বোস্টন বিস্ফোরণে বিহ্বল যুক্তরাষ্ট্র

আপডেট : ২১ এপ্রিল ২০১৩, ২০:২৩
অতীতের ক্ষত ১৬ ডিসেম্বর, ১৯২০ ওয়াল স্ট্রিটে ঘোড়ার গাড়িতে রাখা বোমা বিস্ফোরণে নিহত হয় ৩৫ জন। কিনারা না-হওয়া এ সন্ত্রাসের সন্দেহের তীর ছিল বলশেভিকদের দিকে। ২৬ ফেব্রুয়ারি, ১৯৯৩ ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের বেসমেন্টের গ্যারেজে বিস্ফোরণ। এক হাজারের বেশি আহত, নিহত হয় ৬ জন। আল-কায়দাকে সন্দেহ করা হয়। ১৯ এপ্রিল, ১৯৯৫ ওকলাহোমার ফেডারেল অফিস ভবনের বাইরে বিস্ফোরণ। নিহত ১৯ শিশু। ২২০টি বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত। ১১ সেপ্টেম্বর, ২০০১ ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে যাত্রীবাহী দুটি বিমান হামলা। নিহত দুই হাজার ৯৯২ জন। অভিযুক্ত আল কায়দা। ১ মে, ২০১০ নিউ ইয়র্কের টাইম স্কয়ারে গাড়িবোমা বিস্ফোরণের চেষ্টা। ১৭ জানুয়ারি, ২০১১ ওয়াশিংটনে স্পকেনে মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র মেমোরিয়াল মার্চের রাস্তায় পাইপ বোমা। বোমাটি নিষ্ক্রিয় করা হয়। ফের আক্রান্ত মার্কিন ভূখন্ড। এবারও রেও লক্ষ্য সাধারণ মানুষ। ১১৬ বছরেরও ঐতিহ্যময় বোস্টন ম্যারাথনকেই এ বার বেছে নেয় সন্ত্রাসীরা। ১৮৯৭ থেকে ২০১২ সালের অজস্র বর্ণময় মুহূর্তের সাক্ষী হয়েছে বোস্টনের রাজপথ। কিন্তু ২০১৩-কে ভোলা যাবে না কখনওই। যেভাবে শুরু: স্থানীয় সময় দুপুর দুটো পঞ্চাশ। চার ঘণ্টা আগে শুরু হয়েছে বোস্টন ম্যারাথন। সাধারণত এই সময়টাতেই ফিনিশিং লাইনের চারপাশে সবচেয়ে বেশি ভিড়। জেতা নয়, দৌড় শেষ করার মানসিকতা নিয়েই ম্যারাথনে যোগ দিতে প্রতি বছর আসেন হাজার হাজার মানুষ। গড়ে প্রায় পাঁচ লক্ষ মানুষের সমাগম হয় দৌড় দেখতে। ঘামে ভেজা শরীরগুলো একে একে পার করে যাচ্ছে ফিনিশিং লাইন আর পরিচিতদের মুখ থেকে বেরিয়ে আসছে খুশির চিত্কার। তারপরই অবসন্ন মানুষগুলোর হাতে গ্লুকোজের বোতল ধরিয়ে দিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় বিশ্রামের জায়গায়। এতোদিন তো এটাই ছিল চেনা দৃশ্য। কিন্তু ১১৬ বছরের ইতিহাস মুছে দেয় ২০১৩। দুপুর ২টা ৫০ মিনিটে প্রবল শব্দে বিস্ফোরণ। হামলা হয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিতীয় জনপ্রিয় প্রতিযোগিতায়। ফিনিশিং লাইনের পরিস্থিতি তখন নারকীয়। বারুদের ঝাঁঝালো ধোঁয়ায়, রক্তে, পোড়া মাংসের গন্ধে আর ছিন্নভিন্ন দেহাংশে পরিচিত বয়লস্টন স্ট্রিটকে তখন আর চেনা যায় না। আশপাশে অজস্র ক্ষতবিক্ষত দেহ। কয়েকটি শিশুও রয়েছে সেই দলে। বোমা দু’টিতে বিস্ফোরক হিসেবে বারুদ ছিল। আর ছিল অজস্র বল বেয়ারিংয়ের টুকরো। বোমাটি ভূমিতলের কাছাকাছি উচ্চতাতেই ছিল। তাই ফাটার সঙ্গে সঙ্গে বল বেয়ারিংগুলি বেশি উচ্চতায় ওঠেনি। যারা আহত হয়েছেন তাদের আঘাত মূলত দেহের নিচের দিকে। দর্শক শিশুদের উচ্চতা বেশি না হওয়ার ফলে বোমার স্লিন্টারের আঘাত তাদের ক্ষেত্রে গুরুতর হয়েছে। বিস্ফোরণের কিছুক্ষণের মধ্যেই ম্যাসাচুসেটস জেনারেল হাসপাতালে উপচে পড়া ভিড়। একের পর এক রক্তাক্ত দেহ এসে হাজির হয়েছে সেখানে। বেশির ভাগেরই পা শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন। সন্দেহভাজনদের সন্ধানে: ভিড়ে ঠাসা ফুটপাথ। সকলেরই নজর ছিল রাস্তার দিকে। একঝাঁক প্রতিযোগী তখন গলদঘর্ম অবস্থায় দৌড়ে পার করছেন ওই এলাকা। এমনই সময়ে মাথায় টুপি, চোখে কালো চশমা পরা এক ব্যক্তি সবার চোখ এড়িয়ে ফুটপাথের ধারে নামিয়ে রাখলেন কাঁধের ব্যাগ। কে এই ব্যক্তি? কেনই বা নামানো হল কাঁধের কালো রংয়ের মজবুত গোছের ব্যাগটা? একদিন আগেই তো এই এলাকা থেকেই বোস্টনের ফরেনসিক বিভাগ খুঁজে পেয়েছে কালো রংয়ের নাইলনের টুকরো। যা থেকে অনুমান করা হচ্ছে নাইলনের ওই কালো ব্যাগেই বয়ে আনা হয়েছে অন্তত একটা ছয় লিটারের প্রেসার কুকার। শহরের বিভিন্ন জায়গায় নজর রাখার জন্য পুলিশ ও কর্পোরেশন থেকে মোতায়েন রাখা ছিল অজস্র ক্যামেরা। পাঁচ লক্ষ দর্শকের ভিড়ে মিশে থাকা অপরাধী নিরাপত্তারক্ষীদের চোখে ফাঁকি দিতে পারলেও পারেননি ক্যামেরার যান্ত্রিক চোখে ধুলো দিতে। শহরের নজরদারি ক্যামেরা ছাড়াও কাছেই একটি দোকানের দরজায় লাগানো ক্যামেরাতেও ওই ব্যক্তির ছবি ধরা পড়ে। আগেই ফরেনসিক বিভাগের তদন্তে জানা গিয়েছিল, ঘটনাস্থল থেকে ব্যাগের ছিন্ন অংশ ছাড়াও খুঁজে পাওয়া যায় তিন ভোল্টের ব্যাটারি, ছোট একটি সার্কিট বোর্ড, বিস্ফোরণে ব্যবহূত ধাতুর টুকরোও। অতপর বন্দুকযুদ্ধ:হাড় হিম করা কোনো হলিউডি চিত্রনাট্যের বাস্তব রূপ অভিনীত হয় বোস্টন বিস্ফোরণের তিন দিনের মাথায়। স্থান- বোস্টনের রাজপথ। সামনের এক কালো মার্সিডিজ গাড়িতে দুই সশস্ত্র অপরাধী, পর পর গুলি ছুড়ে চলে। আর পেছনে পাল্টা গুলি ছুড়তে ছুড়তে ধাওয়া করে সারি সারি পুলিশের গাড়ি। বোস্টন সংলগ্ন ছোট শহর ওয়াটারটাউনের রাস্তায় প্রায় সারারাত ধরে চলে এমনই নাটক। অবশেষে ভোর চারটে নাগাদ মার্কিন পুলিশ ঘোষণা করল দুই অভিযুক্তর একজন তামেরলান সারনায়েফ মারা পড়েছে পুলিশের সঙ্গে যুদ্ধে। গত বৃহস্পতিবার স্থানীয় সময় রাত ১১টা থেকে বোস্টন সংলগ্ন ওয়াটারটাউন শহরতলিতে চলে পুলিশ ও দুই অভিযুক্তর মধ্যে টানা পাঁচ ঘণ্টার রুদ্ধশ্বাস বন্দুকযুদ্ধ। হেলিকপ্টার ও ভারী অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে দিনভর অভিযানের পর বস্টন ম্যারাথনে বোমা হামলায় সন্দেহভাজন তরুণ জোখার সারনায়েভকে আহত অবস্থায় গ্রেফতার করেছে পুলিশ। বিস্ফোরণের নেপথ্যে যারা:সাংবাদিক সম্মেলনে ১৮ এপ্রিল বোস্টন ম্যারাথন দৌড়ে বিস্ফোরণ ঘটানোর জন্য দায়ী দুই ব্যক্তির ছবি (ভিডিও এবং স্থিরচিত্র) প্রকাশ করে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআই। সন্দেহভাজনদের পুরো পরিচয় জানিয়ে দিলেও প্রাথমিকভাবে তাদের নাম গোপন রাখার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। পুলিশি পরিভাষায় তারা তখনও সন্দেহভাজন-১ ও সন্দেহভাজন-২। তবে পুলিশ জানায় দুই অভিযুক্তই চেচেন বংশোদ্ভূদ ও গত এক বছর ধরে মার্কিন বাসিন্দা। সাধারণত মার্কিন পুলিশ অপরাধীদের খুঁটিনাটি এমন ভাবে প্রকাশ করে না। কিন্তু এ ক্ষেত্রে অবস্থার গুরুত্ব বুঝে যে কোনো উপায়ে অপরাধীদের খোঁজ পেতে মরিয়া ছিল বারাক ওবামা প্রশাসন। ছবি প্রকাশ করার এই সিদ্ধান্তই বোস্টন তদন্তের মোড় ঘুরিয়ে দিতে সাহায্য করেছে বলে বিশেষজ্ঞ মহলে মনে করা হচ্ছে। এফবিআই জানিয়েছে, সন্দেহভাজনরা সম্পর্কে দুই ভাই। তারা চেচেন বংশোদ্ভূত তবে কিরঘিজস্তানের বাসিন্দা। ইসলাম ধর্মাবলম্বী। এদের মধ্যে পুলিশের হাত যিনি ধরা পেরেছেন তার নাম জোখার সারনায়েভ। তিনি ডাক্তারি ছাত্র বলে জানিয়েছে পুলিশ। দ্বিতীয় দুর্ঘটনা: গত সপ্তাহে বোস্টনের পর বিস্ফোরণের বিপদে বিপর্যস্ত হয় টেক্সাস। তবে বোস্টনের মতো এ ঘটনার নেপথ্যে কোনো সন্ত্রাসবাদের হাত থাকার সম্ভাবনা মেলেনি, স্বস্তি এইটুকুই। টেক্সাসের একটি সার কারখানায় বিস্ফোরণে প্রাণ হারান অন্তত ১৫ জন। আহত দুইশ’র কাছাকাছি। টেক্সাসের ওয়াকোর অদূরে ছোট্ট শহর ওয়েস্টে ১৭ এপ্রিল স্থানীয় সময় সন্ধেয় এই দুর্ঘটনা ঘটে। বিস্ফোরণের তীব্রতা এতটাই বেশি ছিল যে তার সঙ্গে পরমাণু বোমা বিস্ফোরণের তুলনা করেছেন প্রত্যক্ষদর্শীরা।