মেয়ের বাপেও চায় ঘুষ-খাওয়া জামাই

আপডেট : ১৯ এপ্রিল ২০১৩, ২১:২৮
একটি গাছের মূলে যদি বিষ থাকে তবে তার কাণ্ড-পাতা-ফুল-ফলেও বিষ থাকবে এটাই স্বাভাবিক। সরকারি অফিসগুলোই একটি দেশের মূল চালিকা শক্তি। সেই মূলেই যদি থাকে দুর্নীতি তথা ঘুষ বাণিজ্য, তবে সেই ধারা প্রবাহিত হবে প্রতিটি কাণ্ডে, পাতায়, ফুল ও ফলে। একটি সরকারি চাকরি পেতে হলে মন্ত্রী আমলা কামলা ধরে পাঁচ থেকে দশ-পনেরো লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ দিতে হয়। বলা হয় চাকরি পেলে এই টাকা তিন মাসেই উঠে যাবে। তার মানে এত এত পরিমাণ ঘুষ লেনদেন হয় যে, তিন মাসেই ঐ রকম বিপুল পরিমাণ টাকা তুলে নিতে পারবে এমন গ্যারান্টি থাকে এবং অগ্রীম আশ্বাস দেওয়া হয়। তার মানে কী? ঘুষ দিয়ে ঘুষ কিনছি। ঘুষ দিয়ে বসে বসে ঘুষ খাওয়ার চেয়ারটা কিনছি। দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দিয়ে দুর্নীতির জায়গাটা কিনছি। সুতরাং দিবালোকের মতো স্বচ্ছ যে, দুর্নীতি কোনো গোপন বিষয় নয়! দেশে বর্তমান দুর্নীতি কিংবা ঘুষ খাওয়া অথবা উপরি কামাই একটি সামাজিক প্রথা কিংবা সামাজিকতা রক্ষার বিষয় তথা একটি সংস্কৃতি হয়ে দাঁড়িয়েছে! নিজে দুর্নীতিবাজ, সখ্যও গড়ে তোলে দুর্নীতিবাজের সঙ্গে। সরকারি চাকরি মানে লুটের রাজ্য। সেখানে আমরা সবাই রাজা। কাজেই সরকারি চাকরি পাওয়া মানেই একটি সোনার হরিণ পাওয়া। যা ঘুষ দিয়েও অনেকে পায় না। কারণ ঐ আসনটি বিক্রি হয় টেন্ডারের মতো করে। দুর্নীতির ঐ জায়গাটাকে তাই সোনার হরিণের সঙ্গেই তুলনা করা হয়। জীবনে প্রথম যেদিন ঘুষ-দৃশ্য দেখেছিলাম, সে দিনটির কথা এখনো মনে পড়ে। আমি তখন ছাত্র, বিএ পড়ি। পাশাপাশি টুকটাক কাজ করি। আমার বস্ আমাকে একটা কাজ দিয়ে পাঠিয়েছিলেন একটা সরকারি অফিসে। সঙ্গে কিছু কাগজপত্র দিলেন। সাক্ষাত্ করার জন্য নির্দিষ্ট ব্যক্তির নাম-ঠিকানাও দিলেন। পাশাপাশি লোকেশন ও দুই শ টাকা দিলেন। বললেন তাকে দিতে এবং বসের কথাগুলো বলতে। গিয়েছিলাম ঠিকই, বলেছিও, কিন্তু ঘুষ দিতে পারিনি। খুব সংকোচ বোধ হয়েছিল। কীভাবে যে হাত বাড়িয়ে দেই! কে কী ভাবে, কে কী বলে কে জানে! লাজ-লজ্জা, ডর-ভয় সব যেন একসঙ্গে গ্রাস করে ফেলেছে আমাকে। ভাবতে থাকি, কীভাবে তাকে ঘুষের টাকাটা দেবো! দিতে তো হবেই। না দিয়ে উপায় নেই। তিনি আমাকে তার সামনের চেয়ারে বসিয়ে রেখেছেন। পাশাপাশি তার কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। লোকজন আসছে। কাজকর্ম সেরে আবার চলে যাচ্ছে। সরাসরি হাতে টাকা ধরিয়ে দিচ্ছে। মুঠের টাকা সরাসরি বের করে নির্দ্বিধায় গুনছেন। কম হলো না বেশি হলো সরাসরি দর কষাকষি করছেন। আমি আড়ষ্ট হয়ে সেই সবদৃশ্য আড়চোখে তাকিয়ে দেখলাম আর ভাবলাম ঘুষ কাকে বলে! তবুও তাকে দুই শ টাকা দেওয়ার সাহস পেলাম না। শেষে বাধ্য হয়ে বুকে সাহস নিয়ে বিনম্রভাবে কাছাকাছি ঝুঁকে পড়ে বললাম কিছু মনে করবেন না এবং আমি লজ্জিত যে, কীভাবে আপনাকে বলি। তিনি বললেন নিঃসংকোচে বলো। কোনো সমস্যা নেই। বললাম বস্ আপনাকে এটা দিতে বলেছে, নিন। তিনি খুলে দেখলেন এবং বললেন এখানে মনে করার কিছু নেই, লজ্জা-সংকোচেরও কিছু নেই। আমরা টাকা নেই, তবে আমাদের একটা রেট আছে, কমপক্ষে পাঁচ শ টাকা (১৯ বছর আগের কথা)। এর কম হলে নেই না। আমি বিস্মিত হয়ে গেলাম! আগে শুনেছি ব্যাংকে যারা চাকরি করে তাদের ঘুষ নেই কিংবা শিক্ষকদের ঘুষ খাওয়ার সুযোগ নেই। অথচ সেই ক্ষেত্রটিও এখন ঘুষের আখড়া হয়ে গেছে। আমার পরিচিত এক ব্যক্তি ছিলেন তিনি ব্যাংকে চাকরি করতেন এবং প্রতিদিন কমপক্ষে দুই শ টাকা না হলে বাসায় ফিরতেন না। সর্বশেষ ঘুষ খাওয়ার দৃশ্য নিয়ে তর্ক করেছিলাম আমার এক পরিচিত মুরব্বীর সঙ্গে। তিনি আমারই সামনে চেক ভাঙাতে গিয়ে ব্যাংকের অফিসারকে দুই শ টাকা দিলেন। হুদাই। জটিল কোনো কাজ নয়, শুধু একটা সই। ব্যস, এতেই দুই শ টাকা গচ্চা! ছেলেরা বিদেশ থেকে টাকা পাঠায় আর তিনি তুলে তুলে খান, টের পান না। তাই বললাম সত্ রুজির টাকা অসত্ পথে ব্যয় করলেন, নিজের কামাই হলে টের পেতেন। চুপসে গেলেন মুরব্বী-ভদ্রলোক। আর সেই দাড়িওলা অফিসারকে দেখলাম কমবেশি সবার কাছ থেকেই টাকা নিচ্ছেন এবং জোহর নামাজ পড়ার সময় টাকার ড্রয়ারে তালা মেরে এবং সেই একই ড্রয়ার থেকে টুপি বের করে মাথায় লাগিয়ে নামাজ পড়তে গেলেন। জানি না সেই লোকের কী মর্যাদা রয়েছে আর ধর্মেরই বা কী মূল্য রয়েছে! শুধু তাই নয়, বিয়ের বাজারেও ঘুষখোর দুর্নীতিবাজদের অনেক ডিমান্ড। পাত্রী দেখতে গেলে পাত্রীর দুর্নীতিবাজ বাবা সরাসরি জিজ্ঞাসা করেন— ছেলে (পাত্র) বেতন পায় কত, কোনো উপরি আছে কিনা, এই টাকা দিয়ে কী হবে, সংসার চালাবে কীভাবে... ইত্যাদি ইত্যাদি। তার মানে দুর্নীতিবাজ শ্বশুর খুঁজে বেড়ান দুর্নীতিবাজ জামাই। এমনিভাবেই দুর্নীতির ভাইরাস ছড়িয়ে পড়েছে সমাজে। দুর্নীতিবাজদের রাজত্ব চলছে সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে। ছড়িয়ে পড়েছে সুদ বাণিজ্য। সাধারণ ঘরের বেকার যুবকেরাও আজকাল আধুনিক মডেলের মোটর সাইকেল নিয়ে ঘুরে বেড়ায়। অথচ কয়দিন আগেও তাদের ঘরে খাবার ছিল না। তখনই জানতে পেরেছি তাদের মোটা দাগের সুদ বাণিজ্যের কাহিনি। যাদের খপ্পরে পড়ে সর্বস্বান্ত হয়েছে অনেকেই। আমার এক প্রতিবেশী মাত্র পঁচিশ হাজার টাকা নিয়ে সুদ দিয়েছেন সত্তর হাজার টাকা, তবুও তার আসল টাকা শোধ হয়নি। এই দুর্মূল্যের বাজারে দেনার দায়ে লোকটি এখন মরতে বসেছে (শয্যাসায়ী)। সত্ মানুষ বোধহয় নেই। দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে। সত্ মানুষের স্থানও এখন আর এই সমাজে হয় না। জঞ্জালে ভরে গেছে দেশটা। এই দেশ হয়তো আর কখনোই জঞ্জালমুক্ত হবে না। দেশের বর্তমান রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতি দেখে অন্তত তাই মনে হয়। জানি না আমরা আমাদের ভবিষ্যত্ প্রজম্মকে সমাজে একটি বাসযোগ্য স্থান করে দিতে পারবো কিনা। নাকি মৃত্যুকালে ক্ষমা চেয়ে মরতে হবে— কে জানে ! সৌদিআরব