আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন লন্ডন নগরীকে আরো বেশি অত্যাধুনিক এবং নান্দনিক করে তোলার লক্ষ্যে ব্যাপক কর্মযজ্ঞ হাতে নিয়েছে ব্রিটিশ সরকার। রিজেনারেশন এন্ড রিনিউয়াল পরিকল্পনার আওতায় সরকার ইতিমধ্যে শীর্ষ ১শ’ প্রকল্পের নাম ঘোষণা করেছে। দীর্ঘ ১২ বছর মেয়াদী এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বেসরকারি এবং বিদেশি বিনিয়োগকেই বেশি প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। এই কর্মসূচিতে বিনিয়োগের বিবেচনায় শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে ‘নাইন এল্মস’। সাউথ লন্ডনে হতে যাওয়া এ প্রজেক্টের জন্য মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ১৩ দশমিক ৫ বিলিয়ন পাউন্ড। এরপর দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে সারা বিশ্বের ক্রীড়াপ্রেমীদের নজরকাড়া সেই বিখ্যাত কুইন্স এলিজাবেথ অলিম্পিক পার্ক। ২০১২ লন্ডন অলিম্পিকের প্রধান ভেন্যু ছিল পূর্ব লন্ডনের স্ট্র্যাটফোর্ডে অবস্থিত এই ক্রীড়াপীঠ। দীর্ঘ ৬ বছর ধরে ১১ বিলিয়ন পাউন্ড ব্যয়ে পরিপাটি করে সাজানো এই অলিম্পিক পার্কটিকে নতুন করে ঢেলে সাজাতে আরো প্রায় ৯ বিলিয়ন পাউন্ড বিনিয়োগের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। প্রায় ৮০টি ফুটবল মাঠের সমান এলাকা নিয়ে গঠিত এ অলিম্পিক পার্কের রিজেনারেশনের মাধ্যমে এতদিন যাবত্ অবহেলিত অবস্থায় থাকা পূর্ব লন্ডনের চেহারাই বদলে দিতে চায় কর্তৃপক্ষ।
অলিম্পিক পার্কের রিজেনারেশন বা উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অন্যতম হলো কাতার। দেশটির রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ কর্তৃপক্ষ অলিম্পিক পার্কের বিভিন্ন প্রকল্পে ৯শ’ মিলিয়ন পাউন্ড বিনিয়োগ করছে। স্থানীয় কোম্পানি ডিলেন্সে’র সাথে অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে কাতার ২ হাজার ৮শ’ এপার্টমেন্ট নির্মাণের পাশাপাশি কয়েকটি ক্রীড়া ভেন্যু ইজারা নিয়েছে। এছাড়া ডেভেলপার কোম্পানি মেনহাটন লপ্ট কর্পোরেশন এবং টেলফোর্ট হোমস্ এ প্রজেক্টে অন্যতম বিনিয়োগকারী। ডিল্যানন্সি এন্ড ইনফিনিটি এসডিসি অলিম্পিক পার্কে নির্মাণ করছে একটি প্রেস এন্ড ব্রডকাস্ট সেন্টার। এখানে প্রায় ৬ হাজার লোকের কর্মসংস্থান হবে বলে আশা করছে কোম্পানিটি। অন্যদিকে অলিম্পিকের মূল স্টেডিয়ামের ইজারা পেয়েছে ওয়েস্টহ্যাম ফুটবল ক্লাব। প্রায় ৬৫ মিলিয়ন পাউন্ড ব্যয়ে স্টেডিয়ামটিকে পুনঃনির্মাণের পর ২০১৬ সাল থেকে ক্লাবটি এই স্টেডিয়ামকে তাদের হোমগ্রাউন্ড হিসাবে ব্যবহার করবে। ৯৯ বছরের চুক্তি অনুযায়ী ক্লাবটিকে প্রতি বছর ২০ লাখ পাউন্ড ভাড়া গুণতে হবে। যোগাযোগ ব্যবস্থার আরেক ধাপ উন্নয়নেও নেয়া হয়েছে বিশাল পরিকল্পনা। স্ট্র্যাটফোর্ড শহরকে সরাসরি হিথ্রো বিমান বন্দরের সাথে যুক্ত করার জন্য নির্মিত হচ্ছে নতুন একটি আন্ডারগ্রাউন্ড রেললাইন। ২০১৮ সালে এ লাইনটি খুলে দেয়া হবে। শুধু অবকাঠামো উন্নয়নই নয়, প্রতিটি স্থাপনাকে গড়ে তোলা হচ্ছে নান্দনিক উপায়ে।পুরো উদ্যোমে এগিয়ে চলছে এ সব প্রজেক্টের কাজ।
ইতিমধ্যে অলিম্পিক আয়োজন উপলক্ষে এ অঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থায় ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে। নির্মিত হয়েছে ইউরোপের বৃহত্তম শপিং কমপ্লেক্স ওয়েস্ট ফিল্ড। গড়ে উঠেছে ১০ হাজারের বেশি ঘরবাড়ি। এসব ঘরবাড়ির বাসিন্দা এখন লন্ডনের স্থানীয় অধিবাসীরা। এদিকে ব্যাপক উন্নয়ন হওয়ায় এখন সট্র্যাটফোর্ডে বাড়িঘরের চাহিদাও বেশ বেড়ে গেছে। তাই উন্নয়ন পরিকল্পনায় অলিম্পিকের লিগ্যাসি ধরে রাখার পাশাপাশি বেশ গুরুত্ব পেয়েছে নতুন নতুন ঘরবাড়ি নির্মাণের বিষয়টি। স্থানীয় কাউন্সিলের হিসাবে অলিম্পিক পার্ককে কেন্দ্র করে স্ট্র্যাটফোর্ড এলাকায় আরো প্রায় ২০ হাজার ঘরবাড়ি নির্মাণ করা হচ্ছে। এসব ঘরবাড়ি লন্ডনের হাউজিং সংকট মোকাবেলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
অলিম্পিক ভেন্যুর উন্নয়ন নিয়ে লন্ডনের মেয়র এবং সরকারের আগ্রহটাও বেশ চরম। এই আগ্রহের কারণটা অন্যখানে। ২০০৫ সালে সিঙ্গাপুরে অলিম্পিকের হোস্টসিটি নির্বাচনে ব্রিটিশরা যখন লন্ডনের পক্ষে ভোট দাবি করছিল তখন তাদের আসল যুক্তিটা ছিল- অলিম্পিক আয়োজনের সুযোগ পেলে তারা পূর্ব লন্ডনের এমন জায়গায় ভেন্যু তৈরি করবে যেখানে হাজার হাজার অবহেলিত নগরবাসী উন্নয়নের ছোঁয়া পাবে। এর মাধ্যমে উন্নয়ন বঞ্চিত একটি অঞ্চলকে বিশ্বক্রীড়ার সুঁতিকাগার হিসাবে গড়ে তোলা হবে। নতুন নতুন অবকাঠামো নির্মাণের ফলে অবহেলিত জনগোষ্ঠী এ থেকে বিশেষভাবে উপকৃত হবেন। মূলত এসব প্রতিশ্রুতির সুবাদেই ‘অলিম্পিকের-২০১২’ এর হোস্টসিটি নির্বাচনে এগিয়ে যায় লন্ডন। অলিম্পিকের আয়োজনটাও কারুপূর্ণ আর সাফল্যের সাথে সম্পন্ন করে। এখন বাকি প্রতিশ্রুতি পূরণ আর অলিম্পিকের লিগ্যাসি ধরে রাখা। সে লক্ষ্যে ২০১২ সালের গ্রীষ্মে অলিম্পিক শেষ হওয়া মাত্রই গঠন করা হয় লন্ডন লিগ্যাসি ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশন। এই কর্পোরেশনের নিয়ন্ত্রণেই চলছে অলিম্পিক পার্কের বর্তমান উন্নয়ন কর্মকাণ্ড। ভবিষ্যতে স্ট্র্যাটফোর্ডই হবে লন্ডনে ভ্রমণবিলাসীদের প্রধান আকর্ষণ- এমনটা আশা সংশ্লিষ্টদের।
