দিনটি ছিল ১৩ এপ্রিল। বাংলার চিরায়ত উত্সব পয়লা বৈশাখের ঠিক আগের দিন। এমনিতেই উত্সব উত্সব আমেজ। এমন দিনেই নির্ধারিত হল র্যাগ। কেন যেন আইনের ৩৬তম ব্যাচ সবদিক দিয়েই স্বতন্ত্র গুণে গুণান্বিত। প্রভাত থেকে মাঝরাত বিরতিহীন উদযাপনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হল। যেই ভাবা সেই কাজ। নির্দিষ্ট দিনে সকাল ৯টা থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ দিন স্মরণীয় করার পরিকল্পনা। বিধিবাম, আমাদের চৌকস ক্লাস মনিটর আরিফ ঠিকই স্যারকে অনুরোধ করে ঐদিনের পরীক্ষা পিছিয়ে দিল। অর্থাত্, আমাদের র্যাগ ডে সোনায় সোহাগা। সকাল ৯টায় রিপোর্টিং করে যার যার ধবধবে টিশার্ট বুঝে নিলাম। গায়ে চাপাতে লাগল সাকুল্যে ১ মিনিট। অন্যদিকে মেয়েরা সাদা পরীর বেশে অঙ্গে সাদা পরিচ্ছদ চাপিয়ে হাজির। আমাদের লক্ষ্য ছিল নতুন মাত্রার ফ্যাশন, তাই সাথে ছিল চটকদার লুঙ্গি, বর্ণিল গামছা। এক কথায় অসাধারণ এক কম্বিনেশন। প্রত্যেকেই যেন এক একজন মডেল। প্রথম খণ্ডের ফটোসেশন হল বিপুল বিক্রমে, চোখে যেন সাদার নেশা জড়িয়ে গেছে, ফ্রেম জুড়ে সাদার শুভ্রতা।
এদিকে কাফি, নয়ন, রাজীব যে কখন রংকেলির প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে, তা টেরই পাইনি। যেই না ক্লাসরুম ছেড়ে মাঠে নামছি, ওমনি শুরু হয়ে গেল রং বৃষ্টি। লাল-নীল রঙের বন্যায় আমাদের শ্বেতশুভ্র সজ্জা নিমেষেই হারিয়ে গেল। যে যেভাবে পারে, মুখে, নাকে, চোখে, বুকে- রং মাখামাখি, রং ছড়াছড়ি। রঙের ভয়ে শোভন মেডিক্যাল সেন্টারের পেছন দিয়ে পালাতে যাচ্ছিল; ওমনি তাজ, কাফি একসাথে পথে ওকে জাপটে ধরে কিম্ভূত কিমাকার সাজিয়ে ছাড়ল রং দিয়ে। এই পর্বে কয়েকশত ছবি তোলা হয়েছে। রিজভীর নেতৃত্বে এরই মাঝে গাড়ি এবং লাউড স্পীকার হাজির হল। কামরুল ব্যবস্থা করল মোটর বাইক শোভাযাত্রার। এবার উন্মাতাল নৃত্যের পালা। ধাড়াক্কা গানের তালে তালে প্রিয়াঙ্কা, আফসানা, মিতু, রেনেসাঁ, মালা, সাদিয়া, লোপা, আয়েশা, বন্যা, পার্থ, মেহেদী, রাশেদ, শিমুল, খালেদ, সোহেল, নিলাদ্রি, সাকিব, আদনান, সালাউদ্দিন, মাহমুদ, শাকিল, শিবলী, নিকিল, লাবু থেকে শুরু করে ব্যাচের সবচেয়ে নিভৃত আতিক, ফারিয়া কিংবা লিয়ন পর্যন্ত ওইদিন যেন মাইকেল জ্যাকসন হয়ে উঠেছিল। ছবি তোলা আর ভিডিও করার ঝড় উঠল, শুরু হল ক্যাম্পাস প্রদক্ষিণ। শহীদ মিনার থেকে টিএসসি, রাজু ভাস্কর্য, কলা ভবন, মল চত্বর, মধুর ক্যান্টিন, চারুকলা, বাংলা একাডেমী হয়ে কার্জন হল— ঐ দুই ঘণ্টা আমরাই যেন রাস্তার রাজা।
রং এর কারিশমায় কে যে কোনটা, চেনাই দায়। পথিমধ্যে যোগ হল পত্রিকার সাংবাদিক আর আমাদের ক্যাম্পাসের ডিফল্ট ক্যামেরাম্যান পিয়ারু ভাইয়ের লেন্স। ব্যাস, লুঙ্গি গামছা দিয়ে র্যাপ সঙ্গীতে নাচ জমে উঠল আরেক ডিগ্রি। ৬ ফুট লম্বার আদনান, নাসের, ইয়ো মেহেদীর লুঙ্গি জাদুতে হাসতে হাসতে ভিমড়ী খাওয়ার যোগাড়। কার্জন হলে গিয়ে আমরা সবাই কিঞ্চিত্ ক্লান্তি আবিষ্কার করলাম, কারণ ঘড়িতে বেলা একটা। সূর্য মধ্য গগণে। এবার ভূঁড়িভোজের পালা। ঢুলতে ঢুলতে দল ধরে এনেক্স বিল্ডিংএ আসছি সবাই। আশপাশের শত শত লোকজনের আশ্চর্য চাহনিতে বুঝে গেলাম, আমরা হিট, দৃষ্টি আকর্ষিত হয়েছে ষোল কলায়।
এগ রাইস, থাই ভেজিটেবল আর ফ্রায়েড চিকেনের লাঞ্চের পর ২ ঘণ্টার বিরতি দিয়ে বিকালের অনুষ্ঠান শুরু হল। দিনের রং ঝলমল উন্মাদনার পর এবার জমকালো রাতের উন্মত্ততা। র্যাম্প শো, ডিজে শো, নাচ-গান, সৌরভের কথায় রিজভির সুর যেন মায়াবী এক র্যাগ ডের জন্ম দিল। আমরা মুগ্ধ নয়নে উপভোগ করলাম সহপাঠীদের পারফরমেন্স। রাত যত বাড়ে, মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের দৈর্ঘ্য তত বাড়ে। তানির সৌজন্যে কেক এবং মিষ্টি খেলাম তৃপ্তি নিয়ে। রাতের নীলাভ খোলা আকাশে চোখ ধাঁধানো আতশবাজিতে গোটা ক্যাম্পাস থমকে গিয়েছিল কয়েক মিনিটের মুগ্ধতায়। পরিশেষে নিশীথ নীরবতা ভেঙ্গে আবারো ফটো সেশন, এক ফ্রেমে গুচ্ছ গুচ্ছ মুখ। এভাবেই উদযাপিত হল অনেকের মতেই গত কয়েক বছরের সেরা র্যাগ ডে তথা ক্লাস সমাপনী দিনটি, যার স্রষ্টা আইন বিভাগের ৩৬তম ব্যাচ।
