নির্মাণ শৈলীতে চমক থাকায় তার প্রতিটি নাটক সমান জনপ্রিয় হয়ে ওঠে দর্শকদের কাছে। বেশ কয়েকটি জনপ্রিয় নাটক দিয়েই তিনি জয় করেছেন দর্শকের হূদয়। পরিচালনায় আসার নেপথ্যের গল্প জানতে চাইলে অঞ্জন আইচ মৃদু হাসলেন। কয়েক সেকেন্ডের বিরতি নিয়ে খুলে বসলেন তার কথার ঝাঁপি। তার ভাষ্যে, ‘ছোটবেলা থেকেই নিজের ভালোলাগা-মন্দলাগার বিষয় নিয়ে ভাবতাম। আমি যখন ক্লাস সেভেনে পড়ি তখন একটি জাতীয় দৈনিকে আমার লেখা গল্প প্রকাশ হয়। সেই আনন্দটা ছিল সত্যিই অন্য রকম।
মূলত কবিতার প্রতি দারুণ আসক্তি থেকেই এসএসসি শেষ করার পর বঙ্গাব্দ ১৪০০ সালে ছোট ভাই অনিমেষ আইচ, বন্ধু ইন্তেখাব দিনার ও আরও কয়েকজন তরুণ মিলে বের করি লিটল ম্যাগাজিন ‘ময়ূরাক্ষী’। অবশ্য তারুণ্যের এই কাব্যিক উত্তেজনায় ভাটা পড়ে কিছুদিনের মধ্যেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রসায়নে পড়লেও সেই সময়টায় দেশ-বিদেশের সাহিত্যও পড়েছি। তাই তো জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে প্রাপ্ত গল্পগুলোকে পাণ্ডুলিপিতে রুপ দিতে শুরু করি ২০০০ সালের দিকে। একপর্যায়ে ছোট ভাই অনিমেষ আইচের সাফল্য আমাকে অনুপ্রাণিত করে নাট্যরচনায় এগিয়ে আসতে।
এ ক্ষেত্রে অবশ্য মা অঞ্জলী আইচ, অনুজ অনিমেষ ছাড়াও বন্ধুমহল এবং পরোক্ষভাবে অনুপ্রাণিত করেছেন আমার শিক্ষক হুমায়ূন আহমেদ। নাটক রচনার পর কিছুটা দ্বিধাও কাজ করেছে এই ভেবে যে, যদি নির্দেশকরা ঠিকমতো না তৈরি করতে পারে ফিকশনটি। সেই তাগিদ থেকেই নিজের রচিত পাণ্ডুলিপি থেকে নির্মাণ করি ‘হাইড্রোফোবিয়া নয় বরং জল বিষয়ক গল্প’ ফিকশনটি। ইন্তেখাব দিনার, ইরেশ যাকের, আজাদ আবুল কালাম ও নোভা অভিনীত এই ফিকশনটি প্রচার হয় এনটিভি প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে। সেই থেকে শুরু এবং এখনও নির্মাণের সাথেই আছি।’
তার নির্মিত উল্লেখযোগ্য নাটকগুলো হলো—‘মিনারেল ওয়াটার’, ‘টু থাউজেন্ড ফোরটি নাইন’, ‘একটু পরেই ভয়ঙ্কর একটি নাটকের শুটিং শুরু হবে’ ‘শূন্য সমীকরণ’ প্রভৃতি। বর্তমানে নির্মাণ করছেন দুইটি ধারাবাহিক নাটক। এগুলো হলো—‘চন্দ্রাবতী’ ও ‘জলফড়িংয়ের গান’। এরমধ্যে ‘জলফড়িংয়ের গান’ নাটকটি বিগ বাজেটের। সেইসাথে এই নাটকে জনপ্রিয় অভিনয়শিল্পীরা অভিনয় করছেন। এই নাটক প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘অনেক আগে থেকেই এই নাটক নিয়ে কাজ করার ইচ্ছা ছিল। গত মার্চ থেকে শুটিং করছি। গল্পটা থ্রিলার টাইপের। রেইনড্রপ প্রডাকশনের ব্যানারে এটি নির্মিত হচ্ছে। নাটকটি নির্মাণ বেশ চ্যালেঞ্জিং বলা যায়। গল্পের প্রতিটি চরিত্রই বেশ উল্লেখযোগ্য। এই নাটকে সুর্বণা আপা সব কিছুর বিষয়ে আমাকে অনেক সহযোগিতা করেছেন।’ আগামী ৮ মে রবীন্দ্র জন্মজয়ন্তীতে কবিগুরুর গল্প অবলম্বনে তার নির্মিত তিনটি একখণ্ডের নাটক প্রচার হবে। এগুলো হলো—মাছরাঙা টেলিভিশনে টেলিফিল্ম ‘শেষ রাত্রি’, এসএ টিভিতে ‘বদনাম’ ও একুশে টেলিভিশনে ‘নিষ্কৃতি’। আসছে ঈদের জন্য তিনি নির্মাণ করছেন তিনটি এক খণ্ডের নাটক। এগুলো হলো—‘মেয়েটি বিবর্ণ প্রজাপতি ভালোবাসতো’, ‘রাশেদ সাহেব ও একটি কালো বাক্স’ ও ‘ভূত সমাচার’। কোনো নাটক নির্মাণের পূর্বে আপনার মধ্যে কি কি বিষয় কাজ করে জানতে চাইলে অঞ্জন আইচ বলেন, ‘প্রথমত পান্ডুলিপি। পান্ডুলিপি অনুসারে শিল্পী, কসটিউম-এসব বিভিন্ন বিষয় নিয়েই চিন্তা ভাবনা করি।’ আর নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হবার অনুভূতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘অনুভূতি সত্যিই অন্যরকম। সামনের দিকে এগুতে সাহায্য করে। তবে নিজের ভুলগুলো খুটিয়ে খুটিয়ে বের করি, তখন মনে হয় ইশ্ এই শর্টটা এভাবে না নিয়ে ওইভাবে নিতাম। এভাবে না করে যদি আরেকটি ভালো করে করতাম। তখন কিছুটা অপূর্ণতা রয়ে যায়।’ নিজের নাটকের নামগুলোর ভিন্নতার কথা বলতে গিয়ে অঞ্জন আইচ বলেন, ‘এটাই আমার স্বকীয়তা।’
তিনি আরও বলেন, ‘নাটক শব্দের ব্যবহার আমাদের জানা ও বুঝা উচিত। টেলিভিশনে যা ক্যামেরা দিয়ে ধারণ করে দর্শকের সম্মুখে উপস্থাপন করা হয় তা হলো ফিকশন। নাটক বলতে বোঝায় মঞ্চ নাটক, পথনাটক ইত্যাদিকে। অন্যদিকে যারা জীবিকার জন্য সস্তা ফিকশন নির্মাণ করছেন তাদের উচিত এই শিল্পকে ছেড়ে চলে যাওয়া। কারণ, শিল্প তো দরিদ্র নয়। আমার বরাবরই চেষ্টা থাকে ক্যামেরার ফ্রেমগুলোকে ফিল্মের মতো ব্যবহার করতে। আর যারা বলেন আমার ফিকশনগুলো নির্দিষ্ট দর্শকের জন্য। তাদের জন্য বলব, খুব সাধারণ সহজাত বিষয়গুলোকেই আমি তুলে ধরি। এ ছাড়া কোনো অভিনেতা-অভিনেত্রী পাণ্ডুলিপির বাইরে সংলাপ দিলে আমি তা গ্রহণ করি না। আমি পেশাদারিত্ব নিয়ে মানসম্পন্ন কাজ করতে চাই।’
এই পেশার মূল আকর্ষণের কথা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘প্রশ্নটা খুব জটিল। সাধারণ দৃষ্টিতে দেখলে নাম, যশ, খ্যাতি। কিন্তু এর ব্যাপকতা অনেক। সৃষ্টির আনন্দ একটা বিশাল ব্যাপার। আমি যা বলতে চাই তা আমি আমার সৃষ্টির মাধ্যমে সবাইকে জানাতে পারি। এই আনন্দের সাথে কোনো কিছুর তুলনা হয় না। একটা স্বপ্ন বুকের মধ্যে লালন করছি তারপর সেটা সবার মাঝে ছড়িয়ে দিচ্ছি।’
আমাদের দেশে এই পেশা কতটা জনপ্রিয়? এমন প্রশ্নের জবাবে অঞ্জন আইচ বলেন, ‘দেশে এই পেশার জনপ্রিয়তা যেমন আছে-তেমনি সামাজিকভাবে নেতিবাচক ধারনাও আছে। আমাদের দেশে এটা এখনও পুরোপুরি পেশাদার রূপ নেয়নি। সবাই মিলে একটা পেশাদার কাজের ক্ষেত্র তৈরী করতে পারলে এই সামাজিক নেতিবাচকতা দূর করা সম্ভব।’
নতুন যারা এই পেশায় এসেছেন তাদের সম্পর্কে মূল্যায়ন জানতে চাইলে অঞ্জন আইচ বলেন, ‘নতুন নির্মাতা, যারা আসছেন, ভেবে নিন লড়াই করতে নামছেন। অনিশ্চিত এবং অভাবগ্রস্ত হওয়ার জন্য প্রস্তুত হতে হবে। নিজের দার্শনিক জায়গাটা প্রস্তুত করতে হবে। পড়াশোনা এবং নিজের একটা সার্বভৌম চিন্তার জগতে রাজা হয়ে উঠতে হবে।’ ভবিষ্যত্ স্বপ্নের কথা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আগামীতেও নির্মাণের সাথেই থাকতে চাই। সেইসাথে নাটক নির্মাণের পাশাপাশি চলচ্চিত্র নির্মাণ শুরু করব। আশা করছি আগামী বছর চলচ্চিত্র নির্মাণে হাত দিতে পারব।’
