বাংলা যেহেতু আমার প্রাণের ভাষা, তাই কিছুটা অগ্রাধিকার তো থাকবেই :অপর্ণা সেন

আপডেট : ২১ এপ্রিল ২০১৩, ১৯:৩৯
বাংলা চলচ্চিত্র অঙ্গনে অপর্ণা সেন এক অনন্য নাম। তবে তার সেই সুখ্যাতি ছিল অভিনয়ে। কিন্তু কালের খেয়া’য় অপর্ণা সেন আজ এমন এক ব্যক্তিতে পরিণত, যা এখন শুধু অভিনয় না পরিচালনায় তা পরিমাপ করাটা কঠিন। আজ যেন তার অভিনেত্রী পরিচয়টিও ছাপিয়ে গেছে পরিচালক অপর্ণা সেনের পরিচয়টি। এবারের পহেলা বৈশাখে রিলিজ হয়েছে তার নতুন চলচ্চিত্র ‘গয়নার বাক্স’। নারীবাদী এই চলচ্চিত্র ছাড়াও নারীবিষয়ক ম্যাগাজিন ‘পরমা’র সম্পাদক কথা বললেন বিনোদন প্রতিদিন-এর সাথে। কলকাতার এক অভিজাত কনভেনশন হলে চলছে ‘গয়নার বাক্স’ চলচ্চিত্রের প্রিমিয়ার। ভেঙ্কটেশ ফিল্মসের আয়োজনে এই প্রিমিয়ারই নাকি কলকাতাবাসীর সামনে সবচেয়ে জাঁকজমক প্রিমিয়ার। বিশাল সাইজের ‘গয়নার বাক্স’ সমেত আলো-আঁধারীর খেলায় সাজানো হয়েছে। গয়নার বাক্সের পাশে দাঁড়িয়ে আছেন ছবির কলাকুশলীরা। পশ্চিমবাংলার অধিকাংশ জনপ্রিয় নির্মাতা আর কলাকুশলীরাও এসেছেন। বিশেষ করে ভেঙ্কটেশ ফিল্মসের ঘনিষ্ঠ তারকাদের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। কলকাতার চলচ্চিত্র শিল্পে ভেঙ্কটেশ ফিল্মসের দাপট বেশ ক’বছর ধরে। এই প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানই চ্যালেঞ্জ দিয়ে জন্ম দিয়েছেন দেবের মতো তারকাদের। অপর্ণা সেনের এই চলচ্চিত্রের কথাই ধরা যাক। ছবিটি প্রথম দিকে অন্য প্রযোজনায় থাকলেও ছবির প্রমোশন ও যেকোনো উপায়ে ছবিটি হিট করার অংক খুঁজতেই নাকি ছবিটি পরে ভেঙ্কটেশ ফিল্মসের কাছে দিয়েছেন অপর্ণা সেন। এমনকি প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের চাপে নাকি ছবির শেষ ২৬ মিনিট ফেলে দিতে বাধ্য হয়েছেন। অবশ্য ছবির এইসব খুঁটিনাটি এ দেশের দর্শকদের জন্য বরাদ্দ থাকুক। আমি স্রেফ বাংলাদেশের পাঠকদের কথা চিন্তা করেই প্রশ্ন গোছালাম। শুনলাম বরাবরই এই প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান নাকি ডিরেক্টর-আর্টিস্টদের ডমিনেট করেন ইচ্ছেমতো। প্রিমিয়ারের আলোকোজ্জ্বলতায় ব্যস্ত অপর্ণা সেন, কঙ্কনা সেন, মৌসুমী চট্টোপাধ্যায়সহ অনেকে। নির্ধারিত পিআর পার্টনার আর চ্যানেল ক্যামেরা ছাড়া কারও ক্যামেরা প্রবেশ নিষেধ। এমনকি মোবাইল দিয়েও ছবি তুলতে বারণ করছেন আয়োজকেরা। ছবির জন্য অন্য সাংবাদিকদের নিজস্ব লিংক দিয়ে দেওয়া হচ্ছে তত্ক্ষণাত্। প্রেস রিলিজও মেইল করে দেওয়া হচ্ছে। দারুণ ডিজিটাল সংযোগ। আমি ফুরসত খুঁজছি অপর্ণা সেনের সাথে কথা বলার। অবশেষে সুযোগ মিলতেই... আপনার ‘পরমা’, ‘পারমিতার একদিন’ অতঃপর ‘গয়নার বাক্স’—এ তিনটি চলচ্চিত্র নারীকেন্দ্রিক। এটা কি ইচ্ছে করেই? অর্থাত্ ‘সানন্দা’ অতঃপর ‘পরমা’র সম্পাদক বলেই কি নিজের দায়িত্বসুলভ এই ছবিগুলো বানাচ্ছেন? না, এটা কাকতালীয়। তবে আমি এই ফেমিনিস্ট ছবিগুলোর ভেতর দিয়েই একটা মেসেজ দিয়ে দিতে চাই। আর পুরুষদের নিয়ে বা সমাজের অন্য চরিত্রদের নিয়ে ভাববার তো মানুষ অনেক আছে। আমি না হয় ওদিকটায় একটু কমই ভাবলাম। তবে ছবির গল্প তৈরির সময় কিন্তু এইসব খেয়াল থাকে না। গল্পের প্রতি নিজের ভালো লাগাটাই প্রাধান্য দিতে থাকি। সেটা কী রকম হবে বা কোন ক্যাটাগরিতে চলে যাবে, তা নিয়ে ভাববে সমালোচকেরা। আমি বলব ‘গয়নার বাক্স’টা আমার সেরা ফেমিনিস্ট ক্যাটাগরির ছবি। শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের কাহিনী অবলম্বনে আপনার ‘গয়নার বাক্স’। কিছুদিন আগে কথা সাহিত্যিক সুচিত্রা ভট্টাচার্য তার এক সাক্ষাত্কারে বেশ অভিযোগের সুরেই বললেন, ‘চিত্রনির্মাতারা তাদের সাহিত্য নিয়ে কাজ করার পর তা আর নাকি তাদের সিনেমা থাকে না। চিত্রপরিচালকদের হাতে ছিনতাই হয়ে যায়’। (ভ্রু কুঁচকে) নাহ। এই দ্বন্দ্বটা বোধ হয় ঠিক নয়। সুচিত্রাদিও নিশ্চয়ই এই অর্থে বলেননি। কারণ আমি বরং দেখেছি কোনো বিখ্যাত কাহিনী নিয়ে চলচ্চিত্র রিলিজ হলে সেই বইয়ের বিক্রি আরও বেড়ে যায়। এটা সব সময় হয়ে থাকে। সুতরাং এই চলচ্চিত্র নির্মাণ প্রক্রিয়াকে আমি বলব সাহিত্যের জন্য অনেকটা সহায়ক। এখন তো দুই বাংলার চলচ্চিত্র বিনিময়ের কথা চলছে। অর্থাত্ আমাদের ঢালিউড ও টালিউড। আপনার মতামত শুনতে চাইছি। এটা আমিও কিছুটা শুনেছি। দীর্ঘদিন বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের সাথে খুব একটা পরিচয় নেই। তবে বিভিন্ন চলচ্চিত্র উত্সবে যে কটি চলচ্চিত্র দেখেছি, তাতে মনে হয়েছে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রও অনেকখানি এগিয়েছে। আর আমি বলব ভাষাগত দিক থেকে যেহেতু দুটি দেশের সাদৃশ্য বর্তমান, তাই এখানে দুই বাংলার মাঝে দেয়াল বাঁধিয়ে তো কারোরই লাভ হচ্ছে না। আমি শুনেছি আমাদের চলচ্চিত্রের ডিভিডিগুলো সেখানে পাওয়া যায়। এবং বিক্রি হয় দেদারসে। কিন্তু সবই নাকি পাইরেটেড। এ ক্ষেত্রে কিন্তু আমিও আমার অরজিনালটা বাংলাদেশি দর্শকদের দেখাতে পারছি না। হুমম, যে পাইরেসিটা চলছে সেটা অবশ্য দুই বাংলাতেই বর্তমান। একটু অন্য প্রসঙ্গে আসি, চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে এই যে ভাষার কথা বললেন আপনি। কিন্তু কলকাতার তরুণদের তো এখন তিন ভাষায় প্রতিদিন সকাল থেকে রাত কাটতে দেখছি আমরা। এই জেনারেশনকে নিয়ে আপনারা কি চিন্তিত? নাকি একসময় কলকাতার নির্মাতারা হিন্দি ডাব সিনেমায় বাংলা সাবটাইটেল দেবে? এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। চিন্তার প্রশ্ন। কলকাতায় এখনও আইন করে বাংলা সাইনবোর্ড রাখা হচ্ছে। কলকাতার নেক্সট জেনারেশনে বাংলাটাকে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্যই আমি মনে করি, আমাদের সিনেমা আন্দোলনটা অনেকখানি গুরুত্ব পাচ্ছে। এখানে কিন্তু এখনও কোনো ভালো বাংলা ছবির বক্স অফিসের কাছে হিন্দি ছবির বিজনেস ভালো হয় না। এর সবই কিন্তু ইতিবাচক। আমি তো মন-প্রাণ থেকে চাইবই এই পশ্চিমবাংলায় বাংলায় বাংলার আধিপত্য ক্রমশ বাড়ুক। তবে কি জানেন, সেই বাংলা সাবটাইটেল হওয়ার আশঙ্কা মনের ভেতর জাগলেও খারাপ লাগে। এটা হবে না নিশ্চয়ই। কলকাতায় ইদানীংকালে, ভূতের ছবি বা ফ্যান্টাসির ছবিটা বাড়ছে। সর্বশেষ বক্স অফিসে আপনাদের ‘ভূতের ভবিষ্যত্’ ছবিটি নাকি খুব সাড়া জাগিয়েছে। সেই সাফল্যের সূত্রেই কি ‘গয়নার বাক্স’ তৈরি করা? নাহ। এটা একেবারে ভুল ও অবান্তর ভাবনা। দেখুন, শীর্ষেন্দু দা’র এই উপন্যাসটি বই আকারে বের হওয়ার পরপরই আমি পড়ে তাকে বলেছিলাম ছবিটি নিয়ে আমি চলচ্চিত্র তৈরি করব। কিন্তু করা হয়ে ওঠেনি। তখন কিন্তু আজকের ‘ভূতের ভবিষ্যত্’-এর জন্মও হয়নি। এর ভেতর আমার কয়েকটি ছবিও রিলিজ হয়েছে। আসলে লোকেশন কাস্টিং থেকে শুরু করে সব ব্যাটে বলে মেলানো যাচ্ছিল না বলেই ‘গয়নার বাক্স’-এর কাজটা শুরু করা সম্ভব হয়নি। আর আমি বলব এই ১০ বছরের বিলম্বটা হয়ে এক অর্থেই ভালোই হয়েছে আমার জন্য। আগামীকাল সমাপ্য