বাংলাদেশের কৃষি নির্ভর অর্থনীতিতে প্রাণিসম্পদ উপ-খাতের প্রবৃদ্ধির হার ২০১১-১২ অর্থবছরে ৩.৫৪% ও একই সময়ে জিডিপিতে অবদান ২.৫% এবং মোট কৃষিজ জিডিপির ১৭.০৩% আসে গুরুত্বপূর্ণ প্রাণিসম্পদ উপ-খাত থেকে। প্রাণিসম্পদ থেকে আমরা দুধ, মাংস, ডিম এবং এসব উপাদান থেকে উত্পাদিত পুষ্টিঘন বিভিন্ন খাদ্যসামগ্রী এবং চামড়া, হাড়, পশম, লোম, খুর, শিং, পালক, পশুশক্তি, জ্বালানি, জৈবসার, বায়োগ্যাস, ইত্যাদি পেয়ে থাকি। দেশে পুষ্টি চাহিদা পূরণ, প্রাণিজ আমিষের যোগান, দারিদ্র্য বিমোচন, আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টি, মানব সম্পদ উন্নয়ন ও খাদ্য নিরাপত্তা জোরদারকরণে প্রাণিসম্পদ খাতের ভূমিকা অপরিসীম। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব অনুযায়ী একজন প্রাপ্ত বয়স্ক মানুষের দৈনন্দিন দুধ ও মাংসের চাহিদা যথাক্রমে ২৫০ মি.লি ও ১২০ গ্রাম। কিন্তু এই চাহিদার বিপরীতে ২০১১-১২ অর্থবছর শেষে বাংলাদেশে প্রাপ্যতা দাঁড়িয়েছে জনপ্রতি ৬৪.১১ মিলি ও ৪৩.১৭ গ্রাম প্রতিদিন। বাংলাদেশে দুধ ও মাংসের উত্পাদনের এই ঘাটতি পূরণে মহিষ একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। গত ১৯ এপ্রিল দেশে প্রথমবারের মতো ভোলায় উন্নত মহিষ উত্পাদন প্রকল্পের উদ্বোধন করা হয়েছে। মত্স্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব উজ্জ্বল বিকাশ দত্ত এ প্রকল্পের উদ্বোধন করেন। কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে দেশে মহিষ ও মহিষের দুধের পর্যাপ্ততা নিশ্চিত করা হবে।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার তথ্যমতে সারা বিশ্বে মহিষের সংখ্যা প্রায় ১৩০ মিলিয়ন যার ৯৬ ভাগ দক্ষিণ এশিয়া ও নিকট প্রাচ্যের দেশগুলোতে অবস্থিত। বিশ্বের মহিষের দুধ উত্পাদনে ভারত প্রথম, পাকিস্তান দ্বিতীয়, চীন তৃতীয়, মিশর চতুর্থ, নেপাল পঞ্চম ও বাংলাদেশ ১৩তম। ভারতে মোট উত্পাদিত মাংসের ৩৪.৭ ভাগ ও দুধের ৪৫ ভাগ এবং পাকিস্তানে মোট উত্পাদিত দুধের ৬৮ ভাগ আসে মহিষ থেকে। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী দেশে বর্তমানে গরু ও মহিষের সংখ্যা যথাক্রমে ২৩১.৯৫ ও ১৪.৪৩ লক্ষ। এসব মহিষের বেশির ভাগই ব্রহ্মপুত্র-যমুনা-মেঘনা নদী অববাহিকা ও উপকূলীয় জেলাগুলোতে বিস্তৃত।
মত্স্য প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের গবেষণায় বলা হচ্ছে যে, গরুর তুলনায় মহিষের বেশকিছু বাড়তি গুণাবলী রয়েছে যেমন- মহিষের প্রবৃদ্ধির হার বেশি; প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকার ক্ষমতা বেশি; নিম্নমানের খাদ্য হজমে দক্ষ; রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বেশি; বাছুরে নিউমোনিয়া এবং পুষ্টির অভাব জনিত রোগ কম হয়; ফুটরট এবং ওলান প্রদাহ রোগ হওয়ার প্রবণতা খুবই কম; মহিষ থেকে প্রাপ্ত গোবরের পরিমাণ বেশি; কৃষি কাজে শক্তির যোগানের সামর্থ্য বেশি; মাংসে চর্বির পরিমাণ অনেক কম; দুধে চর্বি, আমিষ, ল্যাক্টোজ, ভিটামিন ও টোকোফেরল বেশি কিন্তু কোলস্টেরলের পরিমাণ কম। এছাড়াও দুধে অধিক পরিমাণ এসএনএফ ও ক্যালসিয়াম, ফসফরাস রয়েছে এবং মহিষের দুধের ভিসকোসিটি বেশি হওয়ায় ও ইহাতে পার-অক্সিডেজ বেশি থাকায় গাভীর দুধের তুলনায় সংরক্ষণ গুণাগুণ উত্তম।
এতোসব গুণাবলী সত্ত্বেও মহিষের উন্নয়ন কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় না হওয়ার অন্যতম কারণ হলো গরুর তুলনায় দেরীতে প্রজননক্ষম হওয়া, প্রজনন সময় নির্ধারণে সমস্যা বা নীরব প্রজনন সময়, স্বল্প প্রজনন সময়, পরীক্ষিত ষাঁড়ের অপ্রাপ্যতা, দীর্ঘ প্রসব ব্যবধান গর্ভধারণের নিম্নহার, অধিক ডিম্ব ক্ষয়িষ্ণুতা, পারিপার্শ্বিক তাপমাত্রার প্রভাবের প্রতি সংবেদনশীলতা, প্রজনন অঙ্গে গাভীর তুলনায় মহিষে প্রজনন ফলিকুল কম থাকা ইত্যাদি। তবে পশুখাদ্যের পুষ্টিমান উন্নয়ন, উত্তম ব্যবস্থাপনা প্রদান ও প্রজনন ক্ষেত্রে আধুনিক প্রযুক্তির প্রয়োগ নিশ্চিত করার মাধ্যমে এসব প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে মহিষের উত্পাদন বৃদ্ধি সম্ভব।
কৃত্রিম প্রজনন, কৌলিক উন্নয়ন এবং বাংলাদেশ প্রেক্ষাপটঃ কৌলিক উন্নয়ন মানেই উন্নত বাবা বা মায়ের কাঙ্ক্ষিত গুণাবলীর সমন্বয় ঘটিয়ে বর্তমান গবাদিপশুর কৌলিক দক্ষতার উন্নয়ন এবং এ ক্ষেত্রে ব্যবহূত আধুনিক প্রযুক্তিগুলোর মাঝে কৃত্রিম প্রজনন, ইস্ট্রাসের আবেশন ও সিক্রোনাইজেশন, সুপার ডিম্বোস্ফুটন ও ভ্রূণ স্থানান্তর, দেহের বাইরে ডিম্ব পরিপক্বকরণ, দেহের বাইরে) ও আগাম গর্ভধারণ পরীক্ষাকরণ অন্যতম। কৃত্রিম প্রজনন হলো এমন একটি কৌশল যার দ্বারা উত্তম গুণাবলীর ষাঁড়ের প্রক্রিয়াজাত বীর্য ক্যাথেটারের সাহায্যে প্রজনন চক্রে থাকা গাভী বা বকনার প্রজনন অঙ্গে স্থাপন করা। ১৭৮০ সালে ল্যাজারু স্প্যালানজানি নামের ইটালীয় বিজ্ঞানী সর্ব প্রথম কুকুরে কৃত্রিম প্রজনন করাতে সাফল্য পান। ১৯৩০ সালে কৃত্রিম প্রজনন পদ্ধতি গাভীতে প্রয়োগে জনপ্রিয়তা অর্জন করে এবং বাংলাদেশে ১৯৭৩ সালে সাভার ডেইরী খামারে গাভীতে পরীক্ষামূলকভাবে কৃত্রিম প্রজনন কার্যক্রম চালু করা হয়। প্রাকৃতিক প্রজননে যেখানে একটি ষাঁড় বছরে প্রায় ১০০ গাভীকে প্রজনন সেবা দিতে পারে, সেখানে গভীর হিমায়িত বীর্য ব্যবহার করে এমন কি ষাঁড়ের মৃত্যুর অনেক বছর পরেও দেশে কিংবা দেশান্তরে প্রায় ২০০০ গাভীকে প্রজনন সেবা দেয়া সম্ভব।
বাংলাদেশের মহিষের (গড় দুধ উত্পাদন ক্ষমতা ৫০০-৭০০ লিটার/ল্যাক্টেশন) সাথে বিদেশি উন্নত জাতের (গড় দুধ উত্পাদন ক্ষমতা ২০০০-২৫০০ লিটার/ল্যাক্টেশন) মহিষের আমদানিকৃত বীজ দিয়ে কৃত্রিম উপায়ে প্রজনন ঘটিয়ে দেশজ মহিষের মানোন্নয়ন তথা দুধ ও মাংসের উত্পাদন বৃদ্ধির অশেষ সম্ভাবনা রয়েছে। ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল ও ভারতবর্ষে জনপ্রিয় মুরাহ এবং পাকিস্তানের নিলি-রাভী, কুন্ডি জাতের মহিষের দৈহিক ওজন ও দুধ উত্পাদন ক্ষমতা উন্নত মানের। ভারতের এলাহাবাদ কৃষি ইনস্টিটিউটে ১৯৪৩ সালে প্রথম মহিষের কৃত্রিম প্রজনন সফল হয় এবং পরবর্তীতে ১৯৭২ সাল থেকে তারা সফলভাবে মহিষের বীর্য সংগ্রহ, প্রক্রিয়াকরণ ও গাভীর হিমায়িতকরণ ও কৃত্রিম প্রজনন করে আসছে এবং বর্তমানে বৃহত্তর কর্মসূচি আকারে চলমান। এ সকল বিবেচনায় প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরাধীন মহিষ উন্নয়ন প্রকল্পে ‘মুরাহ’ জাতের মহিষের বীজ ব্যবহার করে দেশীয় মহিষের উত্পাদনশীলতা বৃদ্ধির পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।
উপকূলীয় ও যমুনা-ব্রহ্মপূত্র এলাকার ১৩টি জেলার ৩৯টি উপজেলায় প্রথমবারের মত মহিষের কৃত্রিম প্রজননের কাজ হাতে নিয়েছে। দেশি গাভীতে কৃত্রিম প্রজননের ফলে যেহেতু তাদের দুধ উত্পাদন দক্ষতা গড় উত্পাদন ১.৫-২.০ লিটার থেকে বৃদ্ধি পেয়ে গড়ে প্রায় ৮-১০ লিটারে উন্নীত হয়েছে। আশা করা যাচ্ছে মহিষের কৃত্রিম প্রজনন সফলভাবে বাস্তবায়ন সম্ভব হলে দুধের দৈনিক গড় উত্পাদন ২.০ লিটার থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ৬-৮ লিটার এ উন্নীত হবে।
খামারিদের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দল গঠন করে উত্পাদন বৃদ্ধি ও দুধের বাজার সৃষ্টিই প্রকল্পের অভীষ্ট লক্ষ্য। এই প্রেক্ষিতে মোট ৪৬টি ব্যাচে ২৩৪০ জন কৃষককে প্রশিক্ষণ দেয়ার কার্যক্রম চলছে।
আবহমান ঐতিহ্য, সম্পদের সীমাবদ্ধতা ও পরিবেশ বান্ধব উন্নয়ন প্রচেষ্টার প্রেক্ষাপটে মহিষ পালন যথেষ্ট সম্ভাবনাময়। বর্তমান উদ্যোগে সফলতা অর্জন করা গেলে সেই অভিজ্ঞতার আলোকে বৃহত্তর পরিসরে কার্যক্রম গ্রহণ করা হবে। ফলে দেশে দুধ, মাংসের উত্পাদন ও কৃষকদের অর্থনৈতিক উন্নয়নে ব্যাপক পরিবর্তন সাধিত হবে।
