মাদকের বাজার আফগানিস্তান

আপডেট : ২১ এপ্রিল ২০১৩, ২০:২৪
সারা বিশ্বের আফিমযুক্ত মাদকের ৯০ শতাংশই উত্পাদিত হয় আফগানিস্তানে। জনসংখ্যার আনুপাতিক হারে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি মাদকসেবী রয়েছে দেশটিতে। দেশটিতে এখন জনসংখ্যা সাড়ে ৩ কোটি। এর মধ্যে দশ লাখেরও বেশি মানুষ মাদকাসক্ত। কিন্তু সামপ্রতিক সময়ের আগ পর্যন্ত মাদকের সবচেয়ে বড় ভোক্তা দেশ ছিল না আফগানিস্তান। রাজধানী কাবুলের কেন্দ্রস্থলে, কাবুল নদীর পাথুরে তীরে নিয়মিত দেশের সবচেয়ে বড় ‘মাদকের বাজার’ বসে। এখানে মাদকাসক্তরা আসেন, নির্বিঘ্নে মাদক গ্রহণ করেন। এটি এমন একটি স্থান যা খুব সহজেই তাদের দুর্দশা ও পথভ্রস্টতা প্রকট আকারে প্রকাশ করে। প্রকাশ্য দিবালোকে বিপুল সংখ্যক মানুষ, বিশেষত তরুণরা একসঙ্গে বসে সিগারেটের মাধ্যমে কিংবা ইনজেকশনের মাধ্যমে মাদক সেবন করে থাকে। এদের অনেকেই শিক্ষিত। কেউ চিকিত্সক কেউ প্রকৌশলী আবার কেউবা দোভাষী। নাজাতে একটি মাদক নিরাময় কেন্দ্র পরিচালনা করেন তারিক সুলাইমান। তিনি এই ‘মাদকবাজারে’ প্রায়ই আসেন, মাদকাসক্ত লোকজনকে যথোপযুক্ত চিকিত্সা গ্রহণে উদ্বুদ্ধ করতে। তিনি বলেন, ‘আমরা আমাদের সন্তানদের প্রতিদিনই হারাচ্ছি, আত্নঘাতী হামলা, রকেট এবং বোমা হামলার মাধ্যমে। কিন্তু এখন সন্ত্রাসের একটি নতুন ধারা, মাদকের মাধ্যমে দেশবসাসীকে হত্যা করা হচ্ছে।’ আফগানিস্তানের উত্তরাঞ্চলীয় এলাকা বাদাখশানের বাসিন্দা জাওয়াইদ। তার এখন বয়স ১৮। জাওয়াইদের মাদকের হাতেখড়ি ১০ বছর বয়সে, তার চাচার কাছে। জমিতে আরো বেশি কাজ করার জন্য তাকে মাদক দেয়া হতো। তাকে বলা হতো মাদক নিলে আগের চেয়েও বেশি কাজ করা যাবে। জাওয়াইদ বলেন, ‘আমি আমার এই জীবনকে ঘৃণা করি। প্রত্যেকেই আমাকে ঘৃণা করে। এই সময়ে আমার স্কুলে যাওয়ার কথা ছিল। অথচ আমি এখন মাদকাসক্ত।’ জাওয়াইদের বাবা মারা গেছেন অনেক আগেই। তার পঙ্গু মা সন্তানের এই অপরিবর্তিত অবস্থা দেখে উদ্বিগ্ন ও ভীত। তিনি সবসময়ই চান তার সন্তান সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবন যাপন করুক। সন্তান যাতে মাদকের অর্থ যোগাতে চুরি বা ছিনতাই না করেন সেজন্য তিনি ভিক্ষা করে সন্তদানের নেশার অর্থ যোগাচ্ছেন। তিনি বলেন, ‘আমি সবসময়ই জাওয়াইদকে বলে আসছি, আমি যদি মারা যাই, তবে অন্যসব মাদকসেবীর মতো, তোর ভাগ্য হবে ওই ব্রিজের নিচে (এখানে মাদকসেবীদের নিয়মিত আড্ডা বসে)।’ পুলিশ প্রায়ই মাদকসেবীদের পিটিয়ে মাদকের আড্ডা ভেঙ্গে দেয়। কখনো কখনো তাদের ধরে নদীতে ছুঁড়ে ফেলে দেয়। আফগানরা কেন মাদকের দিকে ঝুঁকে পড়ছে-এর কারণ খুঁজতে গিয়ে দেখা গেছে বিষয়টি জটিল। তবে এটা স্পষ্ট, বহু বছর ধরে চলা সহিংসতা এর অন্যতম প্রধান একটি কারণ হতে পারে। অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে গত ৩০ বছর বা এর বেশি সময় ধরে ইরান বা পাকিস্তানে যে শরণার্থীরা ছিল তাদের অনেকেই মাদকাসক্ত। এখন যারা দেশে ফিরতে শুরু করেছে তারা সঙ্গে নিয়ে এসেছে পুরনো অভ্যাস। বেকারত্বও মাদকাসক্তের একটি কারণ। দেশে এখন বেকারত্বের হার ৪০ শতাংশ। এই কারণেও অনেকে হতাশাগ্রস্ত হয়ে মাদকের দিকে ঝুঁকে পড়ে। নদীর পাড়ে বসে নেশা করতো ফারুক। যিনি আগে একটি হাসপাতালে ম্যানেজার হিসেবে চাকরি করতেন, তার মেডিসিনের ওপর ডিগ্রি রয়েছে। তিনি বলেন, ‘যদি আমার একটি চাকরি হয়, তাহলে আমি এখানে আর থাকবো না। আমি আমার এই অবস্থা চাই না। এর চেয়ে মৃত্যু অনেক ভালো।’ হেরোইনের সহজলভ্যতার কারণেও দেশটিতে মাদকসেবীর সংখ্যা বাড়ছে। গত এক দশক ধরে আফগানিস্তানে আফিম থেকে হোরোইন প্রস্তুত করা হচ্ছে। এক মাদকসেবী বলেন, কাবুলে যে কোনো খাদ্যদ্রব্য কেনার চেয়েও হেরোইন কেনা সহজ। এক গ্রাম হেরোইনের দাম পড়ে ৬ ডলার। কাবুলের যেকোন প্রান্তেই খুব সহজেই পাওয়া যায় হেরোইন। ২০০১ সালে আফগানিস্তানে যখন বহুজাতিক দেশ যুদ্ধ শুরু করে, তখন তারা শুধু দেশটিতে বিদ্রোহ দমনেই ব্যস্ত ছিল। পপি খেতের দিকে নজর দেয়ার সুযোগ পায়নি। কয়েকশ বছর ধরেই আফগানিস্তানে পপি চাষ হচ্ছে। ওষুধ হিসেবেও আফগানিস্তানে এর বহু ব্যবহার দেখা যায়। আফগানিস্তানের উত্তরাঞ্চলের মাজার-ই-শরীফের একটি গ্রামে গিয়ে গেছে, সেখানে সন্তান প্রসবের পর যন্ত্রণাকাতর ফাতেমা নামে এক মা ব্যাথা কমানোর জন্য নিজেই আফিম গ্রহণ করছে। তার কাছে মনে হয়েছে হাসপাতালে গিয়ে চিকিত্সা নেয়ার চেয়ে ঘরে বসেই আফিম নেয়া সহজ। তার মেয়েকেও ছোটো বয়সে কাশির ওষুধ হিসেবে তিনি আফিম সেবন করান। এখন মা মেয়ে দুজনই মাদকাসক্ত। এভাবে দেশের নারী ও শিশুর ৪০ ভাগই মাদকাসক্ত হয়ে পড়েছে। ফাতেমা ও তার মেয়ে আফগানিস্তানের একটি হাসপাতালে চিকিত্সা নেয়ার সুযোগ পেলেও দেশটির মাদকসক্ত অনেক নারী ও শিশু চিকিত্সা নেয়ার সুযোগ পান না। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সারা দেশে ৯৫টি মাদকাসক্ত নিরাময় কেন্দ্র পরিচালনা করে। এই কেন্দ্রের বেড রয়েছে মাত্র ২৩০৫টি। দশ লাখ মাদকাসক্তের চিকিত্সার জন্য সরকার বাজেটে বরাদ্দ রেখেছে মাত্র ২ দশমিক ২ মিলিয়ন ডলার। অর্থাত্ বছরে একজন মাদকাসক্তের পেছনে সরকার ব্যয় করে মাত্র ২ ডলার।