বেঁচে থাকার তাগিদে, জীবনকে মেলে ধরার স্বার্থে ও নিরাপদ ভবিষ্যত বিনির্মানের জন্য অর্থের প্রয়োজন। এমনকি আর্থিক ইবাদতের প্রত্যক্ষ মাধ্যম- হজ্জ্ব, যাকাত, কুরবানি। তাই ‘বৈধ ও পবিত্র” উপায়ে উপার্জন করা ইসলাম নিষেধ করে না বরং উত্সাহ দেয়। ইসলামি অর্থ দর্শন দারিদ্র্য ও শোষণমুক্ত, সুদবিহীন ও যাকাত ভিত্তিক। ফলে দূর্নীতিমূক্ত নির্মোহ জীবনবোধ ইসলামের অহংকার। তবে একথাও সত্য, মোহ মানুষের মজ্জাগত স্বভাব এবং মোহমুক্তির সংগ্রাম একটি বিপরীতমুখী সাধনা-যা অস্বীকার করা যায় না। পবিত্র কুরআনের ভাষায়— মনোরম করা আছে কামনা অপার/ মানুষের কাছে যাহা অধিক চাওয়ার/ সন্তান নারী আর সোনা-রূপার/ অশ্ব-পশুরাজি ক্ষেত ও খামার (আল ইমরান-১৪)। এটাতো সুখ নয় বরং রাবিন্দ্রীক ভাবনায়- ”কী বিশাল ঐশ্বর্য কী অনন্ত কারাগার”। তাইতো অর্থের আবর্তে-আকর্ষণে, গতিশীল জীবনে কারো কারো মোহ তার আয়ুষ্কাল ছাড়িয়ে যায়। বয়স ও বার্ধক্যের কারণে তখন ”খাই খাই .. নাই নাই .. স্বভাব” বেড়ে যায়। মানুষের ভাবনার শাখা প্রশাখার গগণচুম্বী কল্পনা, মৃত্যুর বেড়া জালে থেমে যাচ্ছে দেখেও আমরা আমাদের মতো আকাঙ্ক্ষার সৌধ গড়ছি। বার্ধক্যে নি:স্তেজ হচ্ছে শরীর, শীথিল দেহ গড়ণ-শুভ্রতায় ছেয়ে যাচ্ছে মুখ ও মাথা। তবু সব সামর্থ্য হারিয়েও শুধু বাঁচার চেষ্টা ও বাড়ানোর কৌশল। কেননা, টাকা-পয়সা একটি প্রয়োজনীয় ঝামেলা। মরমী কবি হাসন রাজা জীবদ্দশায়ই তাঁর ”কবর” দেখিয়ে বলতেন ‘এটা আমার বাড়ি’। আর আয়নায় পাকা চুল দেখে অনুভবে অনুরণিত হতেন—‘কই নিয়া রাখবো আল্লায় তার লাগিয়া কান্দে ..’। মানুষের মৃত্যুভাবনা ও পরকাল চিন্তা নির্লোভ জীবনবোধ তৈরি করে। প্রিয় নবী (স.) বলেন ”পৃথিবীতে এমনভাবে বসবাস কর যেন তুমি একজন মুসাফির অথবা পথিক (রাস্তা অতিক্রমকারী) আর সবসময় নিজকে কবরবাসী মনে করো’ (বুখারি)। ‘মানুষের ‘রিযক’ ও ‘মৃত্যু’ দু’ই মানুষের পিছু পিছু তাড়া করছে’- হাদীসের এমন শিক্ষা কয়জনই বা উপলব্ধি করে। অথচ— আয়ু ও আকাঙ্ক্ষার দ্বন্দে মানুষ অনিবার্য মৃত্যুর দিকেই এগিয়ে যাচ্ছে। এ প্রসঙ্গে হযরত আনাস (রা.) বলেন, একদা নবী (স.) একটি রেখা আঁঁকলেন। তারপর বললেন “ এটাই (এ রেখা) আকাঙ্ক্ষা। আর এটা তার আয়ু (এ রেখা)। এ অবস্থায় আশা- আকাঙ্ক্ষার মধ্যে হঠাত্ নিকটতম রেখাটি (মৃত্যু) তার দিকে এগিয়ে আসে” (বুখারি)। পাপ ও পতনের হাত ছানিতে আমরা মুক্তির জন্য অস্থির। আবার আমরা সবাই বেহেশতে যেতে চাই কিন্তু মরতে চাই না। কারণ মৃত্যুভয় ও আমাদের জাগতিক ভোগলিপ্সা আমাদের মধ্যে পরস্পর বিরোধী সত্তা সৃষ্টি করে - যা মৃত্যু ও মুক্তিকে একসঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দাঁড় করায়। অথচ মৃত্যু একটি নিত্য ও সত্য বিষয়। তাই কবি বলেছেন— “মৃত্যু যেদিন বলবে জাগো প্রভাত হলো তোমার রাতি/ নিভিয়ে যাবো আমার ঘরের চন্দ্র সূর্য দু'টো বাতি।” জীবন জগতের ক্ষণস্থায়ীত্ব ও অনিত্যতার ভাবনা মানুষকে মোহ ও প্রাচুর্যের প্রতিযোগিতা থেকে দুরে রাখে কিন্তু আমরা সবাই কি শ্বাশত মহাসত্যের আহবান শুনতে পাই? আল্লাহ বলেন— “প্রাচুর্য্যের প্রতিযোগিতা তোমাদের মোহাচ্ছন্ন করে রাখে, যতক্ষণ না তোমরা কবরের দিকে ধাবিত হও” (তাকাসুর-০১,০২)। মৃত্যুর অনিবার্যতায় জীবনের সব আয়োজন শেষ হয়ে যায়। সাজানো সংসারের স্বজনেরা সহসাই শোক ভুলে যেতে যেতে প্রিয়জনের মৃত্যুবার্ষিকীও স্মরণে রাখে না- সময় পায় না একটু মুনাজাতের ! অথচ এ মৃত্যুর কথা আমরা জীবিতগণ ভুলে থাকতে চাই। এজন্যই আল্লাহ বলেন—“যখন কারো প্রাণ ওষ্ঠাগত (কণ্ঠাগত) হয়, আর সে সময় তোমরা তাকিয়ে থাকো”(ওয়াকিয়া-৮৩)।
