শিল্পকলায় আবু জাফরের একক চিত্রপ্রদর্শনী

জমে থাকা বর্ণিল বায়ু

আপডেট : ২৫ এপ্রিল ২০১৩, ১৮:১৯
হানস হোফম্যানের ‘ইফারভেসেন্স’, বেন সানের ‘প্যাসিফিক ল্যান্ডস্কেপ’ কিংবা মার্ক টোবের ‘এজ অব আগস্ট’ ছবিগুলোর সূত্র প্রায় একই। তারও একটু পেছনে ফিরে তাকানো যেতে পারে; পয়েন্টালিজমের শিল্পী জর্জ সুরাতের কাজগুলো। হানস দেখেছিলেন, প্রকৃতি অত্যন্ত গতিশীল। প্রযোজ্য শব্দ হচ্ছে নড়ছে বাতাসের দোলে। সুরত দেখলেন সূক্ষ্মভাবে। গাদাগাদা বর্ণ এবং বিন্দুর আড়ত। প্রকৃতির ফ্রেম বিস্তার। যতটুকু আসে তার ভেতরই রয়েছে বিস্তৃত অবজেক্ট। কতটুকু নেওয়া যাবে তার! জমিনসহ বৃক্ষরাজি? না কি কেবলই বৃক্ষ? না কেবল পর্ণ অথবা সব উপকরণ বাইরে রেখে কেবল আবহাওয়ামণ্ডল বা টোটাল অ্যাটমোসফেয়ারের যে রং সেই সব! আবু জাফরের কাজ আমাদের সেই দিকে তাকাতে বলছে নিশ্চিত। জাফরের কাজের বিষয়বস্তু এবং আকারের উপস্থিতি বিশেষত তাঁর পেইন্টিংসের ভেতর যেভাবে আমরা প্রত্যক্ষ করি, সেখানে বিষয়বস্তুর সাথে আকারের উপস্থিতি ততটা মুখ্য নয়। বিষয়বস্তুর আবহ নিয়েই তাঁর কাজ। রং সেখানে মাধ্যম। কতক ক্ষেত্রে একমাত্র মাধ্যম। ছবিগুলোর শিরোনাম ভুলে গিয়ে তাকালে যা মনে হবে, কেবল কতগুলো ইমেজসর্বস্বতা। আধুনিক চিত্রকলা বিশেষত বিমূর্ত চিত্রকলার এই এক ধরন। কোনো প্রকার বয়ান সেখানে থাকে না। অধিকন্তু বিশ্লেষণ বা বিবরণ নয়। সব কিছুকে প্রতিকায়িত করে দেখানোর দিকে প্রবল ঝোঁক থাকে তার। বিষয়বস্তুর গঠনপ্রক্রিয়ার পুরোটা হাজির করা যার স্বভাব -বিরূদ্ধ। মৌল অবকাঠামো থেকে চিত্রতলে এমন একটা বিন্দুর উপস্থিতি ঘটানো, যা পুরোটা দৃশ্যাবলির প্রতিনিধিত্ব করতে পারে। জাফরের চিত্রকলাও তা-ই। একটি বিন্দু দিয়ে যেমন সিন্ধুর অবস্থা জাহের করছে তেমনি অসংখ্য বিন্দু দিয়ে একটি অবস্থার দিকে ফিরে আসছে। যথার্থভাবে প্রতিটা বিন্দুকেই আলাদাভাবে পাওয়া যাবে; যদিও তারা পাশাপাশি সংস্থাপিত। ‘টিপ’, ‘মিড নাইট ড্রিম’, ‘মিস্ট অব টুইলাইট’, ‘ড্যান্সিং থ্রু ডে অ্যান্ড নাইট’, ‘কানেকশন’, ‘দ্য ব্লাড নট ইয়েট ড্রাই’, ‘বসন্ত’, ‘বসন্ত সন্ধ্যা ও সকাল’, ‘আনটাইটেলড’ কিংবা ‘আন্ডার দ্যা সি’ এই ছবিগুলোর রং গীতল, বর্ণের দ্বিত্ব উপস্থিতি এবং স্থিরতার ভেতর তারতম্য আছে। অবস্থাকে বুঝিয়ে ওঠা এবং নান্দনিক বোধকে খুঁচিয়ে তোলার মতো যথেষ্ট মুনশিয়ানা থাকলেও বাংলাদেশ এবং পাশ্চাত্য ধারার শিল্পকলার কাছে এই উপস্থাপনা যথেষ্ট ক্লিশে। পরীক্ষা-নিরীক্ষার থেকে প্রথাগত প্রবাণতার দিকে ফিরে যাচ্ছে ছবির প্যালেটগুলো। নতুন অর্থ উত্পাদনের দিকে এক বিন্দুর অগ্রসরমানতার প্রস্তুতির ছাপ নেই। বিমূর্ত অভিব্যাক্তিবাদের জায়গা থেকে সরে এসে তিনি যখন ‘দ্য ফেস -৪’ ছবিটি আঁকেন অথবা মিনিমাল উপস্থাপনায় ‘আনটাইটেলড’ রং ও ফর্মের সরলতায় তুলে আনেন শান্তদৃশ্যভূমি, নিঃসন্দেহে সেখানে শিল্প ও শিল্পীর পক্ষ্যে যুক্ত হয় একাধিক নতুন মাত্রা এবং নতুন নন্দনতাত্ত্বিক প্রণোদনা। ‘দ্য ফেস -৪’ ছবির বিষয়বস্তু কিংবা বিন্যাসের দিক থেকে অভিনবত্ব না দেখালেও টোটাল ছবির দিকে এক সাথে তাকালে নারীর যে রূপ এবং তার পরিবেশ-প্রকৃতি দেখা যায়, সেসব কোনোভাবেই আকষ্মিক নয়। জ্ঞানতাত্ত্বিক অবক্ষয় ও নীতিগত অসহ্যপনার দরুন নির্মিত এই বাস্তবতা নারীর সার্বিক বাস্তবতারই এক করুণ আলেখ্য। বাংলাদেশে দিলারা বেগম জলির কাজে বহু দিন ধরেই তো আমরা এসব দেখছি। আবু জাফর একজন স্থাপনাশিল্পীও বটে। কর্পোরেট ফ্রেম ও প্রাকৃতিক বিষয়াবলির পারস্পরিক মিশ্রণ এবং ফ্রেমের মধ্য দিয়ে প্রকৃতি দর্শনের নাগরিক সীমাবদ্ধতার চিত্র বেশ রূপকায়িত। যে ফ্রেম দিয়ে আমরা প্রকৃতি দেখি, সেই ‘আমি ও ফ্রেম’ যে সর্বক্ষণ ঘিরে রাখে সদয় প্রকৃতি, এতে আর সন্দেহ কী! ‘একুশ বছর শেষে’ শিরোনামে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমীতে ১২ এপ্রিল শুরু হওয়া এই প্রদর্শনী শেষ হয়েছে ২১ এপ্রিল।