পদ্মা সেতু প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগ প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত হওয়ার ঘোষণা দিয়েছে কানাডার একটি আদালত। এবার মামলাটির চূড়ান্ত বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার জন্য এটি পাঠানো হয়েছে অন্টারিও প্রদেশের সর্বোচ্চ প্রাদেশিক আদালতে। প্রায় ৯ দিনের শুনানি শেষে বাংলাদেশ সময় ১৯ এপ্রিল শুক্রবার মধ্যরাতের পর ডাউন টাউন টরেন্টোর ওল্ড সিটি হলে অবস্থিত অন্টারিও কোর্ট অব জাস্টিসের বিচারক ম্যালকম ম্যাকলয়েড এই ঘোষণা দেন। মামলাটির চূড়ান্ত বিচার শুরুর লক্ষ্যে আগামী ২৯ মে টরেন্টোতে অবস্থিত অন্টারিও সুপিরিয়র কোর্ট অব জাস্টিসে শুনানির দিনক্ষণ নির্ধারণ করা হয়েছে। ওইদিন বাদী ও বিবাদী পক্ষের উপস্থিতিতে মামলাটির বিচার-প্রক্রিয়ার সময়সূচি ঘোষণা করা হতে পারে। টরেন্টোতে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের সঙ্গে আলাপে এসব তথ্য জানা গেছে।
প্রসঙ্গত, পদ্মা সেতু প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগে রয়েল কানাডিয়ান মাউন্টেড পুলিশের (আরসিএমপি) দায়ের করা মামলাটির ভবিষ্যত্ নির্ধারণের লক্ষ্যে প্রাথমিক শুনানি শুরু হয় গত ৮ এপ্রিল। মধ্যখানে তিনদিন বিরতি ছাড়া মোট ৯ দিন বিষয়টির ওপর শুনানি এবং প্রয়োজনীয় আলামত ও দলিল-দস্তাবেজ উপস্থাপন করা হয়। এরপর ১৯ এপ্রিল শেষদিনের শুনানি শেষে বিচারক ঘোষণা করেন যে, প্রাথমিকভাবে অভিযোগের সত্যতা প্রতীয়মান হয়েছে এবং প্রাদেশিক সুপিরিয়ার কোর্টে এই মামলার বিচার সম্পন্ন হবে। ২৯ মে ওই আদালতে বাদী ও বিবাদী পক্ষকে উপস্থিত হওয়ার নির্দেশ দেন তিনি। মামলাটির প্রধান দুই বিবাদী হলেন কানাডীয় নির্মাণ প্রকৌশল প্রতিষ্ঠান এসএনসি-লাভালিনের সাবেক দুই কর্মকর্তা মোহাম্মদ ইসমাঈল ও রমেশ সাহা। বাংলাদেশের কর্তাব্যক্তিদের সঙ্গে ঘুষ লেনদেনের প্রক্রিয়াকরণকারী হিসাবে ইতিপূর্বে কানাডার পুলিশ তাদের দুই জনকে গ্রেফতারও করে। পরে অবশ্য তারা জামিনে মুক্তি পান। এ পর্যায়ে মামলাটির প্রাথমিক শুনানিকালে প্রতিদিনই তারা আদালতে হাজির ছিলেন। তাদের বিরুদ্ধে কানাডার ‘করাপশন অব ফরেন অফিসিয়াল অ্যাক্ট’ অনুযায়ী মামলা করা হয়েছে। গত কয়েকদিনের শুনানিতে এসএনসি-লাভালিনের বাংলাদেশি লোকাল এজেন্ট বিসিএল (বাংলাদেশ কনসালট্যান্ট লি:)-এর কর্ণধার মোহাম্মদ মোস্তফাও উপস্থিত ছিলেন। তিনি নিয়মিতভাবে যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস অঙ্গরাজ্যে বসবাস করেন বলে জানা যায়।
প্রাথমিক শুনানির প্রথমদিনেই বিচারক ঘোষণা দেন যে, এই মামলার শুনানি ও বিচারিক কার্যক্রমের ওপর সংবাদমাধ্যমে কোনো খবর প্রকাশ করা যাবে না। ১৯ তারিখে সিদ্ধান্ত ঘোষণার সময় তিনি আবারও সংবাদ প্রকাশে নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি পুনরুল্লেখ করেন। তবে এদিন ক্রাউন প্রসিকিউশন বিচাপতির দৃষ্টি আকর্ষণ করে মিডিয়া নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি উত্থাপন করলে বিচারপতি দৃঢ়তার সঙ্গে তা পুনর্ব্যক্ত করে বলেন, এই মামলার যথার্থতার স্বার্থে এই নিষেধাজ্ঞা আমাদের সকলকে মেনে চলতে হবে। কেউ নিষেধাজ্ঞা অমান্য করলে সেটাকে আদালত অবমাননা হিসেবে গণ্য করা হবে। তারপরও যারা এ বিষয়ে সংবাদ প্রকাশ করতে চান, তারা যথাযথ আইনী পরামর্শ সাপেক্ষে করবেন। এ সময় প্রবাসী আদালত কক্ষে উপস্থিত কলামিস্ট ড. মোজাম্মেল হক খান বিচারকের উদ্দেশে প্রশ্ন রাখেন যে, বিশ্ব ব্যাংক প্রচারিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিও কী নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়বে? উত্তরে বিচারক ম্যালকম ম্যাকলয়েড বলেন, সেক্ষেত্রে যথাযথ উদ্ধৃতি দিতে হবে।
স্মরণ করা যায় যে, এই মামলার দুই বিবাদী বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত কানাডীয় নাগরিক মোহাম্মদ ইসমাঈল ছিলেন এসএনসি-লাভালিনের পরিচালক এবং ভারতীয় বংশোদ্ভূত কানাডীয় নাগরিক রমেশ সাহা ছিলেন প্রতিষ্ঠানটির বিদেশি প্রকল্প বিষয়ক ভাইস প্রেসিডেন্ট। পদ্মা সেতু প্রকল্পের পরামর্শক হিসাবে কাজ পেতে প্রতিষ্ঠানের পক্ষে এরা দুই জন বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ করেছেন। আর তখনই তারা ঘুষ লেনদেনের বিষয়টি প্রক্রিয়াকরণ করেন বলে অভিযোগ করা হয়। কানাডীয় পুলিশ ইতিমধ্যেই উক্ত দুই অভিযুক্তের ব্যক্তিগত ল্যাপটপ ও ডায়েরিসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন আলামত এবং প্রয়োজনীয় নথিপত্র জব্দ করে আদালতে উপস্থাপন করেছে। এরমধ্যে রমেশ সাহার ব্যক্তিগত ডায়েরিতে পাওয়া গেছে ঘুষের টাকার নানা হিসাব-নিকাশ। ওই ডায়েরির বরাতে ইতিমধ্যেই গণমাধ্যমে একাধিক খবর প্রকাশিত হয়েছে।
অপরদিকে পদ্মা সেতু প্রকল্পে ঘুষ-দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার প্রেক্ষাপটে বিশ্ব ব্যাংক গত বুধবার কানাডার বৃহত্তম নির্মাণ প্রকৌশল প্রতিষ্ঠান এসএনসি-লাভালিনকে ১০ বছরের জন্য নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। একই সঙ্গে এসএনসি-লাভালিনের এফিলিয়েটেড শতাধিক প্রতিষ্ঠানকেও নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
এদিকে ইত্তেফাকের কানাডা প্রতিনিধি সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল জানিয়েছেন, প্রাথমিক শুনানির সমাপনী দিনে অভিযুক্ত দুই আসামির আইনজীবিগণ সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে মামলার শুনানি প্রক্রিয়ায় সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তবে তারা উভয়েই নিজেদের মক্কেলদের নির্দোষ বলে দাবি করেছেন।
