আদিম পরিধিপাঠ

আপডেট : ১৮ এপ্রিল ২০১৩, ১৮:৫৩
পাঠের ক্ষেত্রে অক্ষরজ্ঞান যেমন জরুরি, তেমনি ছবির ক্ষেত্রে তল-অতল। সেখান থেকে তুলে আনতে হয় সেই কৌটো, যেখানে আটকে থাকে শিল্পের প্রাণভোমরাটি। মনোয়ার মেহেদির ছবির এই প্রাণভোমরা বাহ্য আচার-আচরণের অধীন। যার সবকিছুই স্বাভাবিকভাবে দৃশ্যগত কিন্তু সেটা আটকে আছে খাঁচার জালে। দর্শকের বাড়তি শ্রমের দরকার নেই। খাঁচা খুলে পাখিটিকে উড়িয়ে দিতে চাইলে খাঁচার চাবির দরকার। মনোয়ার মেহেদির কাজের সামনে দাঁড়ালে জটিলতায় পড়তে হবে না। কারণ, বিশ্বজুড়ে আধুনিকতার নামে যে মাকড়সার জাল বোনা হয়েছে শিল্পের অছিলায়—যার রয়েছে নানা কানাগলি, অলিগর্কি এবং জটিলতর অন্ধকারময়তার পথ—নিতান্ত সরল মনে ঠিক সেই পথ পরিহার করে চলেছেন মেহেদি। অন্ধকার দেখানো যাঁর কাজ নয়, আলোর ভেতর অন্ধকার এবং সেই অন্ধকার কীভাবে আলোকে নিরন্তর ঢেকে রাখছে মায়ার খেলায়, তা-ই তিনি দেখিয়ে চলেছেন। কতক ক্ষেত্রে আমরা দেখতে পাই, ছবির বিষয়বস্তু বর্তমান কিন্তু সেটা যে অবয়বে হাজির হচ্ছে, সেই হাজির হওয়ার ধরনটাই জীবনানন্দের ভাষায় ‘হাজার বছর ধরে পথ হাঁটা’র অভিব্যক্তি। বর্তমান থেকে অতীতকে স্মরণে রাখার বিবিধ কৌশল। রেখা ও রঙের বিন্যাসে বোধের যে বিস্তৃতি মনোয়ার মেহেদির কাজে, সেখানে মোটাদাগে তিন প্রকার অভিব্যক্তি দর্শকের নজরে এসেছে। খুঁটিয়ে দেখলে আরও ব্যাপকতার সন্ধানও পাওয়া যাবে। এসব ছবিতে রয়েছে শৈশবের স্মৃতি। আত্মমগ্ন পিতার কাঁধে আসমান দর্শনরত পুত্রের চাঁবদন। ‘উইথ মাই ড্যাড’ বা ‘বাবার সাথে’ ছবির ড্রইং আমাদের ঐতিহ্য থেকে দূরত্বে সরে যাওয়া নয়। ‘ফগি মর্নিং’, ‘অন দ্য ওয়ে’ এবং ‘ব্যাক টু হোম’ ছবিতে রঙের বিশেষত কড়া, উজ্জ্বলতা, ফিগারগুলোর বৈশিষ্ট্য আমাদের পরিচিত। নিন্মবর্গীয় মানুষদের ব্যবহারিক উপাদানের সাথে লোকজ বর্ণের সংস্থাপন কিংবা এই যে মানুষগুলোর জটলা—এসব অর্থনীতির গণ্ডী পেরিয়ে একপ্রকার সাংস্কৃতিক মনস্কতার স্বীকৃতিও বটে। পূর্বসূরি হিসেবে আছেন শিল্পী দিপা হকের কাজগুলো। এ সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে শিল্পী বলেন, ‘মিথিক্যাল সাবজেক্টগুলো বাদে অন্য যে ছবি আমি এঁকেছি, তাদের জীবনের সাথে আমার দূরত্ব নেই। আমি এই শ্রেণীর মানুষদের সাথে মিশেই চলি নানাভাবে, নানা স্তরে। ফলে তাদের রুচি, তাদের মনন সম্পর্কে আমি জানি। নাগরিক-মন নিয়ে যে এদের ছবি আমি এঁকেছি, তাও না। তাদের জীবনসংগ্রামের শক্তিটা কোথা থেকে আসে—সেসব আমার জানা আছে বলে ছবিতেও ওভাবে এসেছে।’ মনোয়ার মেহেদির অনেক কাজ এই প্রদর্শনীতে রয়েছে, যেগুলো দেখলে পৌরাণিক ঘটনাবলির কথা মনে পড়ে যাবে। যেমন ‘ওয়ার্ল্ডলি লাইফ’, ‘ডাবল ফেস’, ‘টুয়েন্টি অ্যান্ড টেন মেক থার্টি ’ এই ছবিগুলোর কম্পোজিশন বহুমাত্রিক। কখনো ব্রহ্মার কখনো বা নটরাজের মতো মনে হলেও এই ছবির অর্থদ্যোতনা ভিন্নতর। ছবিগুলোতে মুদ্রার ব্যবহার আছে। ভরতের নাট্যশাস্ত্রে কিংবা বিবিধ পুরাণে নৃত্যকে চিত্রকলা শিক্ষার পূর্বশর্ত করা হয়েছে। শিবের মতো জটাবাঁধাচুল, তিলক কিংবা মুদ্রাভঙ্গিমার সাথে চাঁদের ব্যবহার অসাধারণ। ‘একমেবদ্বিতীয়ম’ যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে মুখাবয়বের বিবিধ প্রকাশবাদিতা। এ প্রসঙ্গে শিল্পীর বক্তব্য খুব স্পষ্ট। তিনি বলেন, ‘আমার ছবিতে মিথলজির একটা আবেশ আছে ঠিকই কিন্তু তা সরাসরি কোনো মিথলজির কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে না। শুধু আবেশটাই মিথলজিক্যাল। ট্রিটমেন্ট দেখে মনে হয়, এটা বুঝি মিথলজিক্যাল। যে উপকরণগুলো এসেছে, যেমন পদ্মফুল বা তিলক—এগুলোর সাধারণ ব্যবহার্য ক্ষেত্র মানুষের জানা আছে। বিবিধ জায়গায় এর ব্যবহারও দেখা যায়।’ বিন্যাসের ক্ষেত্রে চমত্কার একটি কাজ হচ্ছে ‘প্রিমিটিভি কাল্টিভেটর পটার ওয়েভার অ্যান্ড কুক’। এই ছবিটিতে দেখা যাচ্ছে, রান্নার সরঞ্জাম ডান হাতে আর বাঁ হাতে ধানের ছড়া এবং মাথায় কলস বহন করে চলেছে এক চিরন্তন বাঙালিয়ানা রূপের নারী। এ প্রসঙ্গে শক্তি আরাধনার সেই বিখ্যাত সূত্রটিই স্মর্তব্য, ‘যা দেবি সর্বভূতেষু/ শক্তিরূপেণ সংস্থিতা’। ‘প্রিমিটিভ পেরিফেরি’ শিরোনামের শিল্পাঙ্গন গ্যালারিতে ১৩ এপ্রিল শুরু হওয়া এই প্রদর্শনী শেষ হবে আজ।