রাজধানীর হাজারিবাগের চামড়া শিল্পের দূষণ ক্রমাগতভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে নানা রোগ-বালাই ছড়িয়ে পড়ছে হাজারিবাগসহ আশপাশের এলাকায়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন জরুরি ভিত্তিতে ট্যানারিগুলো অন্যত্র সরিয়ে না নিলে পুরো এলাকায় মানবিক বিপর্যয় সৃষ্টি হতে পারে। ট্যানারি সরানোর ব্যাপারে উচ্চ আদালতের নির্দেশনাও রয়েছে। কিন্তু তা কোন কাজে আসছে না। অবশ্য এ ব্যাপারে শিল্প মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ট্যানারি কারখানাগুলো দীর্ঘদিন ধরে সাভারে সরিয়ে নেয়ার চেষ্টা চলছে। ট্যানারি স্থাপনের জন্য জমিও বরাদ্দ করা হয়েছে। কিন্তু প্রয়োজনীয় তহবিলের অভাবে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন কাজ শেষ করা যাচ্ছে না।
অথচ পরিবেশবিদ ও পানি বিশেষজ্ঞরা বুড়িগঙ্গা নদী দূষণের জন্য শতকরা ৯০ ভাগ দায়ী করেছেন হাজারিবাগের ট্যানারিগুলোকে। তারা বলছেন, ট্যানারি থেকে নির্গত বিষাক্ত তরল ও কঠিন বর্জ্য শুধু বুড়িগঙ্গার পানিকেই দূষিত করছে না, সাথে নদীর তলদেশ ও উভয় পাড়ের মাটি এমনকি বাতাসকেও ভয়াবহভাবে দূষিত করে তুলেছে। দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে নদীর তীরবর্তী এক বর্গ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে। বাতাসে সেই দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে দূরবর্তী এলাকাগুলোতেও। বর্ষায় পানি বৃদ্ধির পাশাপাশি বুড়িগঙ্গার দুর্গন্ধ কিছুটা কমে আসলেও পানি কমার সঙ্গে সঙ্গে তা ফের পূর্বাবস্থায় ফিরে আসে।
বিশিষ্ট পানি বিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. আইনুন নিশাত ইত্তেফাককে বলেন, বুড়িগঙ্গা বিষে জর্জরিত। নদীর পানি, মাটি, বাতাস সবকিছুই বিষাক্ত হয়ে গেছে। নদী পাড়ের মানুষগুলো অসহায় জীবন-যাপন করছেন। তারা পানি ও বাতাস বাহিত নানা রোগে ভুগছেন। ট্যানারিগুলো অন্যত্র সরানোর সিদ্ধান্ত হলেও তা বাস্তবায়ন না হওয়ায় নদীর দূষণ মাত্রা প্রতিদিনই বেড়ে চলেছে। তিনি নদী রক্ষায় ট্যানারিগুলো জরুরি ভিত্তিতে অন্যত্র স্থানান্তর করার দাবি জানান। একই সঙ্গে তিনি নদী খননের উপরও জোর দেন।
একই কথা বললেন নগর পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক নজরুল ইসলাম। তিনি ইত্তেফাককে বলেন, ঢাকার চারপাশের নদীগুলোকে যে কোন মূল্যে রক্ষা করার প্রতিশ্রুতির কথা সব সরকারের আমলেই শোনা যায়। তবে বর্তমান সরকারের প্রতিশ্রুতিকে মানুষ অন্যভাবে মূল্যায়ন করে। সরকারও নদী রক্ষায় কিছু কিছু বাস্তবমুখী উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।
হাজারিবাগ ট্যানারির দূষণ সম্পর্কে চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. এম মুজিবুল হক ইত্তেফাককে বলেন, হাজারিবাগের ট্যানারি পুরনো ঢাকার বাসিন্দাদের জন্য অভিশাপ হয়ে দেখা দিয়েছে। ট্যানারির বিষাক্ত তরল ও কঠিন বর্জ্য বুড়িগঙ্গার পানির সাথে মিশে পানিকে মারাত্মক দূষিত করছে। এই পানি ব্যবহার করে নদীর তীরবর্তী অঞ্চলের শতকরা ৯০ ভাগ মানুষ খোস, পাচড়াসহ নানা চর্ম রোগে ভুগছেন। এছাড়া হাজারিবাগ ট্যানারিতে কর্মরত শ্রমিকদের মধ্যে শতকরা ৮৮ ভাগ হাতে-পায়ে দগদগে ঘা, শ্বাসকষ্ট, জন্ডিস, ডায়রিয়া, আমাশয়সহ নানা রোগে ভুগছেন। এছাড়া হাজারিবাগে কর্মরত শ্রমিকদের মধ্যে ক্যান্সারের ঝুঁকিও রয়েছে।
এদিকে রাজধানীর হাজারিবাগে চামড়া কারখানার দূষণ নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)। সম্প্রতি প্রকাশিত হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এক সমীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্যানারির বিষাক্ত রাসায়নিক বর্জ্যের কারণে হাজারিবাগে শিশু থেকে শুরু করে সব বয়সী মানুষ নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। এছাড়া ট্যানারিগুলোতে কাজের পরিবেশ মানসম্মত না হওয়ায় সেখানে নানা ধরনের দুর্ঘটনায় অনেক হতাহতের ঘটনা ঘটছে। চামড়া শিল্পের রাসায়নিক বর্জ্যে আশপাশের এলাকার পরিবেশ বিষাক্ত হয়ে উঠছে বলেও হিউম্যান রাইটস ওয়াচের প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে।
১০১ পৃষ্ঠার ঐ প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, চামড়া শিল্পের বিষাক্ত বর্জ্যে কারখানায় কর্মরত নারী ও পুরুষের মধ্যে ত্বকের বিভিন্ন রোগ ও ফুসফুসের নানা সমস্যা ছড়িয়ে পড়ছে এবং ট্যানারির বিপজ্জনক যন্ত্রপাতির কারণে দুর্ঘটনায় মানুষের অঙ্গহানি ঘটছে।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের স্বাস্থ্য ও মানবাধিকার বিভাগের জ্যেষ্ঠ গবেষক রিচার্ড পিয়ার হাউজ বলেন, হাজারিবাগের ট্যানারি ক্ষতিকর রাসায়নিকে পরিবেশ ভরিয়ে তুলছে। সরকার এদিকে নজর না দেয়ায় স্থানীয়রা অসুস্থ হওয়ার পাশাপাশি ট্যানারির ক্ষতিকর রাসায়নিকে প্রতিনিয়ত আক্রান্ত হচ্ছে শ্রমিকরা। ঐ এলাকার মাটি, পানি ও বাতাসে ট্যানারির রাসায়নিকের দূষণে জ্বর, ত্বকের বিভিন্ন রোগ, ফুসফুসের সমস্যা ও ডায়রিয়ার মতো রোগ ছড়াচ্ছে বলে হাজারিবাগের বস্তিবাসীরা অভিযোগ করেছেন।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সরকার চামড়া কারখানার শ্রমিক ও এলাকাবাসীর স্বাস্থ্য সুরক্ষায় ব্যবস্থা নেয়নি। হাজারিবাগে শ্রম ও পরিবেশ আইন বাস্তবায়নেও ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে তারা। এছাড়া হাজারিবাগ থেকে চামড়া শিল্প সরিয়ে নেয়ার বিষয়ে হাইকোর্টের দেয়া রায়ও উপেক্ষা করা হয়েছে বলে সংস্থাটি অভিযোগ করেছে।
