চুলপড়ার নানা কারণ রয়েছে। এমনকি প্রবল মানসিক চাপ থেকেও চুল পড়তে পারে। আমি এর আগে এন্ড্রোজেনেটিক এলোপেসিয়া নিয়ে খানিকটা আলোকপাত করেছি। আজ আমরা মহিলাদের চুল কেন পড়ে এ নিয়ে আলোচনা করবো। এন্ড্রোজেনেটিক এলোপেসিয়া বা হরমোনাল এলোপেসিয়া পুরুষ ও মহিলা উভয়ের হতে পারে। সাধারণত: বয়স যখন ২০ এর কোঠায় তখন এই বয়সের শতকরা ২০ ভাগ নারী-পুরুষের চুলপড়া শুরু হয় এবং প্রতি ১০ বছরের মধ্যে অতিরিক্ত আরও ১০ ভাগ চুলপড়তে থাকে। তবে সব কিছুই বিজ্ঞানের নিয়মে ঘটেনা। অনেক ক্ষেত্রে কম বয়সেও অনেক বেশী চুলপড়ে। আজকাল প্রচুর রোগী পাই যাদের চুলপড়ার বয়স হয়নি। তবুও মাথা ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে। কিশোর বয়স পার হওয়ার পর থেকে যে কোন সময় চুল পড়া শুরু হতে পারে। আর এন্ড্রোজেনেটিক এলোপেসিয়া সাধারণত: জেনেটিক ও হরমোনাল কারণে হয়ে থাকে। জেনেটিক কারণ হচ্ছে পিতা-মাতা বা ফ্যামিলির অনুরূপ কোন সদস্যের চুলপড়ার ইতিহাস থাকলে সন্তানেরও চুল পড়তে পারে। আর হরমোনাল ফ্যাক্টর হচ্ছে এন্ড্রোজেনস হরমোন বা টেসটেসটেরণ হরমোন নারী-পুরুষ উভয়ের চুলপড়ার জন্য অন্যতম দায়ী। পুরুষের ক্ষেত্রে টেস্টিস ও এডরিনাল গ্লান্ড এবং মহিলাদের ক্ষেত্রে ডিম্বাশয় (ওভারি) ও এডরিনাল গ্রন্থি টেসটেসটেরণ হরমোন তৈরী করে। এই টেসটেসটেরণ হরমোন ৫ আলফা রিডাকটেজ এনজাইমের মাধ্যমে ডাই হাইড্রোটেসটেসটেরণে (ডিএইচটি) পরিবর্তিত হয়ে চুলপড়ার সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে। এই ডিএইচটি হেয়ার ফলিকিউলকে প্রভাবিত করে হেয়ার গ্রোথ সাইকেলকে বাধাগ্রস্ত করে এবং হেয়ার ফলিটিউলকে সংকুচিত করতে করতে ছোট করে ফেলে। ফলশ্রুতিতে চুলপড়া শুরু হয়। চিকিত্সা বিজ্ঞানের ভাষায়
এই প্রক্রিয়াকে মিনিয়াসুরিসেশন বলা হয়। অর্থাত্ হেয়ার ফলিকিউল হরমোনের প্রভাবে ছোট ছোট
হতে এক পর্যায়ে চুলপড়া শুরু হয়। সাধারণ: মাথার সামনের
দিকে এবং স্কাল্প-এর উপরিভাগে ডিএইচটি হরমোন বেশী
সক্রীয় থাকায় এসব এরিয়ায় চুলবেশী পড়ে।
তবে আমি আগেই বলেছি সব সময় পুথিগত বিদ্যা আর বিজ্ঞানের নিয়মে চুল পড়েনা। আমি আমার প্রাইভেট চেম্বারের রোগীদের মধ্যে আজকাল তরুণী ও মহিলাদের একটা বিরাট অংশ দেখছি যাদের চুল পড়ছে ক্র্যাশ ডায়েটিং এবং অযাচিত মানসিক চাপ, টেনশন ও রাত জাগার কারণে। এমনকি যেসমস্ত ছেলে-মেয়ে, নারী-পুরুষদের মধ্যে ধূমপানের মাত্রা বেশী তাদেরও চুলপড়ার প্রবণতা অধিক। এছাড়া মেল প্যাটার্ন বল্ডনেস এর মত মহিলাদেরও হতে পারে ফিমেল প্যাটার্ন বল্ডনেস। মহিলাদের বয়স বাড়ার সঙ্গে নানা কারণে চুল পড়তে পারে। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী মহিলাদের বয়স যখন ৫০ এর কোটায় তখন মাত্র ৬ ভাগ মহিলাদের চুলপড়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে আমরা দেখছি স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলে-মেয়েদের মধ্যে ব্যাপক সংখ্যকের চুলপড়ছে। আর মহিলাদের চুলপড়া সমস্যাকে আমরা তিন ভাগে ভাগ করতে পারি। মাইল্ড, মডারেট ও সিভিয়ার পর্যায়ের চুলপড়া। এসব চুলপড়ার ক্ষেত্রে সাধারণত মাথার উপরিভাগ থেকে চুলপড়া সমস্যা শুরু হয় এবং মাথার অন্যান্য স্থানে চুল ফাঁকা হতে শুরু করে।
মহিলাদের এন্ড্রোজেনেটিক এলোপেসিয়া ছাড়াও থাইরয়েড হরমোনের তারতম্যের কারণেও চুলপড়তে পারে। সাধারণভাবে মহিলাদের চুলপড়া সমস্যার চিকিত্সা পুরুষদের চুলপড়া সমস্যার চিকিত্সা মোটামোটি একই রকম। তবে পুরুষদের চুলপড়ার সমস্যায় খাবার ট্যাবলেট ফিনাস্ট্রাইড বহুল ব্যবহূত হয়। কিন্তু মহিলাদের ক্ষেত্রে অনুরূপ কোন খাবার ট্যাবলেট নেই। আমি এর আগেও বহুবার বলেছি চুলপড়া সমস্যা কোন রোগ নয়। শরীরের নানা কারণে চুলপড়তে পারে। তাই কারণ জেনে চিকিত্সা দেয়াই ভালো। তবে সাধারণত: ২% মিনক্সিডিল লোশন মহিলাদের চুলপড়া সমস্যার ক্ষেত্রে উপকারী। এছাড়া ক্ষেত্র বিশেষ লোলেজার থেরাপিও দেয়া হয়। তবে মনে রাখতে হবে চুলপড়ার চিকিত্সার পাশাপাশি চুলের যথাযথ পরিচর্যাও দরকার। এছাড়া আর একটি কথা মনে রাখতে হবে চুলপড়া সমস্যার চিকিত্সা না করলে যে ক্ষতি হবে তার চেয়ে অনেক বেশী ক্ষতি হয় অপচিকিত্সায়। কারো কথায় বা প্রলোভনে অপচিকিত্সায় আপনার মাথার অমূল্য চুল নষ্ট করবেন না। চিকিত্সকের পরামর্শ অনুযায়ী কারণ বুঝে বিজ্ঞানসম্মতভাবে চুলের চিকিত্সা ও পরিচর্যা করুন।
