বই আলোচনা

সাংবাদিকের চোখে স্বদেশ ও বিদেশ

আপডেট : ২৫ এপ্রিল ২০১৩, ১৮:২০
অতীত, অতীত নয় হাসান শাহরিয়ার প্রচ্ছদ : ধ্রুব এষ উত্স প্রকাশনা, মূল্য:৬৫০ টাকা একজন সাংবাদিক সাদা চোখে যা দেখেন, তা-ই পরিবেশন করেন সংবাদ হিসেবে। পরিবেশনের মুনশিয়ানায় কখনো তিনি সংবাদের পেছনের সংবাদকে টেনে আনেন, আবার কখনো সংবাদের সঙ্গে যুক্ত করেন পর্যালোচনা, বিচার-বিশ্লেষণ ও দিগিনর্দেশনা। সবকিছু মিলে তৈরি হয় এক সংবাদ সাহিত্য, যা আপাতদৃষ্টিতে ক্ষণজীবী হলেও ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে খুবই মূল্যবান। সাংবাদিক হাসান শাহরিয়ার সম্প্রতি তাঁর প্রথম বই ‘অতীত, অতীত নয়’ প্রকাশ করেছেন। এ যেন রবীন্দ্রনাথের সেই অমর পঙক্তি ‘সম্মুখে ঠেলিছে মোরে পশ্চাতের আমি’ স্মরণ করিয়ে দেবার একটি প্রয়াস। নামকরণের যৌক্তিকতা প্রদর্শন করতে গিয়ে তিনি নিজেই লিখেছেন, ‘আজ যা বর্তমান, কাল তা অতীত। আর ভবিষ্যত্? সে তো অতীত আর বর্তমানেরই আরেক রূপ।’ কথাটি যথার্থ। হাসান শাহরিয়ার বইয়ে অন্তর্ভুক্ত লেখাগুলোকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করেছেন। যথা: দেশ, দক্ষিণ এশিয়া, বহির্বিশ্ব, স্মরণ ও অন্যান্য। এর সঙ্গে যুক্ত করেছেন তিনটি ভূমিকা ও একটি পরিশিষ্ট। দেশ পর্যায়ে রয়েছে ১৭টি প্রবন্ধ, দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক ২০টি, বহির্বিশ্ব বিষয়ক ৮টি এবং অন্যান্য ৯টি। লেখাগুলোর চরিত্র বিশ্লেষণে দেখা যায়, কিছু কিছু লেখা সংবাদ বিশ্লেষণ, কিছু কূটনৈতিক সম্পর্কে পর্যালোচনা, কিছু স্মৃতিচারণা এবং কিছু ইতিহাসবিষয়ক। এককথায় বইয়ে অন্তর্ভুক্ত লেখাগুলো পাঁচমিশেলি ধরনের। লেখক নিজেই তা বলেছেন। আমি সাংবাদিকদের লেখা বইপত্র আগ্রহের সঙ্গে পড়ি। এতে সংবাদের পেছনের সংবাদ সম্পর্কে অবহিত হওয়া যায়, যা সাধারণ সংবাদে অনেক সময় পরিবেশিত হয় না। হাসান শাহরিয়ারের ভাষা সাবলীল এবং বিশ্লেষণ পক্ষপাতহীন। তিনি যেমন উপমহাদেশের বিভিন্ন সমস্যার নির্মোহ আলোচনা করেছেন, তেমনি যেখানেই প্রয়োজন, সেখানেই দেশের রাজনৈতিক সংকট ও কূটনৈতিক ব্যর্থতার দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করেছেন। নেহাত রাজনৈতিক কারণে অযোগ্য ব্যক্তিদের কূটনৈতিক দায়িত্বে নিয়োগের কুফল তিনি চোখে আঙুল দিয়ে প্রদর্শন করেছেন। দেশের রাজনীতিতে ব্যবসায়ীদের ক্রমবর্ধমানহারে অংশগ্রহণ দেশের অর্থনীতিতে যে সংকটের জন্ম দিয়েছে, সে বিষয়টিও তাঁর দৃষ্টি এড়িয়ে যায়নি। অন্যদিকে, কূটনীতিতে রাজনীতিকদের পরিবর্তে আমলা-নির্ভরতা যে অনেক ব্যর্থতার জন্য দায়ী, সে কথাও বলতে দ্বিধা করেননি। ভারত বারবার প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করলেও বাংলাদেশ ভারতকে অনেক অযাচিত সুযোগ-সুবিধা প্রদর্শন করছে, যা আমাদের কূটনৈতিক দুর্বলতার পরিচায়ক। অন্যদিকে, বর্তমান সরকারের উপদেষ্টা (তাঁর কথায় সুপার মিনিস্টার)-নির্ভরতাকেও তিনি অনেক ব্যর্থতার জন্য দায়ী করেছেন। সিলেটের লোক বলেই শাহরিয়ার নিজ এলাকার নানা বিষয়ে আলোকপাত করেছেন। একজন ভূমিকা লেখক এ বিষয়ে কটাক্ষ করে লিখেছেন, ‘সিলেটের মানুষের এলাকাপ্রীতির সুনাম রয়েছে।’ অন্য এলাকার লোকেরা কি এ দোষ থেকে একেবারে মুক্ত? হাসান শাহরিয়ার অর্থনৈতিক দিক বিবেচনায় নিয়েই হয়তো ‘সিলেট-শিলচর বাস সার্ভিস প্রসঙ্গ নিয়ে আলোচনা করেছেন। আসলে সিলেট সন্নিহিত ভারতের ‘সেভেন সিস্টার্স’-খ্যাত রাজ্যগুলোর সঙ্গে অতীতে সিলেটের বাণিজ্যিক সম্পৃক্ততা সিলেটের জন্য উপকারী ছিল এবং বর্তমানেও উপকারী বলে বিবেচিত হয়। স্মরণ পর্যায়ে যেসব ব্যক্তি নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে, তাঁরা দৈশিক মাণদণ্ডেও মর্যাদাবান। স্মরণ পর্যায়ের প্রথম লেখাটি আসলে একটি বইয়ের সমালোচনা। সিলেট তথা অবিভক্ত ভারতের প্রথিতযশা রাজনৈতিক ও সাংবাদিক প্রয়াত আব্দুল মতিন চৌধুরী আজকের প্রজন্মের নিকট সম্পূর্ণ অপরিচিত। এই মহান ব্যক্তিকে অবলম্বন করে প্রফেসর আব্দুল হাই শিবলী একটি গ্রন্থ প্রকাশ করেছেন। এর শিরোনাম ‘আব্দুল মতিন চৌধুরী:ট্রাস্টেড লেফটেন্যান্ট অব মোহাম্মদ আলি জিন্নাহ’। বইখানা নিঃসন্দেহে একটি শ্রমসাধ্য কাজ। কিন্তু এর নামকরণের যথার্থতাকে হাসান শাহরিয়ার প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন। কেননা পাকিস্তান সৃষ্টি হওয়ার পর এই ট্রাস্টেড লেফটেন্যান্টকে জিন্নাহ সাহেব যথোপযুক্ত মূল্যায়ন করেননি। কয়েকটি ইতিহাসভিত্তিক লেখা খুবই প্রশংসার যোগ্য। বিশেষ করে, এতদঞ্চলের সাংবাদিকতার ইতিহাস তাঁর লেখায় নতুন মাত্রা লাভ করেছে। লেখাগুলো তথ্যভিত্তিক। কিন্তু সকল ক্ষেত্রে উেসর উপস্থাপন মানসম্মত হয়নি। যেমন বইয়ের ক্ষেত্রে শুধু লেখকের নাম ও পৃষ্ঠা সংখ্যার উল্লেখ তথ্য যাচাইকরণের জন্য যথেষ্ট নয়। তা সত্ত্বেও কিছু কিছু লেখা অনবদ্য। একুশ আমাদের রাজনৈতিক ইতহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। একুশ নিয়ে লেখাটি সংগত কারণেই লেখক সর্ব প্রথমে স্থান দিয়েছেন। এই লেখাটিতে দুটি তথ্য বিভ্রান্তিকর মনে হয়েছে। ১৯৪৮ সালের ভাষা আন্দোলনের একপর্যায়ে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমউদ্দিন যে তারিখে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের প্রতিনিধিদের সঙ্গে একটি চুক্তি করেন, সে তারিখটি ছিল ১৫ মার্চ, ১৫ ফেরুয়ারি নয়। আর প্রতিনিধিদলে আব্দুল মতিন চৌধুরী নামে কেউ ছিলেন বলে কোনো দলিলপত্রে দেখা যায় না। এর পরিবর্তে যে নামটি পাওয়া যায়, তা হচ্ছে আব্দুর রহমান চৌধুরী (দেখুন, বদরুদ্দীন উমর, পূর্ব বাংলার ভাষাআন্দোলন ও তত্কালীন রাজনীতি, ১ম খণ্ড, প্রথম প্রকাশ ১৯৭০, মওলা ব্রাদার্স, পৃ. ৭৯)। তিনি লিখেছেন, ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে মুসলিম লীগের ভরাডুবি হলো এবং যুক্তফ্রন্ট জয়লাভ করল। এরপর ৯ মে গণপরিষদের অধিবেশনে বাংলাকে অন্যতম ‘রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়’ (পৃ. ৩১)। এ প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত তাঁর ‘বাংলাদেশ:জাতি রাষ্ট্রের উদ্ভব’ গ্রন্থের ৯৩ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করেছেন:‘ভাষার জন্য ছাত্রদের রক্তদান এবং পূর্ব বাংলার নির্বাচনী রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রী (পাকিস্তানের) বগুড়ার মোহাম্মদ আলী ১৯৫৪ সালের ৭ মে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দিতে বাধ্য হন।’ বইটিতে সন্নিবেশিত বিভিন্ন তথ্য ইতিহাসের উপকরণ হিসেবে বিবেচ্য। লেখকের রচনাশৈলী সাহিত্যরসাশ্রিত। তবে একই বিষয় সংবলিত কিছু লেখা পরে প্রকাশিত হলেও আগে স্থান পেয়েছে এবং আগের লেখা পরে। ‘অতীত, অতীত নয়’ বইটির অনন্য বৈশিষ্ঠ্য হচ্ছে এর তিনটি ভূমিকা। পরিশিষ্টে যে লেখাটি সন্নিবেশিত হয়েছে, তা-ও অনায়াসে ভূমিকা হিসেবে স্থান লাভ করতে পারত। শেষোক্ত লেখাটি ছাড়া অন্য ভূমিকাগুলো লেখকের সমসাময়িক বা কনিষ্ঠ সাংবাদিকের লেখা। হাসান শাহরিয়ার আমাদের সাংবাদিক-জগতের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। তিনি কমনওয়েলথ জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের আন্তর্জাতিক সভাপতির দায়িত্ব পালনের পর বর্তমানে ইন্টারন্যাশনাল প্রেসিডেন্ট অ্যামেরিটাস পদে অধিষ্ঠিত আছেন। ‘অতীত, অতীত নয়’ গ্রন্থটি প্রকাশ করেছে উত্স প্রকাশনা, প্রচ্ছদ এঁকেছেন ধ্রুব এষ। ৪৪০ পৃষ্ঠার বইটির দাম রাখা হয়েছে ছ-শ পঞ্চাশ টাকা। বইটি পাঠকসমাজে সমাদর লাভ করবে, এ আশা করাই যায়।