পদ্মা সেতু :সরকারি কোম্পানি থেকে অর্থ সংগ্রহের উদ্যোগ

আপডেট : ২১ এপ্রিল ২০১৩, ২২:৩২
পদ্মা সেতু নির্মাণে আভ্যন্তরীণ উত্স থেকে অর্থ সংগ্রহের বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। সাধারণ মানুষের কাছ থেকে তেমন কোন সাড়া না পেয়ে সরকারের নিজস্ব কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করছে। সরকারি বিভিন্ন করপোরেশন, কোম্পানি ও সংস্থাকে চিঠি দেয়া হয়েছে এই অর্থ দেয়ার জন্য। ব্যাংকে ব্যাংকে হিসাব খুলে যে অর্থ সংগ্রহের উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল তাতে তেমন সাড়া মেলেনি। পদ্মা সেতুর জন্য স্বেচ্ছায় অনুদান দিতে সারা দেশে বিভিন্ন ব্যাংকে হিসাব খোলা হয়েছে। প্রায় প্রতিটি ব্যাংকে লিখে রাখা হয়েছে ‘এখানে পদ্মা সেতুর জন্য স্বেচ্ছা অনুদান নেয়া হয়’। কিন্তু এসব হিসাবে কোন সাড়া মেলেনি। বুধবার পর্যন্ত সারাদেশের সকল ব্যাংকে মাত্র এক লাখ ১৬ হাজার ৫২ টাকা ২২ পয়সা জমা পড়েছে। আর দেশের বাইরে থেকে মাত্র একজন এক হাজার ডলার জমা দিয়েছেন। সকল ব্যাংকের হিসাব সোনালী ব্যাংকের মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংকে দেয়া হচ্ছে। যে টাকা জমা দেয়া হয়েছে, তা সোনালী ব্যাংকেই জমা রাখা হচ্ছে। সেতু বিভাগ থেকে বিভিন্ন কর্পোরেশন ও সরকারি কোম্পানিকে এ বছর বেশি আয় করে তা পদ্মা সেতু নির্মাণে দিতে বলা হয়েছে। সম্প্রতি এরকম একটি চিঠি দেয়া হয়েছে সরকারের অন্যতম কর্পোরেশন পেট্রোবাংলাকে। পেট্রোবাংলা প্রতিবছর সরকারকে যে রাজস্ব দেয়, তারচেয়ে বেশি দিতে বলা হয়েছে। পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান ইতিমধ্যে তার অধীনস্থ বিভিন্ন কোম্পানিকে আয় বাড়িয়ে পদ্মা সেতুতে অর্থ দিতে অনুরোধ করেছেন। পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান বলেন, আমরা চেষ্টা করছি ৫০০ কোটি টাকা দেয়ার। তিতাস গ্যাসসহ অন্য কোম্পানিকে এই অর্থ দিতে বলা হয়েছে বলেও তিনি জানান। এদিকে পদ্মা সেতু নিজস্ব অর্থ দিয়ে করার জন্য জাতীয় বাজেটে বরাদ্দ রাখা শুরু হয়েছে। আসন্ন বাজেটেও ছয় হাজার ৮৫২ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হবে বলে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, সরকার নিজস্ব অর্থ দিয়েই পদ্মা সেতু নির্মাণ করবে। প্রতিবছর যে অর্থ প্রয়োজন হবে তা জাতীয় বাজেট থেকেই দেয়া হবে। এই অর্থ দিয়েই এটা করা সম্ভব হবে। চলতি অর্থ বছরে পদ্মা সেতুর জন্য সংশোধিত বাজেটে এক হাজার পাঁচ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০১২-১৩ অর্থবছরে পদ্মা সেতু নির্মাণে প্রয়োজন হতো তিন হাজার ১৯৯ কোটি ৬১ লাখ টাকা, ২০১৩-১৪ অর্থবছরে প্রয়োজন সাত হাজার ৮৬৮ কোটি ৬৫ লাখ টাকা, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে প্রয়োজন হবে সাত হাজার ৭৮৬ কোটি টাকা এবং ২০১৫-১৬ প্রয়োজন হবে তিন হাজার ৭০০ কোটি ৮৫ লাখ টাকা। অর্থাত্ মোট চার বছরে প্রয়োজন হবে ২২ হাজার ৫৫৫ কোটি ১৬ লাখ টাকা। ২৯০ কোটি ডলার ব্যয়ে পাঁচ কিলোমিটারের বেশি দীর্ঘ এ সেতু নির্মাণে চারটি আন্তর্জাতিক অর্থলগ্নিকারী সংস্থার মধ্যে বিশ্বব্যাংকই সর্বোচ্চ ঋণদাতা প্রতিষ্ঠান ছিলো। চুক্তি অনুযায়ী বিশ্বব্যাংকের দেয়ার কথা ছিলো ১২০ কোটি ডলার। এডিবির ৬১ কোটি ডলার, জাপানের উন্নয়ন সংস্থা জাইকার ৪০ কোটি ডলার এবং ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংকের ১৪ কোটি ডলার দেয়ার কথা ছিল। বাকিটা বাংলাদেশ যোগান দিতে চেয়েছিল। ইতিমধ্যে বাংলাদেশ জমি অধিগ্রহণ ও ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা খরচ করেছে। তারপরও বিশ্বব্যাংক তাদের ভাষায় ‘উচ্চপর্যায়ে দুর্নীতির অভিপ্রায়ের প্রমাণ পাওয়ায়’ ঋণচুক্তি বাতিল করেছে। পরবর্তীকালে বাংলাদেশ সরকার নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেয়। এডিপি থেকে পদ্মা সেতু নির্মাণের বরাদ্দ দেয়ার জন্য একটি রূপরেখা তৈরি করা হয়। এদিকে চলতি অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) মোট ৫৫ হাজার কোটি টাকার মধ্যে সরকারি বরাদ্দ রয়েছে ৩৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে পদ্মা সেতুর জন্য মোট বরাদ্দ ৮০৪ কোটি টাকা। পদ্মা সেতুর জন্যে কানাডার কাছে ক্ষতিপূরণ চাওয়া উচিত :দুদক চেয়ারম্যান ইত্তেফাক রিপোর্ট পদ্মা সেতু প্রকল্পে দুষ্কর্মের জন্য কানাডাকে দায়ী করে দেশটির কাছে বাংলাদেশের নাগরিকদের ক্ষতিপূরণ চাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যান গোলাম রহমান। তিনি বলেন, এসএনসি-লাভালিনের দুই কর্মকর্তার জন্যই পদ্মা সেতু প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগ এসেছে। আর এসব কারইে পদ্মা সেতু প্রকল্প নিয়ে বাংলাদেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কানাডিয়ান নাগরিক এসএনসি-লাভালিনের কর্মকর্তার জন্যই বাংলাদেশের এতো বড় ক্ষতি হয়েছে। এসব কারণে ক্ষতিপূরণ চাওয়া উচিত। গতকাল রবিবার বিকালে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) প্রধান কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় তিনি এ মত ব্যক্ত করেন। রমেশের ডায়েরিতে ঘুষ প্রদানের জন্য থাকা নামের তালিকা সম্পর্কিত এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ওরা হয়তো মনে করেছে কাজ পাওয়ার ক্ষেত্রে এদের একটা পার্সেন্টেজ দিতে হবে। তালিকায় যেকোনো লোকের নাম থাকতে পারে। যার নাম ডায়েরিতে আছে সে ব্যক্তিও হয়তো জানতো না। তবে তদন্তে ডায়েরির বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে দেখা হচ্ছে। সে অনুযায়ী ডায়েরিতে নাম থাকা ব্যক্তিদের কেউ কেউ দুদক-এর মামলায় আসামি হয়েছে। ডায়েরির মালিক রমেশকেও মামলায় আসামি করা হয়েছে। তিনি বলেন, তাদের ঘুষ দেয়ার জন্য হয়তো আগ্রহ ছিল তাই এমন তালিকা করেছে। ঘুষের তালিকায় যাদের নাম উল্লেখ করা হয়েছে তারা না জানলে কেন নাম লেখা হয়েছে—এমন প্রশ্নের জবাবে গোলাম রহমান বলেন, তার (রমেশ) কাছে যাদের গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে সে তাদের নাম নিজের ডায়েরিতে লিখেছে। এর সঙ্গে যদি নাম উল্লেখ থাকা ব্যক্তিদের সংযোগ না থাকে তাহলে সেটি অপরাধের কিছু নয়। এ প্রসঙ্গে উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, বাজার করার আগে আমরা যেমন ফর্দ বানাই রমেশের ডায়েরির তালিকাও তাই। দুদুক যে মামলা করেছে সেটি রমেশের ডায়েরির আলোকে করেছে কিনা এমন প্রশ্ন করলে দুদক চেয়ারম্যান বলেন, দুদক অনুসন্ধান করে যাদের বিরুদ্ধে মোটামুটিভাবে তথ্য পেয়েছে তাদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। রমেশের ডায়েরির আলোকে নয়। তিনি আরো বলেন, দুদক যখন মামলা করেছে তখন যাদের সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হওয়া গেছে তাদের মামলার আসামি করা হয়েছে। সাবেক যোগাযোগ মন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন, সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আবুল হাসান চৌধুরীর বিষয়ে তখন আসামি করার মত পর্যাপ্ত প্রমাণ না পাওয়ায় এজাহারে তাদের ভূমিকা তুলে ধরা হয়—কিন্তু তাদের আসামি করা হয়নি। তদন্তে তাদের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলে আসামি করা হবে। আবার যাদের আসামি করা হয়েছে তদন্তে তারা নির্দোষ প্রমাণিত হলে চার্জশিট থেকে বাদ পড়ে যাবেন। বিশ্বব্যাংকের মাধ্যমে কানাডার আদালত থেকে দুর্নীতি দমন কমিশন কোন নথিপত্র পেয়েছে কিনা এ ধরনের একটি প্রশ্নের জবাবে দুদক চেয়ারম্যান বলেন, এখন পর্যন্ত এ ধরনের কোন কাগজপত্র পাওয়া যায়নি।