কঠিনতম চ্যালেঞ্জের মুখে গার্মেন্টস খাত

আপডেট : ২৩ এপ্রিল ২০১৩, ২২:৩১
তৈরি পোশাক খাত গত ৩০ বছরের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করছে বলে মনে করছে এ খাতের উদ্যোক্তাদের সংগঠন বিজিএমইএ। গতকাল মঙ্গলবার এক সাংবাদিক সম্মেলনে বিজিএমইএ সভাপতি আতিকুল ইসলাম বলেন, আমার অভিজ্ঞতায় বাংলাদেশের গার্মেন্টস শিল্প গত ৩০ বছরের ইতিহাসে এত ভয়াবহ চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়নি। তিনি বলেন, চলমান সংঘাতময় রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে পোশাক শিল্পের অস্তিত্ব কী ভাবে টিকিয়ে রাখবো! কী ভাবে টিকে থাকবো! আমাদের বাইরের খোলসটাই আপনারা দেখছেন। ভেতরের রক্তক্ষরণ দেখতে পাচ্ছেন না। একের পর হরতালে বিপর্যস্ত এ খাতের পরিস্থিতি নিয়ে গতকাল বিজিএমইএ ভবনে এ সাংবাদিক সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। এসময় বিকেএমইএ ও প্রাথমিক বস্ত্রখাতের উদ্যোক্তারাও উপস্থিত ছিলেন। সাংবাদিক সম্মেলনে বিজিএমইএ সভাপতি এ খাতের দেশীয়ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে নানামুখি সংকটের কথা তুলে ধরেন। চলমান রাজনৈতিক সংঘাত ও দফায় দফায় হরতালে ক্ষয়ক্ষতির চিত্র তুলে ধরে তিনি বলেন, অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, এ শিল্পকে গলাটিপে হত্যা করা হচ্ছে। পুরনো ক্রেতারা আমাদের দেশ থেকে নিজেদের গুটিয়ে নিচ্ছেন। অন্যদিকে রাশিয়া, ব্রাজিল, পেরু, জাপান, ভারত ও চীনের মত নতুন ক্রেতারাও মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। বাংলাদেশে এসে হোটেল থেকেই ফিরে যাচ্ছেন ক্রেতারা। অর্ডার দিচ্ছেন না। বলেছেন, তোমরা ‘টেস্ট কেসে’ ফেল করেছ। নতুন বাজারের অফুরন্ত সম্ভাবনা অংকুরেই বিনষ্ট হচ্ছে। এক সময় শ্রীলঙ্কার অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সুযোগে আন্তর্জাতিক ক্রেতারা বাংলাদেশমুখি হয়েছিল। এখন আমাদের সমস্যায় তারা প্রতিযোগী মিয়ানমার, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়াসহ অন্য দেশে চলে যাচ্ছে। প্রয়োজনে দামের ক্ষেত্রে ছাড় দিতেও প্রস্তুত তারা। সাম্প্রতিক হরতাল ও সহিংসতায় ৩৩টি কারখানার ক্ষয়ক্ষতির একটি চিত্র তুলে ধরা হয় এই সাংবাদিক সম্মেলনে। এতে বলা হয়, এই কারখানাগুলোতে অর্ডার বাতিল হয়েছে ২০ কোটি ৭০ লাখ টাকার। ডিসকাউন্ট দিতে হয়েছে ৯ কোটি ৩৬ লাখ টাকা। আকাশ পথে পণ্য পরিবহন বাবদ অতিরিক্ত ব্যয় ২৪ কোটি ১০ লাখ টাকা। যথাসময়ে রফতানি না করতে পারায় ক্ষতি ৭৩ কোটি ২৫ লাখ টাকা এবং ভাংচুর ও সহিংসতায় ক্ষতি ৮ কোটি ৩০ লাখ টাকা। তবে চলমান পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে কোনরূপ আলোচনায় মধ্যস্থতা করার বিষয়েও আগ্রহী নন এই খাতের উদ্যোক্তারা। বিজিএমইএ’র পক্ষ থেকে বলা হয়, রাজনীতি নিয়ে আমাদের কোন বক্তব্য নেই। আমাদের দায়িত্ব হচ্ছে, এ খাতকে টিকিয়ে রাখতে দলগুলোকে অনুরোধ করা। অনুরোধ ছাড়া কিছুই করতে পারি না। তবে প্রধান দুই দলের সাথে বিজিএমইএ’র দায়িত্বপ্রাপ্ত কমিটি হিসেবে সৌজন্য সাক্ষাত্ করবেন তারা। বিকেএমইএ’র সভাপতি সেলিম ওসমান বলেন, আমাদের পক্ষে হেফাজতের মত চাইলেই রাস্তায় নামা সম্ভব নয়। আমরা রাজনীতিতে জড়াতে চাই না। তবে তিনি বলেন, গণতান্ত্রিক সরকার থাকা সত্ত্বেও রাস্তায় জ্বালাও-পোড়াও হচ্ছে। এতে নারী শ্রমিকদের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ছে। হরতালের কারণে ক্ষয়ক্ষতির হিসাব তুলে ধরেন আতিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, একদিনের হরতালে এ খাতে ২০০ কোটি টাকার উত্পাদন ব্যাহত হয়। হরতালের কারণে সমুদ্রপথে পণ্য পাঠাতে ব্যর্থ হয়ে উদ্যোক্তারা প্রায় ১৩ গুণ বেশি খরচে আকাশ পথে পণ্য পাঠিয়েছেন। সমুদ্রপথে এক কেজি পণ্য পাঠাতে খরচ হয় ৩০ সেন্ট। অথচ আকাশ পথে একই পরিমাণ পণ্যে খরচ ৪ ডলার ১৫ সেন্ট। এতে উদ্যোক্তাদের লাভ থাকে না। পুঁজিতে হাত পড়ে। শুধুমাত্র গত তিন মাসে (জানুয়ারি-মার্চ) ৩৯০ কোটি টাকা আকাশ পথে পণ্য পরিবহন বাবদ লোকসান হয়েছে বলে দাবি করে তিনি বলেন, একটি কারখানা রুগ্ন হওয়ার জন্য একটি এয়ার শিপমেন্টই যথেষ্ট। এদিকে হরতালের কারণে সামপ্রতিক ক্ষতির হিসাব বিজিএমইএ’র কাছে দাখিল করতে শুরু করেছে সদস্য কারখানাগুলো। ইতিমধ্যে ৩৩টি প্রতিষ্ঠানের ক্ষয়ক্ষতির বিবরণ দেয়া হয়েছে। এতে দেখা যায়, প্রায় ২১ কোটি টাকার (প্রতি ডলার ৭৮ টাকা হিসেবে) অর্ডার বাতিল হয়েছে। ক্রেতাকে মূল্য কমিয়ে দিতে হয়েছে সোয়া ৯ কোটি টাকা, আকাশ পথে পরিবহনের দরুন ক্ষতি ২৪ কোটি টাকা, নির্দিষ্ট সময়ে রপ্তানি করতে ব্যর্থ হওয়ায় ক্ষতি ৭৩ কোটি এবং ভাংচুর অগ্নিকাণ্ডের কারণে সোয়া ৮ কোটি টাকার ক্ষতির শিকার হয়েছে এসব প্রতিষ্ঠান। তিনি বলেন, এ অবস্থায় আমরা ক্রেতাদের করুণার পাত্র হয়ে গেছি। সামপ্রতিক সহিংসতায় ভাবমূর্তি ক্ষতি সহজে কাটিয়ে ওঠা যাবে না বলে জানিয়ে তিনি বলেন, বিদেশে বার্তা যাচ্ছে এখানে সহিংসতা ও প্রাণহানি হচ্ছে। ক্রেতারা আস্থা হারাচ্ছেন। তারা এদেশে আসতে ভয় পাচ্ছেন। প্রতিযোগী দেশগুলোতে অর্ডার সরিয়ে নিচ্ছেন। পরিসংখ্যান দিয়ে তিনি বলেন, সামপ্রতিক সময়ে ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়ার রপ্তানি বেড়েছে যথাক্রমে ২২ শতাংশ ও ১৫ শতাংশ। ক্রেতারা আমাদের দেশের বরাদ্দকৃত অর্ডার থেকে প্রায় ৩০ শতাংশ কেটে এসব দেশে নিয়ে যাচ্ছেন। তারা ঝুঁকি নিতে চাচ্ছেন না। এছাড়া একই সময়ে মজুরি বৃদ্ধি, বিদ্যুত্ খরচ, পরিবহন খরচ, ব্যাংক সুদের হার, রপ্তানিতে উেস কর বৃদ্ধির কারণে সার্বিকভাবে উত্পাদন খরচ ১২ শতাংশ বেড়েছে। অথচ একই সময়ে মূল্যস্থিতিশীল ক্ষেত্র বিশেষে কমছে। আবার সামপ্রতিক সময়ে ডলারের বিরুদ্ধে টাকা শক্তিশালী হওয়ায় রপ্তানি আয় কমছে। রাজনৈতিক দলগুলোকে স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, এ অবস্থা চলমান থাকলে ৩২ লাখ নারী শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়বে যার ভার নেয়ার সামর্থ এ অর্থনীতির নেই। যে সরকারই ক্ষমতায় থাকুক না কেন এর ফলে সৃষ্ট আর্থ-সামাজিক বিপর্যয়ের ভার কাটিয়ে উঠতে পারবেন কি না সে প্রশ্নও বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। বিটিএমএ সভাপতি জাহাঙ্গীর আলামীন রাজনৈতিক দলগুলোর উদ্দেশে বলেন, জনগণের ক্ষতি করে তারপর ভালো করার অর্থ আমরা বুঝতে পারি না। এ অবস্থায় আলোচনার মাধ্যমে দ্রুত সহিংসতার রাজনীতি থেকে নিজেদের পরিত্রাণ দেয়ার আকুতি জানিয়ে বিজিএমইএ সভাপতি বলেন, হরতালে আমাদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। আমরা আর পারছি না। দেশের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে রাজনৈতিক কর্মসূচি গ্রহণ করুন। স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশ ও নীতি সহায়তা পেলে স্বাধীনতার ৫০ বছরে দেশের পোশাক রপ্তানি ৫০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার আশাবাদও ব্যক্ত করেন তিনি। সাংবাদিক সম্মেলনে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন বিজিএমইএ’র সহ-সভাপতি এসএম মান্নান কচি, শহীদুল্লাহ আজিম, রিয়াজ বিন মাহমুদ ও সাবেক সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান, বিকেএমইএ’র সহ-সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম ও আসলাম সানী প্রমুখ।