ভুল হিসাব কষেছিলেন মোশাররফ!

আপডেট : ২১ এপ্রিল ২০১৩, ২০:২৩
পাকিস্তানের সাবেক সেনাশাসক পারভেজ মোশাররফ এখন পুলিশ হেফাজতে। ২০০৭ সালে তিনি যখন ক্ষমতায় তখন দেশের শীর্ষস্থানীয় বিচারকদের আটক করা হয়। এ অভিযোগে তার বিরুদ্ধে করা মামলায় বৃহস্পতিবার জামিন নিতে আদালতে যান তিনি। কিন্তু এ আবেদন খারিজ করে দেয় আদালত। তাকে গ্রেফতারের নির্দেশ দেয়া হয়। গ্রেফতার এড়াতে দ্রুত সেখান থেকে সরে পড়েন মোশাররফ। পরে তার খামার বাড়ি থেকে পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে। সর্বশেষ ১৪ দিনের বিচারিক হেফাজতে নিয়ে তাকে জিজ্ঞাসাবাদের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। মোশাররফকে ৪ মে আবার আদালতে হাজির করার নির্দেশ দেয়া হয়। আগামী মে মাসেই পাকিস্তানে নির্বাচন হওয়ার কথা রয়েছে। নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য দাখিল করা চারটি মনোনয়নপত্র বাতিল হওয়ার পর মোশাররফের সব সম্ভাবনা ধূসর হয়ে গেছে। এছাড়া গণতন্ত্র ব্যাহত করায় তাকে বিচারের আওতায় আনতে একটি প্রস্তাব অনুমোদন করেছে দেশটির পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষ সিনেট। শুক্রবার সর্বসম্মতিক্রমে সিনেটে এই প্রস্তাব পাস হয়। এ অবস্থায় চরম বিপদেই আছেন সাবেক প্রতাপশালী এই প্রেসিডেন্ট। পাকিস্তানের গণমাধ্যমগুলো মনে করছে সাবেক সেনাশাসক পারভেজ মোশাররফ পাকিস্তানে ফেরার বিষয়ে ভুল হিসাব কষেছিলেন। বিশেষ করে দেশের মেজাজ ও বিচারিক সম্ভাবনা নিয়ে তার সিদ্ধান্ত সঠিক ছিল না। তবে মোশাররফকে গ্রেফতারের পর দেশটির অনেক সংবাদপত্রের সম্পাদকীয়তে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে সংঘাত আরো বাড়বে। পাকিস্তানের প্রথমসারির সংবাদপত্র ডেইলি বিজনেস রেকর্ডার বলছে, জেনারেল পারভেজ মোশাররফের এখন লাভ ফেরত দেয়ার সময় এসেছে। কারণ ক্ষমতায় থাকাকালে তার কর্মকাণ্ডের জন্য তিনটি মামলার মুখোমুখি হতে হচ্ছে তাকে। পত্রিকাটি মনে করে তার দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত ভুল ছিলো। বিশেষ করে মোশাররফ তার অবস্থান ও দেশের মেজাজের বিষয়ে সঠিক মূল্যায়ন করতে পারেননি বলে মন্তব্য পত্রিকাটির। দ্য ডন বলছে, বিভিন্ন সময় ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছে, পারভেজ মোশাররফ দেশে ফিরলে গ্রেফতার হতে পারেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তার গ্রেফতার এখনো পর্যন্ত আশ্চর্য হওয়ার মতোই ঘটনা। উল্লেখ্য, পাকিস্তানের ইতিহাসে সাবেক কোনো সেনাপ্রধানের গ্রেফতার হওয়ার এটিই প্রথম ঘটনা। ডন আরো বলছে, দেশে ফেরার পর মোশাররফ শীতল অভ্যর্থনা পেয়েছেন। বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সুশীল সমাজের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, মোশাররফ তার রাজনৈতিক জীবনে কঠিন সময়ের মুখোমুখি হতে যাচ্ছেন। পাকিস্তানের মূলধারার অন্য একটি সংবাদপত্র দ্য এক্সপ্রেস ট্রিবিউন বলছে, পাকিস্তানে ফেরার সিদ্ধান্তের জন্য মোশাররফকে অনুশোচনা করতে হবে। উর্দু পত্রিকা উম্মত বলছে, আদালত তাকে কিছু ছাড় দিলেও দেশের ইতিহাস ও জাতি তাকে কখনো ক্ষমা করবে না। বিশ্বের অন্যান্য শাসকের মতো সেও তার কৃতকর্মের জন্য শাস্তি ভোগ করবে। আরেক উর্দু পত্রিকা জাসারাত বলছে, মোশাররফের জন্য পাকিস্তান পরিবর্তিত হয়ে গেছে। তার সঙ্গীরা একে একে তাকে ছেড়ে গেছে। এখন তিনি বিচার বিভাগের করুণার দিকে চেয়ে আছেন। তার গ্রেফতারের পর কিছু পত্রিকা বলছে, এর ফলে নতুন করে সংঘাত ও অনিশ্চয়তার সৃষ্টি হবে। দ্য নেশন বলছে, এ ঘটনা পাকিস্তানের রাজনীতি, সামরিক ও আইনের ক্ষেত্রে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে। এটা দেখতে খুবই চমকপ্রদ হবে যে পাকিস্তান তার সাবেক স্বৈরশাসকের বিচার কীভাবে করে। পত্রিকার সম্পাদকীয়তে বলা হচ্ছে, একটি চমকপূর্ণ সময়ের মধ্যদিয়ে যাচ্ছে পাকিস্তান। তাকে গ্রেফতারের ঘটনা দেশের অনিশ্চিত ভবিষ্যতে আরেক মাত্রা যোগ করল। এক্সপ্রেস ট্রিবিউন বলছে, এ ঘটনা নির্বাচন-পূর্ব জটিলতা বাড়িয়েছে। এখন তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে আদালতের আদেশ মানতে হবে। যদিও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মূল কাজ হলো নির্বাচন পরিচালনা করা। মোশাররফের মতো বিষয়ে সরকার জড়িয়ে পড়লে সে কাজে বিঘ্ন ঘটবে। শুধু গণমাধ্যমে নয় দেশটির সামাজিক মাধ্যমের নেটওয়ার্কগুলোতেও আলোচনা-সমালোচনা চলছে। আর বিশ্লেষকরা বলছে, আসন্ন সাধারণ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য দাখিল করা চারটি মনোনয়নপত্র বাতিল হওয়ার পর মোশাররফের জীবনের আকাশে কালো মেঘ জমেছে। তার রাজনৈতিক ভবিষ্যত্ প্রায় শেষ হয়ে গেল। মোশাররফ কি কখনো ভেবেছিলেন পাকিস্তানে তার জন্য এত কিছু অপেক্ষা করছে? হয়তো এর উত্তর একমাত্র তারই জানা। দেশে ফেরার মাস খানেক আগেই সামরিক বাহিনীর মোশাররফকে সতর্ক করেছিলো। তবে কেন দেশে ফেরার সাহস দেখালেন মোশাররফ। ১৯৯৯ সালে এক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা গ্রহণ করেন মোশাররফ। নওয়াজ শরীফকে ক্ষমতাচ্যুত করে সৌদি আরবে নির্বাসনে পাঠিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু সেই মোশাররফ দেশে ফেরার পর এখন পর্যন্ত মুখ খোলেননি নওয়াজ। ফলে অনেকেই সন্দেহ করছেন, মধ্যপ্রাচ্যের দেশটি মোশাররফের দেশে ফেরার পেছনে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। যে কারণে তালেবানের হত্যার হুমকিরও পরোয়া করেননি তিনি। আগামী ১১ মে দেশটিতে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচনে পারভেজ মোশাররফের নিজের দল অল পাকিস্তান মুসলিম লিগকে (এপিএমএল) নেতৃত্ব দিতে মোশাররফ পাঁচ বছরের স্বেচ্ছা নির্বাসন শেষে গতমাসে দেশে ফেরেন। বলা হচ্ছে মোশাররফ যদি সত্যিই কোনো বড় রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে পাকিস্তানে আসেন তাহলে তাকে গ্রেফতার করা কি ঠিক হবে। তবে ইসলামাবাদে গুজব রয়েছে মোশাররফ নির্বাচনের আগে দেশের রাজনীতির জল ঘোলা করতে এসেছেন। কেউ কেউ বলছেন, সাবেক প্রেসিডেন্ট জেনারেল মোশাররফের দেশে ফেরাটা মিসরের সাবেক স্বৈরশাসক হোসনি মোবারকের মতোই। তবে মোবারকের চেয়ে তার অবস্থা ভালো। দেশটির বর্তমান তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে করতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে। এর মধ্যে মোশাররফের আটক পরিস্থিতি সত্যিই পাকিস্তানের রাজনৈতিক ভবিষ্যেক অনিশ্চয়তার মুখে ফেলেছে।