যে প্রাণ ফুল ফুটিয়ে তোলে, শস্য ফলায়, নতুন সৃষ্টিতে নবীন হয়ে ওঠে, সেই প্রাণই একজন শিল্পীকে ফুটিয়ে তোলে। এমনই এক শিল্পী ছিলেন কলিম শরাফী যিনি আজ গানের ওপারে। ১৯৭৯ সালের ১৫ এপ্রিল ‘সচিত্র সন্ধানী’র ২য় বর্ষ ১ম সংখ্যায় কলিম শরাফীর একটি সাক্ষাত্কার ছাপা হয়েছিল। সাক্ষাত্কারটি নেন ফারুখ ফয়সল। শিরোনাম ছিল ‘এ কী তৃষা গোধূলির প্রান্তে’। সম্প্রতি ‘একপক্ষ’ ম্যাগাজিনে এটি পুনর্মুদ্রিত হয় এবং আদ্যোপান্ত পড়ার পর আবেগে উদ্বেলিত হয়ে উঠলাম। এতে কলিম ভাই বলেছিলেন, “এই ’৭৯-তে আমি ভালোই আছি, মাঝে মাঝে মনে হয়, ‘এ কি তৃষা গোধূলির প্রান্তে’।” আসলে এটি আমারই লেখা একটি গানের প্রথম কলি। চলচ্চিত্রের জন্য লেখা। নাম ‘গোধূলির প্রেম’। পরিচালক মহিউদ্দিন সাহেব। কণ্ঠ ছিল কলিম শরাফীর। সমসময়ে এ গানটি বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। রেডিওতে প্রায়ই বাজত। আমার বেশকিছু জনপ্রিয় গানের মতো এটি এখন হাতছাড়া। শৈশব-কৈশোরের মতো চিরতরে হারিয়ে গেছে। এ বেদনা আমি বয়েই চলেছি। কলিম ভাই ছিলেন জাতীয় প্রেসক্লাবের একজন সম্মানিত সদস্য। প্রায়ই আসতেন। দেখা হলেই আমি আমার আক্ষেপের কথা বলতাম। চোখেমুখে অকৃত্রিম আত্মীয়তার আলো ফুটিয়ে বলতেন, ‘গানটির কথাগুলো লিখে দাও, সুর জানা আছে, আবার গাইব।’ কিন্তু তা তো হবার নয়। কেননা গানের কথাগুলো আমি লিখে রাখিনি, প্রয়োজনও ছিল না। ’৯০-এর দশকের একরাত। বিটিভিতে উচ্চাঙ্গ সংগীতের অনুষ্ঠান। কানে এলো চর্চ্চিত একটি সুললিত কণ্ঠের আওয়াজ। এক অমোঘ টানে টিভির সামনে গিয়ে বসলাম। না, শিল্পীকে চিনতে পারলাম না। এ দেশের কেউ বলে মনে হলো না। সুরের মূর্চ্ছনায় বিভোর—এমন আত্মমগ্ন পরিবেশনায় ভীষণ আপ্লুত হলাম। কৌতূহলবশত পরদিন বিটিভিতে যোগাযোগ করে শিল্পীর নাম ও ফোন নম্বর নিলাম। যথারীতি নিজের পরিচয় দিয়ে শিল্পীকে আন্তরিক অভিনন্দন জানাতেই তিনি বললেন, ‘আপনি নিশ্চয়ই আমার বাবাকে চিনবেন। আমার বাবা কলিম শরাফী।’ কি আশ্চর্য, তুমি আলেয়া শরাফী? ‘সুতরাং’ ছবির ‘এমন মজা হয় না, গায়ের সোনা গয়না’, সেই জনপ্রিয় গানটির কিশোরীশিল্পী! হেসে বলল, ‘হ্যাঁ।’ কলিম ভাইয়ের কণ্ঠে ‘গোধূলির প্রেম’ ছবিতে আমার লেখা গান ‘এ কি তৃষা গোধূলির প্রান্তে’ উল্লেখ করতেই, উচ্ছ্বাসভরে জানালো ছোটবেলায় ওই গানটি গাইতে গাইতে নাকি তার সংগীতজীবনের চর্চা শুরু। কথায় কথায় বলল, এখন প্রবাসে থাকে, সংগীতচর্চা আগের মতোই আছে। সে যাই হোক, মরহুম কলিম শরাফীর জীবনকাহিনী খুবই সংগ্রামমুখর। কলকাতার বিখ্যাত ‘দক্ষিণী সংগীত প্রতিষ্ঠান’ থেকে তিনি শিক্ষা গ্রহণ করেন। সেখানে তার সঙ্গে ছিলেন দেবব্রত বিশ্বাস, সুচিত্র মিত্র, হেমন্ত মুখোপাধ্যায় প্রমুখ। ছিলেন ‘বহুরূপীর’ ফাউন্ডার মেম্বার। অভিনয়ও করতেন। সাথে ছিলেন রবি শংকর, শম্ভু মিত্র, তৃপ্তি মিত্র, বিজন ভট্টাচার্য। এ ছাড়া সুভাষ মুখার্জী, সুকান্ত ভট্টাচার্য, জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র ও ঋত্বিক ঘটক। ১৯৫০ সালে বিশিষ্ট রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী আবদুল আহাদের আহ্বানে কলিম শরাফী সপরিবারে কলকাতা ছেড়ে ঢাকায় চলে আসেন। এ দেশে তখন রেডিও ছাড়া অন্য কোনো মিডিয়ার জন্ম হয়নি। ঢাকায় রবীন্দ্রসংগীতের শোচনীয় অবস্থা। কলিম শরাফী ছিলেন মূলত রবীন্দ্রসংগীত ও গণসংগীত শিল্পী। সে সময় ওই দুটোই ছিল অপরাধজনক। রবীন্দ্রনাথকে নিষিদ্ধ করার যখন অপচেষ্টা চলছিল, নজরুলকে সাম্প্রদায়িক বানানোর চেষ্টা চলছিল, তখন কিছু শুভবুদ্ধিসম্পন্ন ও মুক্ত চিন্তার মানুষ তা প্রতিরোধের মিছিলে নামেন। এঁদের মধ্যে কলিম শরাফী ছিলেন অগ্রগণ্য। অসাধ্য সাধনের মধ্য দিয়ে যে অদ্ভুত আত্মবিশ্বাস ও পরিতৃপ্তি পাওয়া যায় তার জন্য জীবনে ঝুঁকি নিতে তিনি পিছপা হননি। পরবর্তীকালে আবদুল আহাদ, শেখ লুত্ফর রহমান, আবদুল লতিফ, ফতেহ লোহানী, কাজী খালেক, আবুল হাশিম প্রমুখের সাথে তিনি আর্টিস্ট এসোসিয়েশন প্রতিষ্ঠা করেন। ’৫১ সালের শেষদিকে চট্টগ্রাম চলে যান। সেখানে গড়ে তোলেন নবনাট্য সংঘ। এরপর সত্যেন সেন প্রতিষ্ঠিত ‘উদীচীর’র সাথে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে পড়েন। ছিলেন এর সক্রিয় উপদেষ্টা। আমার চলচ্চিত্রের নেপথ্য-কণ্ঠশিল্পী হিসেবেও কলিম শরাফী প্রচুর খ্যাতি অর্জন করেন। ‘সূর্যস্নান’, ‘কখনও আসেনি’, ‘মেঘভাঙা রোদ’ ও ‘গোধূলির প্রেম’ ছবিতে তাঁর গান, বিশেষ করে খান আতার সুরে ‘ও আমার চক্ষু নাই রে’ আজও জনপ্রিয়। জহির রায়হানের সাথে কো-পরিচালক হিসেবে ‘সোনার কাজল’ নামে একটি ছবিও তৈরি করেন। এমন প্রাণবন্ত কর্মচঞ্চল মানুষটি জীবন-সায়াহ্নে এসে শারীরিক ও মানসিকভাবে নিস্তেজ হয়ে পড়েন। স্মৃতিশক্তি অনেকটা হারিয়ে ফেলেন। ওই সময় একদিন আমি ফোন করেছিলাম। কিন্তু আমাকে যেন চিনতে পারলেন না। পরদিন দেখা করতে তাঁর বাসায় গেলাম। ভাষাহীন দৃষ্টিতে শুধু তাকিয়ে রইলেন। মুখে অদ্ভুত একটা সরল হাসি। মনটা আমার খারাপ হয়ে গেল। মনে হলো, গোধূলির রঙে রঙে আঁকা বহু দূর, আলোর বাঁশিতে বাজে বিদায়ের সুর। সুরের সাহানা বাজে স্তব্ধ বনানী মাঝে, বাতাস বিলাপ করে বেদনা-বিধুর! স্বাধীন বাংলাদেশে বাঙালি সংস্কৃতির প্রচার এবং ধারক-বাহকদের শীর্ষ তালিকায় কলিম শরাফী একটি স্মরণীয় ও বরণীয় নাম। এই বরণীয় মানুষটিও একদা আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন গানের ওপারে।
লেখক :গীতিকার, কবি ও সাংবাদিক
