শুরুর গল্প
সবার অভিনয় শুরুর গল্প একরকম নয়। কেউ হয়তো ছোট থেকেই স্বপ্ন দেখেন অভিনয় করার, কেউবা পরিবারের সূত্র ধরেই অভিনয়ে নাম লেখান। মৌটুসীর কাছে তার অভিনয় শুরুর গল্প জানতে চাইলে তিনি মৃদু হেসে বলেন, ‘আমার শুরুটা হয়েছিল উপস্থাপনা দিয়ে। পরে অভিনয় ও মডেলিং করি। মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর জনপ্রিয় ধারাবাহিক ‘৫১বর্তী’ নাটকের মধ্য দিয়ে অভিনয়ের সূচনা। ওই নাটকের ‘পলা’ চরিত্রে অভিনয় করেছিলাম। এই চরিত্রে অভিনয়ের জন্য বন্ধুমহলসহ অনেকের কাছ থেকে প্রশংসাও পেয়েছি। সেই থেকে এখনও অভিনয় নিয়েই আছি।’
ভালোলাগা চরিত্র
বরাবরই সাহিত্যনির্ভর কাজকে প্রাধান্য দিয়ে আসছেন মৌটুসী। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে বাংলাভিশনে প্রচারিত ‘মহামায়া’ নাটকে মহামায়া চরিত্রে অভিনয় করে সর্বমহলে বেশ প্রশংসিত হন তিনি। ‘মহামায়া’ নাটকটির চিত্রনাট্য ও পরিচালনা করেছেন কাওনাইন সৌরভ। নাটকের গল্পে দেখা যায়, কুলীনের ঘরের কন্যা মহামায়া। থাকে ভাই ভবানীচরণের সংসারে। ভিন্নজাতের রাজীব ভালোবাসে মহামায়াকে। কিন্তু ভাই ভবানীচরণ জোর করে বৃদ্ধ ব্রাহ্মণের সঙ্গে তার বিয়ে দেন। পরের রাতেই মহামায়া বিধবা হয়। শাস্ত্রমতে, সহমরণে যাবে মহামায়া। হাত-পা বেঁধে মহামায়াকে চিতায় তোলা হয়। আগুনও জ্বলতে থাকে। হঠাত্ শুরু হয় বৃষ্টি। চিতার আগুন নিভে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মহামায়া চলে যায় রাজীবের কাছে। সেই রাতে মহামায়া রাজীবকে শর্ত দেয়, কোনো দিনও সে তার মুখ দেখতে পারবে না। রাজীব সেই শর্তে রাজি হয়। তারপর তারা দুজনই গ্রাম ছেড়ে দূরে চলে যায়। একসঙ্গে থাকছে, ঘর করছে কিন্তু স্ত্রীর মুখ দেখতে পারছে না রাজীব। নতুন করে যেন আরেকটা নাটক শুরু হয় রাজীবের জীবনে। এ ধরনের নাটকে ও চরিত্রে কাজ করতে ভালোবাসেন মৌটুসী। আর সাহিত্যনির্ভর নাটকে কাজ করা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘সাহিত্যনির্ভর কাজে অন্য রকম একটা গ্ল্যামার থাকে। তাই এ ধারার কাজে আমি খুব আনন্দ পাই। তা ছাড়া সাহিত্যবিষয়ক বই আমার অবসরের সঙ্গী। আমি ছোটবেলা থেকে বই পড়তে পছন্দ করি। শরত্চন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গল্প-উপন্যাসের কালজয়ী চরিত্রগুলো আমার চেনা ও জানা। এ কারণে এই ধারার কাজগুলো আমাকে বেশি আকৃষ্ট করে।’
অর্জনের ঝুলি
অভিনয় ক্যারিয়ারের শুরু থেকে তিনি নিজের একটা দর্শন মেনে পথ চলছেন। আর তা হলো অনেক বেশি কাজ করার চেয়ে একটু কম কাজ করবেন। সংখ্যার চেয়ে তিনি কাজের মানের দিকে বেশি নজর দেন। এর ফলে কাজ নিয়ে কখনো তার মাঝে কোনো অস্থিরতা দেখা যায়নি। তার ভাষ্যে—আমি কখনো এমনটি চাইনি যে, আমাকে অনেক অনেক নাটকে অভিনয় করতে হবে, সবসময় টিভিপর্দায় নিজেকে দেখতে হবে-এই ভাবনা আমাকে কখনো তাড়া করেনি। আমি আসলে নিজেকে দেখতে চেয়েছি ভালো কাজের একজন অভিনেত্রী হিসেবে। অভিনয়ের সাথে যুক্ত আছেন বেশ কয়েক বছর। এই দীর্ঘ সময়ে অভিনয় করেছেন অসংখ্য মানসম্পন্ন এক খণ্ড ও ধারাবাহিক নাটকে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—‘৫১’বর্তী’, ‘তোমার অপেক্ষায়’, ‘মামুলি একটা মানুষ’, ‘পুতুল খেলা’, ‘কাঠগড়া’ প্রভৃতি। নাটকের পাশাপাশি তিনি দুইটি চলচ্চিত্রেও অভিনয় করেছেন। এগুলো হলো—মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর পরিচালনায় ‘ব্যাচেলর’ ও রাফায়েল আহমেদের ‘৬৯, পাতলা খান লেন’। শুধু অভিনয় নয়, মডেলিংয়েও নিজের প্রতিভার পরিচয় দিয়েছেন মৌটুসী। বেশ কয়েকটি বিজ্ঞাপনচিত্রে মডেল হয়েছেন। সেইসাথে চ্যানেল টোয়েটিন্ট ফোর-এ প্রচারিত ট্রাভেল শো ‘সার্কেল দ্য গ্লোব’-এর বেশ কয়েকটি পর্বে উপস্থাপনাও করেছেন।
বিরতির পর
মা হওয়ার কারণে অভিনয় থেকে অনেক দিন দূরে ছিলেন অভিনেত্রী মৌটুসী বিশ্বাস। সম্প্রতি আবার নাটকের কাজ শুরু করেছেন এই অভিনেত্রী। এবার নতুন একটি ধারাবাহিকে কাজ করতে যাচ্ছেন তিনি। সকাল আহমেদের পরিচালনায় এ নাটকের শিরোনাম ‘কাঠগড়া’। এতে একজন আইনজীবীর চরিত্রে অভিনয় করবেন মৌটুসী। এ প্রসঙ্গে মৌটুসী বলেন, ‘এ ধরনের চরিত্রে এবারই প্রথম কাজ করছি। নাটকে আমাকে একটি গুম হয়ে যাওয়া মেয়ের মামলা পরিচালনা করতে দেখা যাবে। যেহেতু বিষয়টি আইন বিষয়ক, তাই আমাকে নিয়ম মেনেই কাজ করতে হবে। আইনের বাইরে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। তবে যতদূর স্ক্র্রিপ্ট পড়েছি, তাতে মনে হয়েছে ধারাবাহিকটিতে সাসপেন্স রয়েছে।’
অভিনয়ের প্রতি শ্রদ্ধা
কাজের প্রতি শ্রদ্ধা আর সময়ের ব্যাপারে তার সচেতনতাই তাকে এতদূর নিয়ে এসেছে। একজন অভিনেত্রী হিসেবে নাটকের কোনো স্ক্রিপ্ট হাতে এলে তখন কাজটা নিয়ে স্বপ্ন কেমন থাকে জানতে চাইলে মৌটুসী বলেন, ‘নতুন কাজ হাতে এলে অবশ্যই তা নিয়ে একটা স্বপ্ন তৈরি হয়। তবে আমাদের দেশে মিডিয়ায় নিজের মতো করে কাজ করতে চাইলেও তা সম্ভব হয় না। তারপরও চরিত্র নিয়ে ভাবি। শুটিংয়ের সময় চরিত্রটা নিজের মধ্যে লালন করে ভালো কিছু করার চেষ্টা করি।’ কাজ নিয়ে স্বপ্ন পূরণ না হলে তা কীভাবে মেনে নেন? জবাবে তিনি মৃদু হেসে বলেন, ‘সব কাজেই যে অতৃপ্তি থাকে তা নয়। কিছু কিছু নাটকে কাজ করে আত্মতৃপ্তি হয়েছে। কোনো কাজ করতে গিয়ে যদি বুঝতে পারি যে এখানে আত্মতৃপ্তির জায়গা নেই, তখন ওভারঅল কাজ করে চলে আসি। আর অতৃপ্তির জায়গাটা আমার কিছুটা বেশি, কারণ কাজ নিয়ে আমার স্বপ্নের জায়গাটা অন্য রকম। যে রকম স্বপ্ন নিয়ে কাজ করতে চাই, তা হয়তো নানা কারণে পারি না।’অভিনয় না মডেলিং কোনটি বেশি ভালো লাগে? উত্তরে মৌটুসী বলেন, ‘আমি প্রতিটি এরিনাতে কাজ করে আনন্দ পাই। মডেলিংয়ে অল্প সময়ে দর্শকের কাছে যাওয়া যায়। আর অভিনয় হলো আমার ভালো লাগার জায়গা। অভিনয়ের ক্ষেত্রটি হলো- একটি পূর্ণ প্যাকেজ। এখানে সবকিছু জানতে হয়। তাই অভিনয়টা বেশি ভালো লাগে।’ আপনি তো অনেক দিন থেকে মিডিয়ায় কাজ করছেন। সময়ের সাথে সাথে ভাবনার বদল হয়। বর্তমানে কাজ নিয়ে আপনার ভাবনাটা কেমন? মৌটুসী স্বভালসুলভ সুন্দর একটি হাসি উপহার দিয়ে বলেন, ‘ভাবনা অবশ্যই অনেক চেঞ্জ হয়েছে। প্রথমের চেয়ে অনেক পরিবর্তন হয়েছে ভাবনা ও কাজের। প্রথম দিকে পরিচালকদের ওপর পুরোটা নির্ভরশীল ছিলাম। এখন অভিজ্ঞতায় সঞ্চয় করেছি। নিজের প্রতি আস্থা বেড়ে গেছে। কোনো চরিত্র নিয়ে ভাবলে সহজেই তার ভেতরে ঢুকতে পারি এবং সেভাবেই নিজেকে উপস্থাপন করি। আপনারা অনেকের সাথেই কাজ করেন।’
বর্তমান ব্যস্ততা
বর্তমানে মৌটুসী বেশ কয়েকটি ধারাবাহিক নাটক নিয়ে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন। এগুলো হলো—শিহাব শাহীনের পরিচালনায় ‘ভালোবাসার চতুস্কোণ’, আলী ফিদা একরাম তোজোর ‘অঘটন ঘটন পটিয়সী’সহ আরও কয়েকটি নাটক। এই নাটকগুলোতে ভিন্ন ভিন্ন চরিত্রে তিনি অভিনয় করেছেন বলেন জানালেন। বর্তমানে এনটিভিতে প্রচার হচ্ছে মৌটুসী অভিনীত ধারাবাহিক নাটক ‘অঘটন ঘটন পটিয়সী’। এই নাটকে রহস্যময় তরুণীর চরিত্রে অভিনয় করেছেন তিনি। এই নাটক প্রসঙ্গে মৌটুসী বলেন, ‘এখানে আমার চরিত্রের নাম তামান্না। যে বেশ রহস্যময় তরুণী। কিছু মিশন নিয়ে সে কাজ করলেও সহজে কেউ তা ধরতে পারে না। কিন্তু তার কাজকর্ম একসময় ধীরে ধীরে প্রকাশ হয়ে যায়।’ অভিনয় নিয়ে বর্তমানের ভাবনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘এখন আমি কিছু এক্সপেরিমেন্টাল ক্যারেক্টার করছি। এটা সব সময়ই আমার ভালো লাগে। সামনে আরও এ রকম ক্যারেক্টারে কাজ করতে চাই।’ তিনি কিছুটা আক্ষেপ করে বলেন, ‘কি আর বলব, দেশের এ পরিস্থিতিতে আমরা ঠিকমতো কাজ করতে পারছি না। হরতালের কারণে শুটিং স্পটে যেতে অনেক সমস্যা হচ্ছে। কিন্তু যত কষ্টই হোক, তারপরেও যাচ্ছি শুটিং করতে। কেননা আমরা শুটিংয়ে না গেলে পরিচালক ও প্রযোজনা সংস্থাগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আমাদের সবার প্রত্যাশা যেন দ্রুত দেশের সার্বিক পরিস্থিতি ভালো হয়।’
বড় প্রাপ্তি
তার একমাত্র কন্যার নাম আরিয়া। বয়স ১ বছর। বয়স কম হলে কি হবে, সে এখনই দুষ্টুমিতে পটু। মায়ের কোলে একবার গেলে আর নামতে চায় না। একমাত্র কন্যা প্রসঙ্গে মৌটুসী বলেন, ‘আমার জীবনে সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি আমার মেয়ে। মাতৃত্বের স্বাদ অনেক মধুর। আমার মেয়ে আমাকে ছাড়া কিছুই বোঝে না। মেয়ের সঙ্গে সময় কাটাতে আমার বেশ ভালোই লাগে। আমি নিজেই ওর সব প্রয়োজনের দিকে খেয়াল রাখি। আমার সব চিন্তা মেয়েকে নিয়ে।’
ভবিষ্যত্ স্বপ্ন
অভিনয়ে ভিন্ন ভিন্ন চরিত্র নিজের ভেতর লালন করেন তিনি। মৌটুসী যে রকম তার বাইরে চরিত্রের প্রয়োজনে নানা রকম বৈশিষ্ট্যের মানুষ হয়ে উঠতে হয় তাকে। ফলে এ বিষয়টিও দারুণ এনজয় করেন তিনি। ভবিষ্যত্ স্বপ্নের কথা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি অভিনয়কে অনেক ভালোবাসি ও শ্রদ্ধ করি। তাই অভিনয় নিয়েই বাকি দিনগুলো কাটাতে চাই। প্রকৃত অর্থে একজন অভিনয়শিল্পী হওয়ার জন্য নিজেকে সেভাবে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছি।’
মেকআপ হেয়ারোবিক্স ব্রাইডাল
