, বোধগম্য ভাষায় উন্নয়নবার্তা দিতে হবে। গৃহস্থালী বর্জ্য এবং গো-মলমূত্র দিয়ে জৈব সার তৈরি করা যায়। এই বার্তাটি জটিল বাক্যে গঠিত। সাধারণ জনগণের বোধগম্য নয়। আমরা কি বৃক্ষ রোপণ করি, না বৃক্ষের চারা রোপণ করি? কিন্তু প্রায়ই বলি বৃক্ষ রোপণ সপ্তাহ। তাই বৃক্ষ রোপণ নয়, বৃক্ষের চারা রোপণ। জন্মনিয়ন্ত্রণ নয়, জন্মশাসন। দারিদ্র্য বিমোচন নয়, দারিদ্র্যকে সহনীয় মাত্রায় নিয়ে আসা।
‘ফলশ্রুতি’ শব্দের অপপ্রয়োগ ঘটে হরহামেশাই। যেমন— ‘সভা করতে না দেবার ফলশ্রুতিতে আগামীকাল ধর্মঘট ডাকা হয়েছে।’ ফলশ্রুতির প্রকৃত অর্থ এই বাক্যে কোনোভাবেই যায় না। কারণ ‘ফলশ্রুতির’ ভিন্ন একটি অর্থ রয়েছে, যা হিন্দু সম্প্রদায়ের দেবতার আরাধ্য বিষয়ের সঙ্গে যুক্ত। আসলে ফলশ্রুতি নয়, শব্দটির পরিবর্তে ‘এর ফলে’ ব্যবহার করাই সঙ্গত। ফতোয়া ও ফতুয়া—এই দুয়ের গোলমাল কথ্য ও লেখ্য উভয় ক্ষেত্রেই ঘটে। ফতোয়া ইসলাম ধর্মশাস্ত্র-সম্মত সিদ্ধান্ত বা রায় যা লিখিত ব্যবস্থা ও শাস্ত্রনির্দেশক। আর ফতুয়া গায়ে পরার জামা বিশেষ।
এ ছাড়া ফলার ও ফলাদি—এ দুয়ের পার্থক্যও লক্ষণীয়। ‘ফলার’ শব্দটি মূলত ফল + আহার। ভাত ছাড়া অন্য নিরামিষ দ্রব্য, দই, চিড়া ও দুধ বিভিন্ন প্রকার ফলাহার। ‘ফলাদি’ শব্দের অর্থ মূলত ফল গাছের বাগান। আমাদের কথ্য ভাষার রয়েছে দুটি রূপ—প্রমিত কথ্য ভাষা ও বিভিন্ন অঞ্চলের কথ্য ভাষা বা উপভাষা। প্রমিত ভাষার একটি নির্দিষ্ট প্লাটফর্ম আছে; কিন্তু উপভাষা? একেক অঞ্চলের ভাষা একেক রকম। চট্টগ্রাম ও নোয়াখালী অঞ্চলের ভাষা কারও কারও কাছে দুর্বোধ্য ঠেকে। একজন উন্নয়ন যোগাযোগকর্মীর অনেক সময় ভাষাগত সমস্যা থাকার কারণে অনেক ক্ষেত্রে সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে না। দুর্বোধ্য আঞ্চলিক ভাষা অনেক সময় যোগাযোগের ক্ষেত্রে বাধার সৃষ্টি করে। তাই অধিভাষাগত দক্ষতা (Paralinguistic skill) যোগাযোগকর্মীর থাকা প্রয়োজন। যে সমাজে উন্নয়ন যোগাযোগকর্মী কাজ করবেন, সে সমাজের ভাষা, পরিবার, সামাজিক অবস্থা, উত্পাদন সম্পর্ক শিক্ষা, সামাজিক জটিলতা, ধর্মীয় বিষয়, স্থানীয় রাজনীতি ও প্রান্তিকজন ইত্যাকার বিষয়ে উন্নয়ন যোগাযোগকর্মীর ধারণা থাকতে হবে। এ ছাড়া একটি বার্তা যোগাযোগকর্মী কীভাবে উপস্থাপন করবেন, সে বিষয়েও তার দক্ষতা থাকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
আনাতুলি দুব্রিলিন, সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের কূটনীতিক। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে রাষ্ট্রদূত হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রে কর্মরত ছিলেন। ধাপে ধাপে কর্মজীবনে পদোন্নতি হয়েছে তাঁর। স্টালিন তখন ক্ষমতায়। দুব্রিলিনকে তিনি বলেছিলেন প্রতি রোববার চার্চে যেতে। খ্রিষ্টান ধর্মযাজকগণ যে ভাষায় কথা বলেন, সে ভাষাটি আয়ত্ত করবে। কারণ, ভাষাটি সাধারণ মানুষের মুখের ভাষা। এটি Communicative Language (তথ্যসূত্র: আনাতুলি দুব্রিলিনের আত্মজীবনী)। সহজে কমিউনিকেট করার ক্ষমতা থাকতে হবে উন্নয়ন যোগাযোগকর্মীর। তাই উন্নয়ন যোগাযোগের ভাষা হবে প্রমিত ও সহজবোধ্য। কণ্ঠস্বরের ওঠা-নামা—ভয়েস ফলিং এবং ভয়েস রাইজিং যথাক্রমে নিম্নকণ্ঠ ও উচ্চকণ্ঠের ওপর দক্ষতা ও নিয়ন্ত্রণ থাকা চাই উন্নয়ন যোগযোগকর্মীর। একই কথা বিভিন্ন ব্যক্তি বিভিন্নভাবে উপস্থাপন করে শুধু কণ্ঠ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে।
বার্তা যেন মাঝপথে তথ্যবিভ্রাটের সৃষ্টি না করে, সে দিকেও উন্নয়ন যোগাযোগকর্মীর দৃষ্টি থাকা প্রয়োজন। ‘ঘোড়ায় চড়িয়া মর্দ হাঁটিয়া চলিল। কিছু দূর গিয়া মর্দ রওয়ানা হইল’—এ জাতীয় বক্তব্যে বিভ্রাটের সৃষ্টি হওয়াটা স্বাভাবিক। ‘সাগরের জলে স্নানে দেখি উচ্ছ্বাসে ভাসে রমণী’—এ জাতীয় কোনো বক্তব্য শ্রুত হবার ফলে কেউ যদি অন্যকে এভাবে বিষয়টি বর্ণনা করেন, ‘সাগর জলে স্নানে দীঘি, জ্বলে উচ্ছ্বাসে রমণী’ বর্ণনা সঠিক না হবার ফলে বক্তব্যের অর্থ পাল্টে যায়। ফলে মারাত্মক বিভ্রাটের সৃষ্টি করে।
মৌখিক বক্তব্যের পাশাপাশি লিখিত রীতি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বাক্যে অব্যয় পদের কথাই ধরা যাক। ‘কি’ অব্যয়ের ব্যবহার—‘কি আমির, কি ফকির, একদিন সকলকেই এই পৃথিবী ছেড়ে যেতে হবে।’ বিড়ম্বনা প্রকাশে ‘কী’ অব্যয়ের ব্যবহার—‘তোমাকে নিয়ে ‘কী’ মুশকিলেই না পড়লাম।’ বিস্ময় অর্থে ‘না’ অব্যয়ের ব্যবহার—‘কী করেই না দিন কাটাচ্ছ’। সম্ভাবনায়—‘তিনি নাকি ঢাকায় যাবেন।’ আবার ‘যেন’ অব্যয়ের ব্যবহার—‘মুখ যেন পদ্ম ফুল।’ তুলনায়—‘ইস! ঠান্ডা, যেন বরফ।’ নিরাশায়—‘আর’ অব্যয়ের ব্যবহার—‘সেদিন কি আর আসবে?’ বাক্যালংকারে—‘আর কি বাঁশি বাজবে?’
বাক্যে এই শব্দগুলোর ব্যবহারে সতর্ক হতে হবে। ‘মেঘের গর্জন গুড়গুড়’ আর সিংহের গর্জন ‘গরগর’। কেউ যদি বলে আকাশে মেঘের গড়গড় শব্দ শোনা যাচ্ছে কিংবা সিংহটি গুড়গুড় করে গর্জন করতে লাগল তবে সেটিও বিভ্রাট সৃষ্টি করবে। কয়েকটি শব্দের বিভ্রাট লিখিত ও মৌখিক উভয় প্রক্রিয়ায় ঘটে। ফলদ, বনজ, সুন্দরবন ও বান্দরবান। ফল দেয় যে বৃক্ষ ফলদ, ফলজ নয়। আবার বনে জন্মে যা বনজ। বাংলাদেশের জাতীয় বন সুন্দরবন; কিন্তু পার্বত্য এলাকা বান্দরবান।
বর্তমান যুগকে আইপিসি (IPC) বা ইন্টারপারসোনাল কমিউনিকেশনের যুগ বলা হয়। সরাসরি একজনের সঙ্গে অন্যের তথ্যভাব ও চিন্তার বিনিময় ঘটে এ জাতীয় যোগাযোগের মাধ্যমে। যোগাযোগের ক্ষেত্রে ভাষার মৌখিক ও লিখিত রূপ দুটিই সমান গুরুত্বপূর্ণ। বাক্যে অব্যয় সঠিকভাবে প্রযোগ না হলে অবশ্যই বিভ্রাটের সৃষ্টি হবে। কিছু দৃষ্টান্ত দেওয়া যাক, নূপুরের আওয়াজ রুমঝুম, চুড়ির শব্দ টুংটাং। মাথা ঝিমঝিম, বৃষ্টি ঝমঝম। ব্যাকরণের ওপর উত্তম দখল এবং ভাষার নৈপুণ্য অর্জনের মাধ্যমে একজন যোগাযোগকর্মীর যোগাযোগ-প্রক্রিয়া সহজতর হয়।
‘স’ কখনও ‘ছ’-এর মতো উচ্চারিত হয় না, আমরা একটু মনোযোগী হলেই ধরতে পারব। যেসব তত্সম শব্দের প্রথম অক্ষর ‘স’ সেই শব্দগুলোর উচ্চারণ প্রায়ই ‘শ’-এর মতো হয়। তবে সাধারণত ‘স’-এর উচ্চারণ ‘ছ’ হয়। সাহস, সৈনিক, সম্ভার, সাগর, সম্ভাষণ, সংশয়, সংবাদ, সংসার, সরণি, স্মরণ এই শব্দগুলোর উচ্চারণ ‘শ’-এর মতোই হয়।
উন্নয়ন যোগযোগকর্মীর জন্য সঠিক যোগাযোগ-পদ্ধতি হলো কর্তৃবাচ্য অনুশীলন করা। বাচ্য শব্দের অর্থ বলা। বাক্যে ক্রিয়াপদের সঙ্গে কর্তৃপদ বা কর্মপদের যে সম্পর্ক, তাকেই আমরা বাচ্য বলি। ‘তোমার দ্বারা কাজটি করিত হবে’ কর্মবাচ্যে না বলে ‘তুমি কাজটি করবে’ কর্তৃবাচ্যে বলাটা সঠিক ও সুনির্দিষ্ট হবে। ‘রহমান সাহেব কর্তৃক কিছু অর্থ সংগৃহীত হয়েছে’ না বলে যদি বলা হয়—‘রহমান সাহেব কিছু অর্থ সংগ্রহ করেছেন’, তবে কর্তার গ্রহণযোগ্যতা বাড়বে। ‘অত সামান্য দুঃখে কাঁদতে নেই’ ভাববাচ্যে না বলে যদি বলা হয়—‘অত সামান্য দুঃখে কেঁদো না’ তবে যোগাযোগটি সঠিক হয়। ‘আগামী সভায় আমার কিছু কথা বলতে হবে’ না বলে যদি বলা হয়—‘আগামী সভায় আমি কিছু কথা বলব।’ ‘আপনার কোথায় থাকা হয়’ না বলে যদি জিজ্ঞেস করা হয়—‘আপনি কোথায় থাকেন’—তবে এই জানাজানি এবং বলাবলি অনেক বেশি যোগাযোগভিত্তিক হবে। একজন উন্নয়ন যোগযোগকর্মীর ভাববাচ্য কিংবা কর্মবাচ্য পরিহার করে কর্তৃবাচ্য অনুশীলন করাটা অনেক বেশি শ্রেয়।
