ভৈরব
কাজী শাহেদ আহমেদ
প্রচ্ছদ :হাশেম খান
প্রকাশক :আগামী প্রকাশনী
প্রকাশকাল :বৈশাখ ১৪২০, এপ্রিল ২০১৩
মূল্য :৭০০ টাকা
কাজী শাহেদ আহমেদের ব্যক্তিজীবন ও লেখকসত্তার পরিপূরণে পূর্ণতা পেয়েছে ‘ভৈরব’। এটি তাঁর প্রথম উপন্যাস। বলা চলে, অনেকটা আত্মজৈবনিক, বাস্তব ঘটনাবলির ওপর নির্ভর করে এগিয়েছে উপন্যাসের পটভূমি। ভাষা ও উপস্থাপনশৈলীতে সাহিত্যমুখিনতা গুরুত্ব পেয়েছে। অন্তর্জীবনের চেতনা ও মননের বিস্তার লক্ষ করা যায় কাহিনির পরতে পরতে। ‘ভৈরব’ যশোর-খুলনা অঞ্চলের মুন্সি পরিবারকে কেন্দ্র করে ধারাবাহিক কিছু বাস্তব ঘটনার ঔপন্যাসিক বয়ান। এর প্রতিটি চরিত্র নানাভাবে কাহিনিকে উজ্জীবিত করেছে, প্রাণ দিয়েছে—সবই সম্ভব হয়েছে লেখকের মুনশিয়ানা আর রচনাশৈলীর অভিনবত্বে।
উপন্যাসের প্রধান চরিত্র মুন্সি হায়দার অলি ভৈরব। চরিত্রটি এগিয়ে গেছে নানা বিচিত্র অভিজ্ঞতা ও মানবিক বোধের মধ্য দিয়ে। বন্ধুদের আড্ডায় ডানপিটে ভৈরব, রসবোধও তার অপরিসিম। দৈহিক সৌন্দর্য, দেশপ্রেম, চারিত্রিক দৃঢ়তা, সমাজ সংস্কারের ব্রত, গোঁড়ামির বিরুদ্ধে অবস্থান—সব মিলিয়ে এক অবিস্মরণীয় চরিত্র ভৈরব। জহুর মিথ্যা বদনাম জুড়ে দিয়ে তার ছোট বিধবা বোনকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছে, এমন কোনো বাড়ি নেই যেখানে প্রয়োজনের সময় জহুরের বোন সেবা দেয়নি। একথা শুনে সবার আগে ছুটে এল ভৈরব, জহুর ভৈরবের কথামতো বোনকে ফিরিয়ে আনল। এরপরের দৃশ্য:‘জহুর ফেরত এলে ভৈরব জহুরের ঘাড়টা ধরল। আস্তে আস্তে তুলে ঝুলিয়ে দিল... চিউ চিউ করছে জহুর। তখন ছেড়ে দিয়ে মাটিতে নামিয়ে ভৈরব বলল, তোর ছোট বোনের সামনে তোকে আমি অপমান করতে চাই না, তবে...।’ ভৈরবের ভেতর প্রেম ও ভালোবাসার অনুভূতি তীব্র। বেনাপোলের হলদিয়া গ্রামের জমিদার বাড়িতে জন্ম নেওয়া শিউলি ভাগ্যের পরিহাসে যশোরে একটি হিন্দুপাড়ায় আশ্রয় নেয়, সেখানে দেখা হয় ভৈরবের সঙ্গে, তারপর প্রেম, বিয়ে। শিউলির ভাই মাহি, বন্ধুত্ব হয় ভৈরবের সঙ্গে। মাহির বয়ানে ভৈরব জানতে পারে, জমিদার বাড়ির ছেলে হয়েও কেন এলাকা ছেড়ে যশোরে। নিজ এলাকায় ফতোয়ার শিকার উচ্চশিক্ষিত শিউলি, তার পরিবার যশোরে এসেও ধর্মান্ধ হিন্দুদের রক্তচোখ দেখে। এসব শুনে ভৈরব গলা ভারী করে বলে, ‘সে কী কাণ্ড! খোকন, দুলাল, মারুফ, চিনু, কবির, আলেহাজা, জালাল তোরা সবাই চল, একটু দেখে আসি কোথায় লেখা আছে হিন্দু পাড়ায় মুসলমান থাকতে পারবে না।’ খোকন, দুলাল, চিনু এরা সবাই ভৈরবের আবাল্য সহচর। নদীর মতোই উচ্ছল, প্রাণচঞ্চল ভৈরব চরিত্র। তার গর্জন, শৌর্য-বীর্য, বীরত্ব ও মমত্বের এক গৌরবময় আখ্যান ‘ভৈরব’। উপন্যাসে লেখক জীবনের গভীরতা ও বিচিত্রতা চিত্রিত করেছেন মানবিক বোধ প্রাধান্য দিয়ে।
উপন্যাসের কাহিনিকাল প্রায় ৭৩ বছরের (১৮৯৯-১৯৭২), আর কেন্দ্রীয় চরিত্র ভৈরবের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায় ৭১ বছর। এই সময়ের মধ্যে পূর্ব বাংলা, পূর্ব পাকিস্তান অবশেষে বাংলাদেশ। নানা ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে জীবনের নতুন সমীকরণ টেনেছেন লেখক। আর এখানে তিনি কাজে লাগিয়েছেন বাস্তবজীবনের অভিজ্ঞতা। উপন্যাস পাঠে দুর্ভিক্ষের ভয়াল থাবা, যুদ্ধের বিভীষিকা, নির্যাতন-নিপীড়নের চিত্র চরিত্রগুলোর মধ্য দিয়ে দৃশ্যমান হয়ে উঠবে। দৃষ্টিভঙ্গির দিক থেকে বললে, লেখকের ভেতরেই শক্তিটা রয়েছে। ১৯৭১ সালের ঘটনাপ্রবাহে উল্লেখ আছে, পাকিস্তানি সেনারা এলাকার রাজাকার-কমান্ডার খালেক ও তার ভাই মসজিদের ইমাম মালেকের দ্বারা প্ররোচিত হয়ে তার কন্যা ও নাতনিকে ধর্ষণ করার পর হত্যা করে। ভৈরব তার অব্যবহিত পরে ঘটনা সম্পূর্ণ জানতে পেরে ইমাম মালেকের মাথা কুঠারের আঘাতে দ্বিখণ্ডিত করে আর বলে, ‘এই নে তোর পাকিস্তান দুই ভাগ করে দিলাম।’ উপন্যাসটির আদ্যোপান্ত পাঠে রফিকুল ইসলামের লেখাটি যথার্থই মনে হয়েছে, ভূমিকা অংশে তিনি লিখেছেন, ‘ভৈরব চরিত্রের একটি বিশেষ দিক হচ্ছে উদ্যম, উদ্ভাবন ও সংস্কার—যার মূল লক্ষ হচ্ছে মানুষের কল্যাণ। ভৈরব এক জায়গায় তার স্ত্রী শিউলিকে বলেছেন, মানুষ প্রথমে সিদ্ধান্ত নেয় তারপর সে মোতাবেক কাজ করে। ঠিক সেভাবে ভৈরব একের পর এক সমাজ পরিবর্তন ও নতুন সমাজ তৈরিতে বিভিন্ন কাজে হাত দেন। বলা যায় প্রায় সবগুলোতে সফল হন।’
কাজী শাহেদ আহমেদের রচনার আঙ্গিক স্বতন্ত্র ও নিরীক্ষাধর্মী। ভাষা তীর্যক ইঙ্গিতধর্মী, কাব্যময়; আবার কখনো ঋজু, রুক্ষ, শাণিত। ইন্দ্রিয় সংবেদনার তীক্ষতার, বাহ্য ঘটনার অন্তরালে ভাবসত্য উন্মোচনে, নিসর্গচেতনার সঙ্গে জৈবপ্রকৃতির সংশ্লেষে, নান্দনিক পরিবেশনায়, সমাজসত্য ও ভাবলোকের শিল্পিত সংঘাতে, আপাত চেনা চরিত্রের আত্মগত বহিঃপ্রকাশের বৈপরীত্যে, দার্শনিকের নিরাসক্ত-নৈর্ব্যক্তিকতায়, বাস্তব ও পরাবাস্তবের অন্তবর্তী এক স্বতন্ত্র অস্তিত্বের অন্বেষণে ‘ভৈরব’ সমকালীন সাহিত্যধারার প্রচলিত পথ থেকে স্বতন্ত্র। লেখক কালিক অভিঘাতকে নানা চরিত্রের সংঘাতে উন্মোচিত করেছেন। আর সেই উন্মোচনে শুধু বিষয়গত দিক নয়, প্রাধান্য পেয়েছে বিষয়গত দ্বন্দ্বও। মধ্যবিত্ত-নিম্নমধ্যবিত্ত, সচ্ছল-অসচ্ছল নানা জীবিকা ও পেশার বহু চরিত্রের চলাচলে—উপন্যাসপটে তাদের মনোভঙ্গি ও ভূমিকার অভিপ্রকাশে তত্কালীন বাঙালি জীবনের অন্তর্দেশের আলোড়ন ‘ভৈরব’ উপন্যাসে রূপাভাসিত। এখানে চরিত্রগুলি ভালো-মন্দে মেশানো, সনাতনপন্থী ও প্রগতিপন্থী—এরকম একটা বিভাজন আছে। ভৈরবের সহচর খোকন ও দুলাল, যারা নিজেরা সমকামী, তাদের কথাসহ সমাজের নানা যৌন বিকারের চিত্র উপন্যাসটিতে খোলাখুলিভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
প্রাঞ্জল বাক্যবিন্যাসের ফলে সুখপাঠ্য হলেও উপন্যাসটিতে বর্ণনার আধিক্য লক্ষ করা যায়। উপন্যাসে সংলাপ ও বর্ণনার ভারসম্য থাকা দরকার। ‘ভৈরব’-এ বর্ণনা বেশি, যদিও তা প্রয়োজন ছিল। মনে হয়েছে সংলাপের অংশ আরও বৃদ্ধি পেতে পারত। কেননা সংলাপ একটি মুহূর্তকে জীবন্ত করে তোলে।
রক্ষণশীল পরিবার থেকে আধুনিক মানুষ হয়ে ওঠার সংগ্রামের চমত্কার উদাহরণ সুনিপুণভাবে চিত্রিত হয়েছে ‘ভৈরব’ উপন্যাসে। বইটির সমাদর হবে বলে আশা করি।
