‘ সমস্যা আসলে ধর্মে না মানসিকতায় ’

আপডেট : ২১ এপ্রিল ২০১৩, ১৯:৪৯
গত বিশ বছরে আমাদের দেশে শিক্ষায় যেমন নারী এগিয়ে এসেছে অনেকটা পথ তেমনি কর্মক্ষেত্রেও নারীর পদচারণা বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। আর একটি চ্যালেঞ্জিং পেশা হিসেবে সাংবাদিকতার গুরুত্ব অনেক বেশি। নারী পুরুষের কাজের সীমানা পার হয়ে নিজের প্যাশনের জায়গা থেকে সাংবাদিকতায় এগিয়ে আসছেন অনেক নারী। কিন্তু চলতি মাসের ৬ তারিখে রচিত হয় এক কালো অধ্যায়। দায়িত্ব পালনরত অবস্থায় হামলার শিকার হন সাংবাদিক নাদিয়া শারমিন। এহেন পৈশাচিক ঘটনায় পুরো দেশ ক্ষুব্ধ। কিন্তু সাংবাদিকতা পেশায় নারীর নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে নতুন করে। এই নিয়ে বিশিষ্টজনরা তাদের অভিমত দিয়েছেন। প্রতিবেদনটি লিখেছেন— লাজিনা জ্যাসলিন হামিদা হোসেন চেয়ারপার্সন, আইন ও শালিসকেন্দ্র নারী সাংবাদিকদের ওপর হামলা অবশ্যই একটি জঘন্য অপরাধ। কোন অপরাধ কারা করছে, কোন সংগঠন করছে তার প্রমাণ পাওয়া গেলে ক্রিমিনাল কেইস করা যায়। ঘটনা প্রমাণে মিডিয়ারও একটা দায়বদ্ধতা থেকে যায়। তাছাড়া আমাদের প্রতিষ্ঠান থেকে ভিকটিমকে আইনগত সহায়তা আমরা করে থাকি। তবে সেক্ষেত্রে আমাদের কাছে লিখিত অভিযোগ করতে হয়। সমাজে নারী নিজের কর্মদক্ষ্যতা ও যোগ্যতার বলে একটি শক্ত অবস্থান তৈরি করতে চলেছে। এই অবদান আমাদের অস্বীকার করার উপায় নেই। আর নারীর এই ক্রম অগ্রগতিই যেন পুরুষদের মধ্যে ভীতির সঞ্চার করছে। গণমাধ্যমে নারী সব ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখছে। একজন সাংবাদিক নারী পুরুষের মতো করেই কাজ করে। এখানে কাজের ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের কোনো ভেদাভেদ নেই। সাংবাদিক নাদিয়ার ওপর হাত তোলা তাই প্রমাণ করে। এ ঘটনা ধর্মের নামে নারী নির্যাতন প্রকাশ করেছে। ধর্মের নামে যারা উচ্ছৃঙ্খলতা করে তাদের শাস্তি হওয়া উচিত। কারণ ধর্মে নারীকে সম্মান ও মর্যাদার আসন দিয়েছে। == নাদিয়া শারমিন স্টাফ রিপোর্টার, ইটিভি নারী সাংবাদিকদের নিরাপত্তা আসলে কখনোই রক্ষিত হয়নি। কর্মক্ষেত্রে নারী-পুরুষ উভয়ই নিরাপত্তাহীনতায় থাকে। সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির জন্যই নারীর অবস্থান শক্ত হয়নি এখনো। চেষ্টা চলছে তবে এখনো অনেকটা পথ বাকী। যতদিন না পর্যন্ত সবার মানসিকতার পরিবর্তন হবে, নারীরা ঐক্যবদ্ধ শক্তি নিয়ে এগিয়ে আসবে নিজেকে প্রমাণে ততদিন এই সমস্যা থাকবেই। সমস্যা আসলে ধর্মে না মানসিকতায়। তাই নারী এখনো ধর্মের অপব্যাখ্যাকারীদের হুমকির মুখে। তবে এসব নির্যাতনের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করে বিচার নিশ্চিত করতে হবে। বিচার না হলে এই অপচর্চা চলতেই থাকবে। যা থেকে স্বয়ং আমাদের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেত্রী কারো পরিত্রাণ নেই। সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, এই অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে সর্বপ্রথম যেটি প্রয়োজন তা হলো এসব নারী সাংবাদিকদের ওপর হামলাকারীদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা। জানা গেছে, সাংবাদিক নাদিয়া শারমিনের ওপর হামলাকারীদের ভিডিও ফুটেজ দুইটি চ্যানেলে প্রচারিত হয়েছে। এগুলো থেকে খুব সহজেই অপরাধীদের শনাক্ত করা সম্ভব। == রহুল আমিন গাজী প্রেসিডেন্ট বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন আমরা শুধু নারী নয়, পুরো সাংবাদিক সমাজের ওপর হামলার বিরুদ্ধে। এজন্য আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছি। সরকারের কাছে একাধিক আবেদনও পাঠিয়েছি। কিন্তু সেগুলো আমলে নেয়া হচ্ছে না। সাংবাদিক নাদিয়াসহ আরো যেসব সাংবাদিক তাদের পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে হতাহতের শিকার হয়েছেন এবং সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডসহ অতীতে যেসব হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে তার বিরুদ্ধে তীব্র আন্দোলন গড়ে তুলব। == মঞ্জুরুল আহসান বুলবুল সাবেক মহাসচিব বাংলাদেশ সাংবাদিক ইউনিয়ন সাংবাদিকদের ওপর সহিংস হামলা আমাদের উপমহাদেশে চর্চিত বিষয়। তবে বর্তমানে সাংবাদিক নারীর উপরও আঘাত আসায় তা আমাদের নজরে গুরুত্ব সহকারে উঠে আসছে। আমাদের উপর আসা সকল আক্রমণ, হত্যা, নির্যাতনের বিরুদ্ধে অবস্থান নেব, প্রতিবাদ জানাব। আশা করবো সরকার এ বিষয়ে বিশেষ দৃষ্টি দিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। == তাসমিমা হোসেন সম্পাদক, পাক্ষিক অনন্যা একজন নারী সাংবাদিকের ওপর হামলার মধ্য দিয়ে আমরা হেফাজতে ইসলামের এক নির্লজ্জ নিদর্শন প্রত্যক্ষ করলাম। নারী নির্যাতনের ইতিহাস সুদীর্ঘকালের। ধর্মের নামে পুরুষতান্ত্রিক এই সমাজে প্রথম ধাক্কাটি যে বার বার সহ্য করতে হয়েছে এই পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীটিকেই। সেই খেলাতেই মাততে চাইছিলো হেফাজতে ইসলাম নামক সংগঠনটিও। একজন নারীকে আহত করে তারা আবারো বুঝিয়ে দিতে চাইছে ‘নারী তুমি দুর্বল, তুমি ভীত- আবার ফিরে যাও ঘরে’। এই আক্রমণটা আসলে পুরো নারী সমাজকে সতর্ক করে। === শাহনাজ বেগম বিশেষ প্রতিনিধি, দ্যা ডেইলি ইন্ডিপেন্ডেন্ট সাংবাদিকতা পেশা নারী ও পুরুষ উভয়ের জন্যই ঝুঁকিপূর্ণ। এখানে আর্থিক, সামাজিক, শারীরিক সব ধরনের অনিশ্চয়তা রয়েছে। তাই যারা এই পেশায় আসতে আগ্রহী তাদের এই বিষয়গুলো মাথায় নিয়েই আসতে হবে। ইটিভির সাংবাদিক নাদিয়া শারমিনের ওপর হেফাজতে ইসলামের সদস্যরা যে আঘাত হেনেছে, সেটি শুধু একজন সাংবাদিক নয় পুরো মিডিয়ার ওপর আক্রমণ করা হয়েছে। এটুকু বলতে পারি আমাদের সমাজ নারীর মর্যাদা দেয়। নারীবান্ধব প্রচুর আইনও রয়েছে। == নাদীরা কিরণ এ্যাসিস্টেন্ট চিফ রিপোর্টার, এটিএন বাংলা স্বাধীনতার ৪২ বছরেও আমাদের দেশে নারীকে সম্মান করা, সব কাজে সমানভাবে দেখা এবং নারীর কষ্টার্জিত অবস্থানকে মেনে নেয়ার জন্য সমাজ এখনো প্রস্তুত হতে পারেনি। নাদীয়া শারমিনের উপর এই আঘতের প্রেক্ষিতে বলতে চাই, এটা শুধু নাদিয়াকে আঘাত করা না, সমগ্র জাতিকে আঘাত করা। ধর্মান্ধতা সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ব্যাপকভাবে বিস্তর লাভ করেছে। কোনো সরকার তা প্রতিরোধ করার প্রয়োজন বোধ করেনি। এই অবস্থায় সাংবাদিকদের সংগঠিত হওয়ার কোনো বিকল্প নেই।