আজও কমলা আসেনি?
—না। হোসনা বানুর নির্বিকার উত্তর। এই হোসনা বানুর উত্তরের ওপর নিশ্চিন্তে ভরসা করা যায়। আজ প্রায় দশ বছর হোসনা বানু এ বাড়ির রান্নাঘর এবং অন্যান্য বিষয়ের তদারক করছে দম্ভের সাথে। গৃহকর্তা বাঘা মোল্লার পেশাহীন জীবনের অনেকটা নির্ভরশীল গৃহকর্মী এই হোসনা বানু। কারণ গৃহকর্তা অর্থাত্ বাড়িঅলা সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত যেদিকেই তাকান, সেদিকেই হোসনা বানুর সরব উপস্থিতি। কর্তামাকে সন্তুষ্ট রাখার যাবতীয় কৌশল ওর আয়ত্তে। এ নিয়ে গৃহকর্ত্রীর অভিমত নিস্পৃহ। জমাট ধরা বরফের মতো। ছয় সদস্যের এ সংসারে বাঘা মোল্লার সাথে তাঁর স্ত্রী মেহেরোজ, দুই কন্যা রমিতা ও হূদিতা, একমাত্র পুত্র আনন্দর কোনো রকম সংঘাত নেই। এরা সবাই নিজ নিজ ক্ষেত্র তৈরি করে বাস করছে এ সংসারে। মাঝে মাঝে বাড়িঅলা বাঘের মতো হুংকার ছাড়েন—ভুইল্লা যাইয়ো না কেউ, আমার বাড়িতেই কিন্তুক থাকতাছ। পরস্পর মুখ চাওয়া-চাওয়ি করে যে যার ঘরে চলে যায়। এভাবে এদের মধ্যে একটি চোরা ফাইল তৈরি হয়ে গেছে। আর এ ফাইল ঘেঁষেই এসে দাঁড়িয়েছে হোসনা বানু। মেহেরোজ একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের পরিচালকের দায়িত্বে আছেন দশ বছর। তিন সন্তানই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছে। এরা চারজনই বেশির ভাগ সময় বাড়িছাড়া। বাঘা মোল্লা ছ-তলা বাড়ির ভাড়া দিয়েই চলছেন দাপটে। সংসার খরচ যেটুকু ইচ্ছে করেন তিনি। বাকিটুকু মেহেরোজ চালিয়ে নেন। টুঁ-শব্দটুকু করেন না। মধ্যস্থতা করে কেবল হোসনা বানু। আগে এক হাতেই সংসারের কাজগুলো করত সে। একদিন ঝোপ বুঝে কোপ মারল—না খালু, রান্ধার কাম ছাড়া অন্য কাম আর করতে পারতাছি না।
—তা তো অবশ্যই। তোমার তো এখন প্রমোশন দরকার। হূদিতা নিচুস্বরে বলল, যাতে ও শুনতে না পায়।
অতএব মেহেরোজ বাড়ির উল্টোদিকের বস্তি থেকে কমলাকে ছুটা বুয়া হিসেবে নিয়োগ দিল। কমলা অবশ্য অন্যান্য ছুটা বুয়াদের মতো ছুটে ছুটে বেড়ায় না। কোনো বাসায় বেশিদিন টেকেও না। কেউ অবশ্য ওকে রাখতেও চায় না বিপদে না পড়লে।
ওর বয়স ঠিক কত হবে, আন্দাজও করা যায় না ওকে দেখে। উচ্চতা প্রায় ছ-ফুট। পুরুষের মতো। এত লম্বা মেয়েমানুষ খুব কমই চোখে পড়ে। মই ছাড়াই ঘরের ফ্যান পরিষ্কার করতে পারে। দু-পাটি দাঁতের মধ্যে ওপরের মাড়ির চারটে নেই। নিচের মাড়ির তিনটে নেই। ওর অসুখ একটাই—দাঁত ব্যথা; কখনো মাথা ব্যথা। সারাক্ষণই কপালের দু-পাশে স্যালোনপাস লাগানো থাকে। যেদিন দুটো ব্যথা একসাথে চাড়া দেয়, সেদিন নির্ঘাত কাম-কামাই। তবে ঘরে থাকবে না সে। গলির মুখে লম্বা বাঁশের খুঁটি হয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে। ও যে একটি মেয়েমানুষ, ওর বোধকরি তা মনে থাকে না। লম্বা, ঢ্যাঙা শরীরে বুকে-পিঠে কোথাও মাংস নেই। চোয়াল ভাঙা। চোখ দুটো গর্তের ভেতর। মুখের হাঁ-টা বেশ বড়। চুলগুলো ঠিক শুকনো পাটের আঁশের মতো। মোট কথা, মেয়েলি শ্রী বলতে কিছুই নেই। কণ্ঠস্বরও বড় বেশি কর্কশ। দাঁড়কাকের মতো। কোথাও কোনো বাড়িতে লাগা বাঁধা কাজ ওর ধাতে সয় না। সারা দিন পথে পথেই হেঁটে বেড়ায়।
অফিস থেকে আসার পথে মেহেরোজকে দেখলেই দৌড়ে আসে—মা, মা, কী বা আছুইন মা। শরীলডা বালা...এত শুকাইছুইন ক্যা গো, মা।
হাতে ব্যাগটা কেড়ে নিয়ে বলে—আমি নিই মা, আমি নিই। আনাজপাতি কত কিছু আনছুইন...। সিঁড়ি বেয়ে উঠতে উঠতে ওর বড় হাঁ-টা আরও বড় হয়ে যায়। মেহেরোজ ভাবে—হাসবে না কাঁদবে এখন। কমলা খ্যাক খ্যাক শব্দ করে বলে—অ-মা, অ্যাডা কতা, রাগ করুইননা জে, কমু? কমু, মা?
—বলো।
—ইবার গরুর বটটা আমি নিমু কয়া রাখলাম। নজু শখ করছে, বট খাব।
—ঠিক আছে। সময় হোক, দেখা যাবে।
কমলার কণ্ঠে পোষা বেড়ালের আহ্লাদ—আমি কিছু বুঝি না। দিতে অবই...। খালুজানরে কয়া থুয়েন।
—তুমিও একসময় বলে রেখো তোমার খালুকে।
কমলা সটান দাঁড়িয়ে গেল—অম মা, কয় কী! হের কাছে গোবরও চাওন যাব না।
মেহেরোজ প্রসঙ্গ পাল্টে বলল—শোনো, কাল থেকে আমার বাড়িতে ছুটা কাজ করবে, হোসনা একলা পারে না এখন।
—কন কী করা লাগব, মা।
—ঘর মোছা, সিঁড়ি মোছা। কাপড় কাচা আর বাথরুম ধোয়া।
কমলা গম্ভীর হয়ে বলল—চাইর কাম। দুই হাজার মাসে দিবেন।
—ঠিক আছে, নিয়ো।
—কহন আমু, মা?
—আটটার মধ্যে তো অবশ্যই।
—ঠিক আছে মা, আমু আমু...। এইবার আর নাগা দিমু না। নজু তো আবার গরে বইয়া গেল। কাম নাই। অহন তো মায়-পুতে উপাস...।
পরদিন কমলাকে ঘরে ঢোকানো নিয়ে বাড়ির প্রতিটি সদস্যরই ঘোর আপত্তি শুরু হয়ে গেল। আজ প্রায় পনেরো বছর ধরে ওকে চিনেছে সবাই। ভ্যারাইটি হাউসের বস্তিতে ওরা থাকে সেই তখন থেকেই। অনেক বোন ওরা। ছয়-সাতজন তো হবেই। সবার গড়ন আর চেহারা একই রকম। দেখলেই বোঝা যায়, ওরা সহোদরা। কমলাই বড়। ছোটগুলো খুব চালাক-চতুর, সেয়ানা। অন্য পাড়ায় তিন-চারটে বাড়িতে কাজ করে সন্ধ্যায় বস্তিতে ফেরে। সবারই স্বামী-সন্তান আছে। কখনো সিঁড়ির ধারে-কাছেও আনা যাবে না ওদের। কেবল সাতাশ রোজার পরদিন কমলাকে সাথে নিয়ে ছ-বোন ছ-তলার সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে যাবে—আমাগো তো দেওনই লাগব খালা, আমরা তো আশায় থাকি। বছরে একটা টাঙ্গাইল শাড়ি আফনে ছাড়া ক্যারা দেয়, কন?
অগত্যা মেহেরোজ ছ-বোনকে ছটা শাড়ি আর ছ-শ টাকা দিয়েই বিদায় করে। এটা যেন ওদেরই প্রাপ্য। প্রতিবছর ওরা পাবেই। কমলাকে রাখা নিয়ে আবার ছেলেমেয়েরা আপত্তি জানায়।
—ও তো ঠিকমতো আসে না, মা। আবার ওকে রাখলে?
—ওকে চা না খাওয়ালে ও তোমার কাজই করবে না, দেখো।
—ওর মাথা ব্যথা আর দাঁত ব্যথার ওষুধ কিনে রাখতে হবে তোমাকে, মনে রেখো।
—এই বেডি যদি একদিন না আসে, আমি কিন্তু বেতন কাটুম। পয়সা গাদার গোয়া দিয়া আসে না।
ছেলেমেয়েদের মতামতের সাথে শেষোক্ত গৃহকর্তার অশ্লীল উক্তিটি বড় বেশি উলঙ্গ শোনাল মেহেরোজের কাছে।
তবু সে কমলাকে পছন্দ করে। কারণ কমলা চুরি করে না। খিদা লাগলে চেয়ে খাবে। কাজ খুব পরিষ্কার করে করবে। আগাম টাকা চায় না বড় একটা। চোদ্দ বছর বয়স না হওয়ার আগেই একটিমাত্র ছেলে সন্তান নজরুলকে কোলে নিয়ে জামালপুর থেকে সোজা কমলাপুর স্টেশনে। দু-বছর বয়সী শিশু নজরুলকে রাস্তায় গাছতলায় বসিয়ে আশপাশের দোকানে কলস ভরে পানি দেওয়ার কাজ করত। তারপর একদিন ওর মা আর বোনেরা ওর খোঁজে ঢাকায় আসে। স্টেশনে নেমেই ওদের সাথে দেখা। তারপর হয়তো জোয়ারের জলের মতো ভাসতে ভাসতে এই ভ্যারাইটি হাউসের বস্তিতে ওরা সবাই মিলে থিতু হলো। নজরুলও শিশু থেকে যুবক হলো। প্রথমে কিছুদিন আনারকলি সুপার মার্কেটে দোকান ঝাড়-পোছের কাজ করত। সাহেবদের রেখে যাওয়া গাড়িগুলো নিজে থেকেই বুদ্ধি করে মুছে দিয়ে দু-পাঁচ টাকা রোজগার করত। ওই গাড়ি মুছতে মুছতেই একদিন ড্রাইভিং স্কুলে ভর্তি হলো। গাড়ি চালানো শিখল। মেহেরোজের আজও মনে পড়ে, একবার নজরুলকে লাইসেন্স করার জন্য দু-হাজার টাকাও দিয়েছিল। প্রথমে তো কাজ পেল—হেলপার। তারপর একদিন ওস্তাদ। একবার ঈগলের গাড়ি চালাতে গিয়ে ঢাকা-যশোর রুটে ডিসেম্বরের রাতে কুয়াশায় দিগ্ভ্রান্ত হয়ে একটি বড় গাছের সাথে ধাক্কা লেগে গাড়িটি উল্টে সোজা খাদে পড়ে যায়। কোনোভাবে নিজেকে রক্ষা করে একটি ধানক্ষেতের ভেতর মরার মতো পড়ে ছিল নজু। হতাহতের সংখ্যা খুব বেশি না হলেও চালক নিখোঁজ ছিল তিন মাস। মাগুরার একটি হোটেলে ছদ্মবেশে কাজ করত নজরুল। বাড়ির সাথে যোগাযোগ রাখেনি। তখন কমলার কান্নায় গাছের পাতা আসলেও ঝরত। পথচারী ওর বিলাপ শুনে দাঁড়িয়ে যেত। ছেলের জন্য কাঁদতে কাঁদতে কমলা একরকম বৃদ্ধই হয়ে গেল। একদিন ছাদ ঝাড়ু দেওয়ার জন্য মেহেরোজ কমলাকে গলির মোড় থেকে ধরে আনল। ছাদ ঝাড়ু দেওয়া শেষ করে কমলা নিজেই ইচ্ছে করে সিঁড়িটাও ছ-তলা থেকে নিচ পর্যন্ত পরিষ্কার করে দিল। মেহেরোজ খুশি হয়ে ওর হাতে একশ টাকার নোট গুঁজে দিয়ে বলল—ভাত খেয়ে যাও।
কমলা বোয়াল মাছের মতো হাঁ করে হাসল—বাত দিবাইন? মেহেরোজ রান্নাঘরে গিয়ে হোসনাকে বলল—ওকে ভাত দাও। একটু পর হোসনা ছুটে গেল শোবার ঘরে—ও খালাম্মা, বাত বলে খাব না। হোসনার খনখনে কণ্ঠটা শুনে একটু বিরক্ত হলো মেহেরোজ—কেন?
—কে কইব! মাছ-তরকারির দিগে একবার দেইখখাই উইঠা গেল। কইল, আর একদিন খাইব...। হোসনা হাসছে। মেহেরোজের খুব রাগ হলো ওর হাসি দেখে।
সেদিন শনিবার। ছুটির দিন। মেহেরোজ হাঁটতে গেছে রমনা পার্কের ভেতরে। এক চক্কর শেষ করে একটি ছোট চক্কর দিতে গিয়ে দেখল, রেস্তোরাঁটার কাছাকাছি একটি বেঞ্চের ওপর মাথায় ঘোমটা দিয়ে বিবি হয়ে বসে আছে কমলা। কালো কালো জামফলের মতো টুপটাপ করে সন্ধ্যা নামছে। মাত্র পাঁচটা পনেরো। মনে হয় অনেক রাত হয়ে গেছে। দিন ছোট হয়ে আসছে মানুষের মনের মতো। রাত বড় হচ্ছে। মানুষের মন কিন্তু বড় হচ্ছে না। রাতের মতো। মেহেরোজ হাঁটার গতি থামাল। শ্লথ গায়ে কমলার কাছে গেল—কী রে, এখানে কেন?
কমলা ধুড়মুড় করে উঠে দাঁড়াল। ভূত দেখার মতো একটু যেন চমকে উঠল। তারপর তার সেই চিরচেনা হাসি। দন্তহীন মুখের বিশ্রী রকমের হাঁ।
—মা, মা হুনুইন। আমার কুনো দুষ নাই। আমাগো বস্তির টোকানির বাইর বেটি কইল, এ গরের বিতরে বড় নোকেরা রুটি আর মুরগি ভাজা খায়। এক টুকরা লাল মোরগের... কমলাকে থামিয়ে দিল মেহেরোজ।
—উঠো। উঠো তো, রাত হয়ে যাচ্ছে। বাসায় চলো।
—হ হ চলেন, চলেন। আমি তো আইবারই চাই নাই। খালি...। কমলা মেহেরোজের পেছন পেছন হাঁটতে শুরু করল। অফিসার্স ক্লাব পার হয়ে বেইলি রোডে ঢুকে মেহেরোজ কমলাকে জিজ্ঞেস করল—আচ্ছা তোমার স্বামী আছে না কি?
—বালাই ষাট। মরে নাই।
—থাকে কোথায়?
—দ্যাশে।
—তোমার কোনো খোঁজ নেয় না?
—আমি হইজ করতে দিই না। হতিনের সংসার।
—সংসার ছাড়লা কেন?
—ছাড়ুম না তো কী। আমি দুইডা মুরগা পালতাম। লাল মুরগ। নজু তহন আমার প্যাডো। একদিন হতিনের বাপ-মাও ভাই-বইন বেবাকডি আইছে। আর আমার হতিনে আমার মোরগা দুইডারে জব কইরা হ্যাগারো গরম বাত রাইন্ধা খাওয়াইছে। লাল লাল ঝুল কইরা মোরগডি রানছে—আমারে একটুকরা গোশতও দেয় নাইক্কা। আমি রাইতে কানতে কানতে হ্যারে কইছি দেইখ্যা স্বামী আমাকে নাথতি মারছে। পরদিন বিয়ানেই বারাইছি। আইজও যাই নাই। ছগল ফালাইয়া হাঁটা দিছিলাম। নজরুলের পয়দার খবরও পায় নাই। লয়ও নাই।
কমলা ভেউ ভেউ করে কাঁদতে শুরু করল। মেয়েমানুষের জীবনের অন্ধকারের কাহিনি রাস্তার আলো-আঁধারিতেই শুনল মেহেরোজ। ওর কান্না থামাতে বলল না। কাঁদুক। কার যে কোথায় কতটুকু কষ্ট ঘাপটি মেরে থাকে, বোঝা যায় না। কমলা লম্বা লম্বা পা চালিয়ে হাঁটছে মেহেরোজের পেছনে। ওর চোখের-নাকের পানি মোছার শব্দ পাচ্ছে। তবু চুপ। কিছু বলার মতো কথা মনে এল না। বাড়ির কাছাকাছি এসে শুধু বলল—যাও। ঘরে যাও। সকালে চলে এসো। আমি কিন্তু সোফার কভার ভিজিয়ে রাখব রাতে।
—ঠিক আছে মা, ঠিক আছে, বলেই কমলা বস্তির সরু ফিতার মতো লম্বা গলিতে ঢুকে গেল। মেহেরোজ ছ-তলার কলিংবেল টিপল।
পরদিন সকালে গামলা ভর্তি করে কাপড় ভিজিয়ে রেখে মেহেরোজ ফাঁপরে পড়ে গেল। বেলা প্রায় এগারোটা। কমলা তো আসছে না। হোসনা বানু গজগজ শুরু করল—এত কাপড় আগেই বিজাইলেন ক্যান। অয় না আইলে ক্যাডা ধুইব। আমি কিন্তুক পারমু না।
মেহেরোজ ওর কথার কোনো উত্তর দিল না। সহ্য করে গেল। নইলে আজ না খেয়েও থাকতে হতে পারে। রান্না করবে না বজ্জাতটা। এদিকে অফিসের সময়ও... সাত-পাঁচ ভেবে মেহেরোজ নিচে নামল। বস্তিতে ঢুকবে কি না, ভাবতে লাগল। একবার ডাইনে-বাঁয়ে তাকাতেই চোখে পড়ল, কালীমন্দিরের দিক থেকে একটা হুড খোলা রিকশার ওপর দুটি চালের বস্তায় পা তুলে বসে কমলা হাসতে হাসতে এদিকেই আসছে। ওকে দেখে মনে হলো মহারানি স্বর্গে উঠেছে। মেহেরোজকে দেখেই গলা চড়িয়ে বলল—আইমু মা, অহনই আইতাছি। মুনির সাবের বৌতে দুই মণ চাইল কিন্না দিবার কইল। রামপুরাত্থন কিন্না আনলাম। লাল মোরগ জবাই দিব তো। জ্যাফত খাওয়াইব। বাপ-মার নামে।
মেহেরোজ ওপরে উঠে প্রথমেই অফিসে ফোন দিল। আজ সে লাঞ্চের পরে আসবে। মনে মনে ভাবল, যদি আজ কমলা দাঁত ব্যথার অজুহাতে না আসত, এই কাপড়গুলো ওকেই ধুতে হতো। কোনো বিকল্প নেই। একটি ওয়াশিং মেশিন কেনার জরুরি প্রয়োজন আজকেই যেন মনে হচ্ছে। কাজের লোকের দুষ্প্রাপ্যতা আজ জাতীয় সমস্যার মতো প্রকট হচ্ছে। নগরবাসীর কোনো হুঁশ নেই। এ সমস্যাটি সমাধানের জন্য কোনো উপায় কেউ বের করছে না। গবেষণাও হচ্ছে না। আসলে সমস্যাটি কেবলমাত্র মহিলাদেরই ফেস করতে হয়। অবশেষে কমলা এল। হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এল। অপরাধীর মতো মুখ নিচু করে বলল—আরটু আগেই আইতাম। নজু কইল, মা, চাইরডা বাত দে, খায়া কামে যামু। জব্বর কাম পাইছি একটা। ভাত রাইন্দা দিয়া আলাম তো...
—তোমার ছেলেকে বিয়ে দাও না কেন? মেহেরোজ কমলার মুখের দিকে তাকাল।
—হ মা, এই বৈশাকেই বিয়া করাইয়া দিমু। মেয়া দ্যাকতাছি। জ্বালা অইছে, নজু আবার একটা ছেঁড়িরে মহব্বত করে।
—তো তার সাথেই বিয়ে দিয়ে দাও।
—কী কন মা, সুখীর সামনের দাঁত উঁচা। নজুরও সামনের দাঁত উঁচা। দুইজনে উঁচা দাঁত নিয়া বিয়ার পর চুমাচুমির সুময় কার দাঁত দিয়া কার ঠুঁট কাটে। অক্তাওক্তি অয়। হ্যাশে থানা-পুলিশ ক্যাডা করব, কইনচে। মেহেরোজ অনেক দিন পর শব্দ করে হাসল—তুমি তো কম রসিক না, কমলা!
সমস্ত কাজ শেষ করে কমলা যখন যাবার জন্য কাছে এসে দাঁড়ায়, মেহেরোজ বলে—শোনো, তিনবেলা খাবার অভাবে তোমার শরীরটা অসুস্থ থাকে। এক কাজ করো, তুমি রোজ দুপুরে আমার এখানে ভাত খেয়ে যাবা; ঠিক আছে?
কমলা লজ্জাতুর চোখে তাকায়—ঠিক আছে মা। কাইলথন কামুনে। ওর অপসৃয়মাণ লম্বা ঠ্যাঙা শরীরটার দিকে তাকিয়ে থাকে মেহেরোজ। হোসনা বানু কাছে এসে দাঁড়ায়—হুনেন খালাম্মা, অরে আমি রোজ বাত হাদি। অয় আগে জিগায়—সালুন কী?
—মানে? মেহেরোজ হোসনার দিকে তীর্যক দৃষ্টিতে তাকায়।
—সে শুঁটকি ভর্তা খাইব না, মাছ খাইব না, ডাইল খাইব না।
—তো খাবে কী সে?
—লাল মোরগের গোশত দিয়া গরম বাত খাবার চায়।
মেহেরোজ অবাক চোখে তাকায় হোসনার দিকে।
সেদিন সকালে রান্নাঘরে ঢুকে মেহেরোজ দেখল এক বাটি মুরগির মাংস। একটা রান। এক টুকরা বুকের মাংস। দুইটা সেফটিপিন বড় বড়। দুটো ছোট ছোট নতুন গোল আলু। বেশ অনেকখানি ঝোল।
—হোসনা, এই মাংস কার?
—বড় ভাইয়ার ভাগের ডা। রাইতে খায় নাই। ডাইল চড়চড়ি আর সেলাদ দিয়া খাইয়া উইঠ্যা গেছে। মেহেরোজের মাথায় একটি বুদ্ধি উঁকি দিল। আজ সে কমলাকে নিজহাতে ভাত খাওয়াবেই। চুলায় কড়াই চাপাল। একটু তেল গরম করে পেঁয়াজ ভেজে লাল মরিচের গুঁড়া দিয়ে একটু পানি দিল। মশলা কষানো হয়ে গেলে মাংসর বাটিটা ঢেলে দিল কড়াইয়ের ভেতর। তারপর ঢেকে রাখল কিছুক্ষণ। সুন্দর একটি ঘ্রাণ বের হলো। হোসনা বলল—কারে দিবেন, কমলারে?
—হ্যাঁ। তুমি কিছু বলবা না আগে থেকে।
একটু ভাজা জিরার গুঁড়া ছিটিয়ে কড়াই থেকে বাটিতে মাংসটা ঢেলে নিল মেহেরোজ।
ঘর মোছা শেষ হলে কমলাকে বলল—সাবান দিয়ে ভালো করে হাত-মুখ ধুয়ে আসো তো, কমলা।
—ক্যান মা, কাপড় ধুমু না?
—না, আজ আর কাপড় বের করিনি। কাল দেব। আজ তোমাকে লাল মোরগের মাংস দিয়ে ভাত খাওয়াব।
কমলা মেহেরোজের মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে ঝুপ করে ওর পা ছুঁয়ে সালাম করল—আইজ বুঝি মুরগা রানছে মা! খামু, খামু। মেহেরোজ এক থালা গরম ধোঁয়া ওঠা ভাত বেড়ে এক টুকরো লেবু সেঁটে মাংসের বাটিটা ওর সামনে রাখল।
একটি চওড়া কাঠের পিঁড়ির ওপর কমলা বসেছে। সামনে একটি পানিভর্তি গেলাশ। এক থালা চিকন চালের গরম ভাত। ফ্যানের বাতাসে ওপর দিয়ে ধোঁয়া উড়ছে। কমলা মাংসের বাটিটা নাকের কাছে একবার ধরল—কী ঘেরান, মা...। এই রহম এক টুকরা মাংস দিয়া কত খাওনের শখ আমার ম্যালা দিন থেইকা। হেই ছোডুকালে, যুদ্ধের সুময়। একদিন আমার মায় এই রহম লাল লাল ঝোল-আলা মুরগার মাংস রানছিল। খাইতে খাইতে জিগাইছি—মা এত মজা ক্যা গো... কিসের মাংস? মায় কইল, লাল মুরগের মাংস। হেইথন আমি লাল মোরগের...। কমলার দু-চোখ ভরে পানি টপ টপ করে ভাতের থালায় পড়তে লাগল।
মেহেরোজ বলল—কাঁদো কেন। বিসমিল্লাহ বলে খাও দেখি। কমলা হাসি আর কান্না মেশানো একটি রহস্যময় পরিবেশ তৈরি করে গপাগপ মুঠি মুঠি ভাত মুখে পুরতে লাগল।
