পাখী সব করে রব, রাতি পোহাইল।
কাননে কুসুমকলি সকলি ফুটিল।
রাখাল গরুর পাল লয়ে যায় মাঠে।
শিশুগণ দেয় মন নিজ নিজ পাঠে।
গোলাপী কভারের পাতলা একটি বই। হাতে ধরিয়ে দেয়া হতো ‘হাতে খড়ির’ দিন। ‘হাতে খড়ি’ হলো শিশুর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার শুভসূচনা। বর্ণমালা,
বোধোদয় এসবের সাথে থাকতো ‘শিশু-শিক্ষা’ বইটি। ‘কমল ফুটিল। ভাল সৌরভ ছুটিল। পাঠের সময় গোল করিও না। গুরুমহাশয় রাগ করিবেন’
- ইত্যাদি শিক্ষণীয় ছোট ছোট বাক্যগুলো আজো হূদয়ে গভীরভাবে স্থায়ীহয়ে আছে। পরবর্তীকালের অনেক সমালোচককে বলতে শুনেছি - এত ভারি
ভারি শব্দগুচ্ছ শিশু-মনে পড়ার আনন্দে ব্যাঘাত ঘটায়। কিন্তু একথা আমি কিছুতেই মানতে পারিনি। কানন, কুসুম, কমল, সৌরভ প্রভৃতি শব্দের অর্থ জানবার জন্য আমরা অনাগ্রহ প্রকাশ করেছি বলে কখনও স্মরণে আসে না। শিশু-মনে জানবার ইচ্ছেটা থাকে অনেক বেশি। অনেকেই শিশুর অতিরিক্ত জানবার ইচ্ছেকে বকুনি দিয়ে দমাতে চান। এটি শিশুর মানসিক বিকাশে অনেকখানি প্রভাব ফেলে। মদনমোহন তর্কালঙ্কারের পারিবারিক উপাধিচট্টোপাধ্যায়। পিতা রামধনচট্টোপাধ্যায়। মদনমোহনপশ্চিমবঙ্গের নদীয়া জেলার বিল্ব গ্রামে (১৮১৭) জন্মগ্রহণ করেন। স্বগ্রামে প্রাথমিক শিক্ষা শেষে ভর্তি হন কলকাতারসংসড়ৃত কলেজে। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ছিলেন তাঁর সতীর্থ এবং অন্তরঙ্গবন্ধু। সাহিত্য, ব্যাকরণ, অলংকার শাস্ত্র, জ্যোতিষ শাস্ত্র এবং স্মৃতি শাস্ত্রঅধ্যয়ন করেন। তিনি হিন্দু ল’ কমিটি থেকে জজ-পণ্ডিতের সার্টিফিকেট
(১৮৪১) লাভ করেন। হিন্দু কলেজ পাঠশালা, ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ, কৃষ্ণনগরকলেজ, সংস্কৃত কলেজে অধ্যাপনা করেন। ১৮৫৫ তে ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট নিযুক্ত হন। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের সহযোগিতায় তিনি সংস্কৃত-যন্ত্র (১৮৪৭) ছাপাখানা স্থাপন করেন। যেখান থেকে প্রথম ভারতচন্দ্র রায়গুণাকরের ‘অন্নদামঙ্গল’ কাব্য মুদ্রিত হয়। তিনি সংস্কারমুক্ত ও শিড়্গানুরাগী ছিলেন। বিধবা বিবাহ এবং নারী শিড়্গার প্রসারে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। ‘সব’-শুভঙ্করী’ নামক পত্রিকায় ‘নারী শিক্ষা’ বিষয়ক তাত্পর্যপূর্ণ প্রবন্ধ লিখে সেকালের শিক্ষিত সমাজের সমর্থন লাভ করেন। সামাজিক নিন্দার বিষয়টিকে গ্রাহ্য না করে নিজ কন্যদ্বয়কে ‘হিন্দু ফিমেল স্কুল’ এ ভর্তি করেন এবং বিনাবেতনে ছাত্রীদের শিক্ষা দান করেন। সেসময় প্রকাশ্যে মেয়েদের স্কুলে যাওয়া গর্হিত বলে বিবেচিত হতো। তিনি আনন্দমোহন বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা ছাড়াও অনাথ আশ্রম, দাতব্য চিকিত্সালয়, ইংরেজি স্কুল ইত্যাদি প্রতিষ্ঠান স্থাপন করেন। রসতরঙ্গিনী (১৮৩৪) এবং বাসবদত্তা (১৮৩৬) তাঁর মৌলিক কাব্যগ্রন্থ। তাঁর অন্যতম সাহিত্যকর্ম তিন খণ্ডে প্রকাশিত ‘শিশু-শিক্ষা’ পুস্তকখানি। সংস্কৃতেও তিনি বেশ কিছু গ্রন্থ সম্পাদনা করেছেন। তাঁর কবি প্রতিভার জন্য সংস্কৃত কলেজ থেকে ‘কাব্য-রত্নাকর’ এবং পাণ্ডিত্যর জন্য ‘তর্কালঙ্কার’ উপাধি লাভ করেন।
