ভবন নির্মাণ আইন আছে, বাস্তবায়ন নেই

আপডেট : ২৪ এপ্রিল ২০১৩, ২২:৪২
দেশে নিরাপদ ভবন বা ঝুঁকিমুক্ত অট্টালিকা নির্মাণের জন্য যথোপযুক্ত আইন রয়েছে। ১৯৫২ সালে প্রণীত এই আইনের আওতায় পরবর্তীকালে তৈরি করা হয়েছে বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড এবং ইমারত নির্মাণ বিধিমালা। কিন্তু এসব আছে শুধু নথিপত্রে। দীর্ঘ ৬২ বছরেও আইনটি বাস্তবায়নের কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। এমনকি এসব আইন ও বিধি-বিধান বাস্তবায়নের জন্য রাষ্ট্রের তরফে সমন্বিত কোনো ব্যবস্থা যেমন নেই, তেমনি তদারকির জন্যও নেই কোনো কর্তৃপক্ষ। মূলত এ কারণেই দেশে একের পর এক ভবন ধসের মতো মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় ব্যাপক প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। প্রতিটি দুর্ঘটনার পরই সরকারের তরফে নানা তোড়জোড় দেখা যায়। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই সবকিছু আবার চলে যায় হিমাগারে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, ভবন নির্মাণ সম্পর্কিত আইন, কোড ও বিধি-বিধানসমূহ অনতিবিলম্বে যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা না হলে ভবিষ্যতে এ ধরনের ভয়াবহ দুর্ঘটনা আরও বেশি বেশি ঘটতে পারে। অনুসন্ধানে জানা যায়, দেশে ভবন বা অট্টালিকা নির্মাণের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ১৯৫২ সালে প্রণয়ন করা হয় ‘ বিল্ডিং কনস্ট্রাকশন আইন ১৯৫২’। এ আইন অনুযায়ী দেশের যে কোনো স্থানে ভবন বা অট্টালিকা নির্মাণ করতে হলে সরকার নিযুক্ত অথরাইজড অফিসারের কাছ থেকে নকশা অনুমোদন করিয়ে নেয়া বাধ্যতামূলক। কিন্তু শুরু থেকেই আইনটির সঠিক বাস্তবায়নের দিকে নজর দেয়া হয়নি। আইনটি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ১৯৫৩ সালে গৃহায়ন ও পূর্ত মন্ত্রণালয়ের আওতায় ‘ বিল্ডিং সেল ’ নামে একটি পৃথক সেল খোলা হয়। একই সঙ্গে তত্কালীন কনস্ট্রাকশন্স অ্যান্ড বিল্ডিং (সিঅ্যান্ডবি) ডিপার্টমেন্টের প্রধান প্রকৌশলীকে নিয়োগ করা হয় অথরাইজড অফিসার। কিন্তু এ পদ্ধতিতে আইনটি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে তেমন ফল পাওয়া যায়নি। এ কারণে ১৯৫৬ সালে ঢাকা ইমপ্রুভমেন্ট ট্রাস্ট (ডিআইটি) প্রতিষ্ঠিত হলে সংস্থাটির চেয়ারম্যানকে অথরাইজড অফিসারের দায়িত্ব দেয়া হয়। এর মধ্যদিয়ে কার্যত বিল্ডি কনস্ট্রাকশন আইন কেবলমাত্র রাজধানীতে বাস্তবায়নের ব্যবস্থা করা হয়। ১৯৬২ সালে এসে অথরাইজড অফিসারের দায়িত্ব দেয়া হয় ডিআইটির প্রধান প্রকৌশলীকে। পরবর্তী সময়ে অবশ্য সংস্থাটিতে অথরাইজড অফিসারের বেশ কয়েকটি পদ সৃষ্টি করা হয়। বর্তমানে রাজউকে ৫জন অথরাইজড অফিসার রয়েছেন। এছাড়া রাজধানীর বাইরে চট্টগ্রাম, খুলনা ও রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের অধীনে বেশ কয়েকজন অথরাইজড অফিসার রয়েছেন, যারা সংশ্লিষ্ট এলাকায় ভবনের নকশা অনুমোদন দিয়ে থাকেন। নকশা অনুমোদনের ক্ষেত্রে অনুসরণের জন্য ১৯৯৬ সালে প্রথমবারের মতো প্রণয়ন করা হয় ইমারত নির্মাণ বিধিমালা। বর্তমানে রাজধানীর বাইরের মহানগরীসমূহে এই বিধিমালার ভিত্তিতেই নকশা অনুমোদন দেয়া হয়ে থাকে। রাজধানী ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জের জন্য ২০০৮ সালে ‘ ঢাকা মেট্রোপলিটন ইমারত নির্মাণ বিধিমালা’ নামে পৃথক একটি বিধিমালা প্রণয়ন করা হয়। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বর্তমানে রাজধানীসহ দেশের সকল মহানগরী পর্যায়ে অট্টালিকা নির্মাণের ক্ষেত্রে অনুসৃত ইমারত নির্মাণ বিধিমালায় মূলত ভবনের নকশা এবং সংশ্লিষ্ট প্লটের ব্যবহারের বিষয়টি দেখা হয়। যে কোনো অট্টালিকা তৈরির ক্ষেত্রে এর নির্মাণ উপকরণের যথার্থতা এবং সামগ্রিক নিরাপত্তার বিষয়টি ন্যাশনাল বিল্ডিং কোডের অন্তর্ভুক্ত। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বিল্ডিং কনস্ট্রাকশন আইন ১৯৫২ প্রণয়নের প্রায় ৪১ বছর পর ১৯৯৩ সালে প্রথমবারের মতো তৈরি করা হয় বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড (বিএনবিসি)। যে কোনো অট্টালিকা নির্মাণের ক্ষেত্রে এর নির্মাণ উপকরণসমূহের যথার্থতা দিক-নির্দেশ করার পাশাপাশি নির্মিত ভবনের সার্বিক নিরাপত্তার বিষয়টিও নিশ্চিত করার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে এই বিল্ডিং কোডে। কিন্তু বিস্ময়কর হলেও সত্য যে, গত ২০ বছরেও বিল্ডিং কোড বাস্তবায়নের কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি। এমনকি সরকারের কোন্ কর্তৃপক্ষ এই বিল্ডিং কোড বাস্তবায়ন করবে এবং ভবন নির্মাণকারীরা কোড অনুসরণ না করলে সেটার প্রতিকারের বিষয়টিও এখন পর্যন্ত অনির্ধারিত। এমতাবস্থায় ভবন নির্মাণকারীরা নিজেদের ইচ্ছেমতো সনাতনী কায়দায় নির্মাণ করে থাকে অধিকাংশ অট্টালিকা। মূলত সে কারণেই অহরহ ভবন ধসের ঘটনা ঘটছে এবং প্রাণ হারাচ্ছে নিরীহ মানুষ। বিষয়টি নিয়ে ইত্তেফাক প্রতিনিধির সঙ্গে আলাপকালে বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড স্টিয়ারিং কমিটির আহবায়ক ও স্থাপত্য অধিদপ্তরের প্রধান স্থপতি আহসানুল হক খান বলেন, বিল্ডিং কোড প্রণয়ন ও যুগোপযোগী করার ক্ষেত্রে সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করে থাকি আমরা। ১৯৯৩ সালে বিল্ডিং কোড প্রণয়নের পর ২০০৬ সালে নতুনভাবে এটিকে যুগোপযোগী করার প্রক্রিয়া শুরু হয়। এই কাজে পরামর্শকের দায়িত্ব পালন করছে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)। বিগত ৭ বছর ধরে অনেকগুলো সভা-সেমিনার ও সিম্পোজিয়ামের মধ্যদিয়ে সংশোধিত বিল্ডিং কোড ইতিমধ্যেই চূড়ান্ত করা হয়েছে। আগামী সপ্তাহেই এটি আনুষ্ঠানিকভাবে পূর্ত মন্ত্রণালয়ের কাছে হস্তান্তর করা হবে। তিনি বলেন, দেশজুড়ে ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে বিল্ডিং কোডের অনুসরণ নিশ্চিত করার জন্য একটি একক কর্তৃপক্ষ থাকা আবশ্যক। ইতিমধ্যেই সরকারকে সে ধরনের পরামর্শ দেয়া হয়েছে বলে জানান তিনি। এ বিষয়ে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের প্রধান প্রকৌশলী এমদাদুল ইসলাম ইত্তেফাককে বলেন, মূলত ১৯৫২ সালের বিল্ডিং কনস্ট্রাকশন আইনটি পুরোপুরি বাস্তবায়িত না হওয়ার কারণেই ত্রুটিপূর্ণ ভবন তৈরির সুযোগ থেকে যাচ্ছে। মেট্রোপলিটন এলাকাসমূহের বাইরে ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে নকশা অনুমোদনের জন্য আজও কোনো আইনানুগ কর্তৃপক্ষ বা অথরাইজড অফিসার নেই। স্থানীয় পৌরসভা বা ইউনিয়ন পরিষদগুলো বেআইনীভাবে নিজেদের ইচ্ছেমাফিক ভবনের নকশা অনুমোদন করছে। অথচ এ কাজের জন্য প্রয়োজনীয় আইনী এখতিয়ার এবং যোগ্যতা বা দক্ষতা তাদের নেই। এই প্রবণতা রোধে ভবনের নকশা অনুমোদন ও বিল্ডিং কোড বাস্তবায়নের জন্য একটি সমন্বিত ও দক্ষ ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা জরুরি বলে মন্তব্য করেন তিনি। বিল্ডিং কোড বাস্তবায়নের বিষয়ে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. খোন্দকার শওকত হোসেনের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি বলেন, এটা ঠিক যে বিল্ডিং কোড বাস্তবায়নের জন্য একটি সমন্বিত কর্তৃপক্ষ থাকা জরুরি। বিল্ডিং কোড যুগোপযোগী করার দায়িত্বে নিয়োজিত স্টিয়ারিং কমিটির পক্ষ থেকেও একটি একক রেগুলেটরি কর্তৃপক্ষ গঠনের সুপারিশ করা হয়েছে। আগামী সপ্তাহ নাগাদ সংশোধিত বিল্ডিং কোড সরকারের হাতে এসে পৌঁছানোর পর এটির যথাযথ বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় কর্তৃপক্ষ গঠনের বিষয়ে সরকার উদ্যোগী হবে বলে জানান তিনি।