হিন্দি সিনেমার জাঁদরেল ভিলেন অভিনেতা শক্তি কাপুর। পর্দায় তার ভিলেনি কর্মকাণ্ড দেখে দর্শক ভয়ে শিউরে উঠেছেন, চমকে গেছেন অনেকবার। তার অভিনয় দর্শকদের এতটাই আলোড়িত করেছে যে তাকে তাদের ঘৃণার মুখে পড়তে হয়েছে বারবার। এসবই নিজের অভিনয়ের সাফল্য ভেবে পরিতৃপ্ত লাভ করেছেন শক্তি কাপুর। তবে বাড়িতে প্রায়ই কন্যার বকাঝকা শুনতে হয়েছে তাকে। বিভিন্ন ছবিতে মন্দলোক হিসেবে বাবাকে দেখা যেত। তখন মা তাকে বোঝাতেন—এসব স্রেফ অভিনয়, বাস্তবে তোমার বাবা কত ভালোমানুষ। এখন শ্রদ্ধা কাপুর আর সেই ছোট্টটি নেই। এখন সে ২৪ বছরের তরুণী। এখন শ্রদ্ধা উপলব্ধি করেন বাবার মধ্যে আসলে মন্দ মানুষের কিছুই নেই, পর্দায় খলনায়ক সেজে যা করতেন তার সবই ছিল অভিনয়। বাবার ভিলেন চরিত্রে অভিনয় শ্রদ্ধার ভালো না লাগলেও কমেডি রোলে তার অভিনয় দারুণ উপভোগ করেন শ্রদ্ধা। বাড়িতে বেশ কড়া শাসনের মধ্যে রাখেন বাবা সবাইকে, তারপরেও শ্রদ্ধার ভীষণ প্রিয় তার বাবা। আর মা একজন বান্ধবীর মতো। ‘বাবা-মা দুজনের সঙ্গেই দারুণ ফ্রি আমি। কোনো ছেলেকে দেখে ভালোলাগলে সেটাও এসে তাদের বলি বন্ধু ভেবে। তারাও খুব ভালোবাসেন আমাকে’, বলেন শ্রদ্ধা।
‘আশিকী ২’ ছবিতে নায়িকা চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ পাওয়াটা তার জন্য ছিল হতাশা ও ব্যর্থতার পর অনেক আশার সঞ্চার। ২০১০-এ শ্রদ্ধা কাপুরের বলিউডে অভিষেক হয়েছিল ‘তিন পাত্তি’ ছবির মাধ্যমে। এ ছবিতে তার অভিনীত চরিত্রটি ছিল কলেজের মেধাবী এক ছাত্রীর। যে কলেজের রকস্টার হিসেবেও খ্যাত। অমিতাভ বচ্চন, মাধবন ও রাইমা সেনও ছিলেন তার সাথে এ ছবিতে। শ্রদ্ধা ভালো অভিনয় করলেও ‘তিন পাত্তি’ চরমভাবে ফ্লপ করেছিল বক্স অফিসে। তখন এ ছবির তেমন প্রচারণাও চালানো হয়নি। ফলে শ্রদ্ধা অভিনীত ছবি মুক্তি পেলেও তিনি রয়ে যান আলোচনার বাইরে। এরপর ২০১১-তে শ্রদ্ধা অভিনীত আরেকটি ছবি ‘লাভ কা দ্য এন্ড’ মুক্তি পায়। ইয়াশ রাজ ফিল্মসের সহযোগী ব্যানার ওয়াই ফিল্মের এ ছবিতেও শ্রদ্ধা নায়িকা চরিত্রে অভিনয় করেন। এ ছবিতে তাকে দেখা যায় প্রেমিকের প্রতারণার শিকার এক ইনোসেন্ট তরুণী রিয়া চরিত্রে। যে একসময় আগের সব বৈশিষ্ট্য ঝেড়ে ফেলে ডানপিটে, দাঙ্গাবাজ তরুণীরূপে আবির্ভূত হয়। এ ছবিটিও শোচনীয়ভাবে ফ্লপ হয়েছিল। তবে ‘লাভ কা দ্য অ্যান্ড’ ছবিতে অভিনয়ের জন্য শ্রদ্ধা স্টারডাস্ট সার্চলাইট অ্যাওয়ার্ড পেয়েছিলেন। দুর্ভাগ্যজনকভাবে পর পর অভিনীত দুটি ছবির ব্যর্থতা তাকে হতাশ করেছিল। ইয়াশরাজ ফিল্মস শ্রদ্ধাকে তিন ছবিতে অভিনয়ের জন্য চুক্তিবদ্ধও করেছিল। তাদের ‘লাভ কা দ্য এন্ড’ ছবির পর প্রায় একবছর বাড়িতে বেকার বসেছিলেন তিনি। ওই সময়ের মধ্যে তারা শ্রদ্ধাকে নিয়ে নতুন কোনো ছবিতে কাজ শুরু করেননি চুক্তি অনুযায়ী, তেমনি সময়ে হঠাত্ একদিন প্রখ্যাত চিত্রনির্মাতা মহেশ ভাটের কাছ থেকে ডাক পান শ্রদ্ধা। মহেশ ভাট তার সুপারডুপার হিট ছবি ‘আশিকী’র সিক্যুয়েল তৈরির পরিকল্পনা নেওয়ার পর এ ছবির জন্য নতুন নায়িকা ও নায়ক খোঁজার আয়োজন করেছিলেন। অনেক ছেলেমেয়ে নায়ক-নায়িকা হতে অডিশন দিলেও এদের কাউকে পছন্দ হয়নি এ ছবির নির্মাতাগোষ্ঠীর। ‘আশিকী ২’ ছবির নায়িকা আরোহ চরিত্রে অভিনয়ের জন্য চুক্তিবদ্ধ হওয়ার পর পরই ইয়াশরাজ ফিল্ম অর্জুন কাপুরের বিপরীতে ‘আওরঙ্গজেব’ ছবিতে অভিনয়ের জন্য শ্রদ্ধাকে প্রস্তাব দেয়। তাদের তিন ছবিতে নায়িকা হওয়ার জন্য চুক্তিবদ্ধ থাকলেও ‘আশিকী ২’ ছবিতে চুক্তিবদ্ধ হওয়ার আগে ইয়াশরাজ ফিল্মসকে এ বিষয়ে কিছু জানাননি কিংবা তাদের কাছ থেকে অনুমতি নেওয়ার প্রয়োজনবোধ করেননি শ্রদ্ধা। এতে তারা ভীষণ ক্ষুব্ধ হন এবং শ্রদ্ধার সঙ্গে করা চুক্তি বাতিল করে দেন।
ইয়াশরাজ ফিল্মসের মতো প্রেস্টিজিয়াস ব্যানার হাতছাড়া হয়ে গেলেও শ্রদ্ধা কাপুর অখুশি বা হতাশ নন। কারণ ভাট শিবিরে অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন তিনি। এখানেও প্রতি বছর অনেক ছবি তৈরি হয়। সাধারণত ইরোটিক ধাঁচের ছবি নির্মাণে বিশেষ ফিল্মস বলিউডে আলাদাভাবে পরিচিত হলেও তাদের এবারের ছবি ‘আশিকা ২’ সম্পূর্ণভাবে একটি মিউজিক্যাল লাভ স্টোরি হিসেবে দর্শকদের মন ভরাতে আসছে। এখানে শ্রদ্ধাকে কোনো সাহসী খোলামেলা বিতর্কিত দৃশ্যে অভিনয় করতে হয়নি। ‘আশিকা ২’ ছবিতে নিজের অভিনয় প্রসঙ্গে শ্রদ্ধা বলেন, ‘আমি কোনো চাপ অনুভব করিনি এ ছবির শুটিংয়ের সময়। রিলাক্স মুডে কাজ করেছি। পরিচালক মোহিত সুরি আমাকে কোনোভাবেই টেনশনে ফেলেননি। ‘আশিকী ২’-এর গানগুলো আমাকে আবিষ্ট করে রাখত সব সময়। এখনও মনে হয় ঘোরের মধ্যে আছি।’
শ্রদ্ধা তার বাবা শক্তি কাপুর ও খালা একদার সাড়া জাগানো অভিনেত্রী পদ্মিনী কোলাপুরের কাছ থেকে অভিনয়ের প্রয়োজনীয় টিপস নিয়েছেন। মুম্বাইয়ে স্কুল-কলেজ জীবন শেষে করে তিনি আমেরিকার বোস্টন ইউনিভার্সিটিতে থিয়েটার স্টাডিজ বিষয়ে পড়তে ভর্তি হয়েছিলেন। কিছুদিন পড়াশোনার পর অভিনয়ের হাতছানিতে মুম্বাই ফিরে এসেছিলেন। শ্রদ্ধার বড় ভাই সিদ্ধান্ত কাপুর একজন ডিজে এবং সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ করলেও হালে ‘শুট আউট অ্যাট ওয়াডালা’ ছবির মাধ্যমে অভিনেতারূপে আত্মপ্রকাশ করতে যাচ্ছেন।
শ্রদ্ধা কাপুর ২০১০-এ বলিউডের হটেস্ট নিউ সেনশেন (নারী) হিসেবে বিবেচিত হয়ে তৃতীয় অবস্থানে ছিলেন।
ক্যারিয়ারের শুরুতে সম্ভাবনাময় অভিনেত্রী হিসেবে চিহ্নিত হলে অভিনীত ছবিগুলোর ব্যর্থতা শ্রদ্ধাকে আড়ালে নিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু এখন অভিনীত তৃতীয় ছবি ‘আশিকী ২’ তাকে আবার নতুন করে আলোচনার নিয়ে এসেছে। বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে এ ছবির বেশ কয়েকটি গান দেখানোর সুবাদে শ্রদ্ধা দর্শকদের নজর কেড়েছেন। বিপুল সংখ্যক দর্শক তার প্রতি কৌতূহলী হয়েছেন। ‘আমার অনেক ভালো লাগছে, ‘আশিকী ২’ আমার জন্য আশীর্বাদ হয়ে এসেছে। আমি যতটা সুযোগ পেয়েছি তা কাজে লাগিয়েছি। আমি অধীরভাবে অপেক্ষা করছি এ ছবির ফলাফলের জন্য। প্রথম দু’বার ব্যর্থ হলেও তৃতীয়বার সাফল্য আমার হাতে ধরা দেবেই এ ব্যাপারে আমি আস্থাশীল’, বলেন শ্রদ্ধা কাপুর।
কন্যার ক্যারিয়ারে নতুন করে গতির সঞ্চার হওয়ায় পিতা শক্তি কাপুরও বেশ খুশি। শ্রদ্ধাকে নতুন করে বড় ধরনের ব্রেক দেওয়ায় তিনি প্রখ্যাত চিত্রনির্মাতা মহেশ ভাটের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন। ‘আশিকী ২’-এর পর শ্রদ্ধা বর্তমানে অভিনয় করছেন করণ জোহর প্রযোজিত ‘গৌরি তেরে পেয়ার মে’ ছবিতে। এ ছবির প্রধান তারকা হিসেবে শ্রদ্ধাকে দেখা যাবে ইমরান খান ও কারিনা কাপুরের সঙ্গে।
২৩ বছর আগে মহেশ ভাটের আশিকী-গার্ল হয়ে বাজিমাত করেছিলেন আনু আগরওয়াল। এবার নতুন আশিকী-গার্ল হয়ে আসছেন শ্রদ্ধা কাপুর। দর্শক অপেক্ষা করছেন তার জন্য। শ্রদ্ধাও কি আশিকী-গার্ল হয়ে বাজিমাত করবেন—তা জানা যাবে ‘আশিকী ২’ ছবির বিজনেস রিপোর্ট দেখে। ততদিন অপেক্ষা করতে হবে সবাইকে।
