আমাদের দেশে তো বটেই, সেই সাথে বিশ্বের অনেক দেশেই শিশু-কিশোরদের খেলার এক মজার উপকরণ হিসেবে খ্যাতি রয়েছে ঘুড়ির। তা ছাড়া ঘুড়ি ওড়ানোর আনন্দটা যে বড়রাও কম উপভোগ করেন না তার প্রমাণ মেলে ফি বছর আমাদের দেশে অনুষ্ঠিত ঘুড়ি উত্সবগুলোতে। এমনকি পুরনো ঢাকার অনেক এলাকায় রীতিমতো উত্সবের আমেজেই ওড়ানো হয় ঘুড়ি। যদিও আমাদের দেশ আর উপমহাদেশে তুমুল জনপ্রিয় এই ঘুড়ির জন্ম কিন্তু দক্ষিণ এশিয়ায় নয়। বরং এ অঞ্চলের নিকটতম প্রতিবাসী চীনারাই সর্বপ্রথম সবার সামনে এনেছিল ঘুড়ির মতো একটি চমকপ্রদ উপকরণ। ধারণা করা হয়ে থাকে যে, খ্রিস্টের জন্মেরও প্রায় ২৮০০ বছর আগে থেকে চীনে ঘুড়ির প্রচলন ছিল। সে সময় বাঁশের কাঠামোর সঙ্গে সিল্ক কাপড় জুড়ে দিয়ে বানানো হতো হালকা আর উড়নক্ষম সব ঘুড়ি। তবে সিল্কের কাপড় দিয়ে ঘুড়ি বানানো ব্যয়বহুল আর কষ্টসাধ্য বলে চীনারাই সিল্কের পরিবর্তে কাগজ দিয়ে ঘুড়ি বানানোর কৌশল আবিষ্কার করে। যদিও অনেকেই দাবি করেন যে চীনারা সিল্ক কাপড় কিংবা কাগজ দিয়ে ঘুড়ি বানানো শুরু করারও বহু আগে বর্তমান ইন্দোনেশিয়ার সুলাওয়েসি ও মুনা দ্বীপের অধিবাসীরা গাছের পাতা দিয়ে ঘুড়ি তৈরি করতে জানত। এদিকে কারো কারো মতে খ্রিস্টের জন্মের প্রায় পাঁচশত বছর আগে চীনা দার্শনিক মোজি এবং লু ব্যানের হাত ধরেই প্রাণ পায় কাগজের ঘুড়ি। সে সময় বার্তা প্রেরণ, বাতাসের গতি পরিমাপ, সংকেত প্রেরণ, দূরত্ব পরিমাপ এবং সেনাবাহিনীর বিভিন্ন কাজে ঘুড়ি ব্যবহার করা হতো বলেও শোনা যায়। এরপর ১৩ শতকের শেষের দিকে পরিব্রাজক মার্কো পোলোর মাধ্যমে ঘুড়ির কথা ইউরোপের মানুষ জানতে পারে। তবে ঘুড়ির স্বর্ণযুগ বলা হয় ১৮৬০ সাল থেকে ১৯১০ পর্যন্ত সময়কে। কারণ এই সময় ঘুড়ি দিয়ে অনেক বৈজ্ঞানিক তথ্য সংগ্রহ করা হতো। যদিও আমাদের দেশে সব সময়ই ঘুড়িকে বিশেষ এক সংস্কৃতি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। মোঘল সাম্রাজ্যের সময় থেকে আমাদের উপমহাদেশে ঘুড়ি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। সে সময় আমাদের উপমহাদেশে যে ঘুড়িগুলো সাধারণত ওড়ানো হতো তার মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় হলো গুড্ডি বা পাতাঙ ঘুড়ি। এর সঙ্গে আবার লেজ লাগিয়ে সাপ ঘুড়িও বানানো হতো। এ ছাড়াও রয়েছে চাঙ গুড্ডি, চিল ঘুড়ি, পঙ্খীরাজ, ফিঙে প্রভৃতি নানা নাম আর নকশার ঘুড়ি। এ ছাড়া ঘুড়ি ওড়ানোর মতো ধারালো সুতার মাধ্যমে ঘুড়ি উড়িয়ে অন্যের ঘুড়ি কেটে দেওয়ার খেলাও এই উপমহাদেশের মানুষের মাধ্যমেই জনপ্রিয়তা পায়।
