ওপারের বোকা বাক্সের ভিতর-বাহির...

আপডেট : ২৫ এপ্রিল ২০১৩, ২০:৫২
মাত্র ক’দিন আগেই দিদি নাম্বার ওয়ানের সেটে আগুন ধরেছে। বেশ কটি চ্যানেলের স্ক্রিনে সেই ভয়াবহতার খবর দেখানো হচ্ছে। সিরিয়ালটি জি বাংলার। অনেক ক্ষয়-ক্ষতি হয়েছে। সেল ফোনে জানালেন স্টার জলসার ফিকশন বিভাগের ইনচার্জ রেশমী রায়। তিনি জানালেন সকলেই সেই পুড়ে যাওয়া সেটেই যাচ্ছেন সহমর্মিতা জানানোর জন্য। ‘দিদি নাম্বার ওয়ান’ এ দেশেও খুব জনপ্রিয়। আমরাও প্রায় সময়ই তর্কযুদ্ধে বলি এ দেশে আমাদের সমস্ত নাটকের দর্শকদের ছিনতাই করে নিচ্ছে স্টার জলসা আর জি বাংলা। কিন্তু সেখানে বাংলাদেশের অডিয়েন্স নিয়ে কৌতূহল জানতে চাইলে স্টার জলসা’র মার্কেটিং ম্যানেজার রুম্পা ব্যানার্জী বললেন, ‘আমরা সেই অর্থে আসলে জানতে পারি না আমাদের বা জি বাংলার সিরিয়ালগুলো বাংলাদেশে কতটা জনপ্রিয়।’ এ ছাড়া কলকাতা বা গোটা ভারতে আমাদের চ্যানেলগুলো দেখা যায় না বা দেখানোর কোনো প্রক্রিয়ার সাথে আপনারা একমত কি না জানতে চাইলে তারা বলেন, ‘আমরাও চাই এ দেশে বাংলাদেশের চ্যানেলগুলো সম্প্রচার হোক। তাহলে আমরা আপনাদের কোন সময়ে কোন প্রোগ্রাম চলে সেই অনুযায়ী আমাদের নাটকগুলো সাজাতে পারতাম। এমনকি বাংলাদেশি চ্যানেলগুলোও লাভবান হতে পারত। কিন্তু এই জটিলতার উত্স আসলে কোথায় তা আমরাও জানি না।’ কলকাতার পূর্বাচলে স্টার জলসার ছোট্ট অফিস। অফিসের এক্সিকিউটিভ জোনেই ক্যারামবোর্ড পেতে খেলছে কর্মীরা। সাদামাটা অফিসে তেমন একটা কর্মচাঞ্চল্য নেই। ছিমছাম গোছের চ্যানেল ফ্লোর। কারণ সারাদিনে কয়েকটা নাটক আর তাদের দিনব্যাপী প্রমো ছাড়া আর অন্য কোনো কিছুই তো নেই। আমাদের দেশের চ্যানেল আই, আরটিভি, চ্যানেল টুয়েন্টিফোর এমনকি সদ্য শুরু হওয়া এসএটিভির স্টুডিওগুলো যত বড় তার ধারে কাছেও নেই তাদের চ্যানেল ফ্লোর। চ্যানেল ফ্লোরে কোনো স্টুডিওই নেই। এদিক দিয়ে সঙ্গীত বাংলা, তারা মিউজিকসহ বেশ ক’টি চ্যানেল আবার অন্য রকম। তবে শুধু নাটকনির্ভর চ্যানেল যেমন বাংলাদেশে কল্পনা করা যায় না, ঠিক তেমনি বাংলাদেশে একটি চ্যানেলে প্রতিদিন প্রায় একশ’র কাছাকাছি ফিকশন আর ননফিকশন প্রচার হয় এটা শুনেও তাদের চোখ ছানাবড়া! এদিকে পহেলা বৈশাখেই কলকাতায় আরও একটি চ্যানেল শুরু হয়েছে। চ্যানেলটির নাম ‘উজান বাংলা’। চ্যানেলটির কর্মকর্তা রাজশ্রী দাস জানালেন, এ চ্যানেলটি দুই বাংলার শিল্পীদের নিয়ে আলাদা আলাদা কার্যালয় করেই চালু করার চিন্তা করেছেন তারা। তবে কলকাতার চ্যানেলওয়ালাদের জন্য সবচেয়ে সুখকর বিষয় হলো, ২০১৩-তেই পুরো পশ্চিমবঙ্গে ডিজিটাল টিআরপি রেটিং ব্যবস্থা প্রণীত হয়েছে। অর্থাত্ তারা অনায়াসেই প্রতি সপ্তাহেই জানতে পারছেন তাদের কোন চ্যানেলের কোন অনুষ্ঠানের জনপ্রিয়তা বাড়ছে বা কমে যাচ্ছে তার নিখুঁত হিসাব। সেদিক দিয়ে বাংলাদেশে এখনও টিআরপি রেটিং অনেক প্রতিষ্ঠানের কাছেই গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ এখনও পুরোপুরি ডিজিটাল করা যায়নি। অল্প কয়েকটি জরিপের মাধ্যমেই গড় হিসেবে নির্ণয় করা হয় চ্যানেল বা অনুষ্ঠানের জনপ্রিয়তা পরিমাপে। এদিকে কলকাতার চ্যানেলগুলোও ক্রিকেটকে বেশ ভীষণ ভয় পায়, যেকোনো বড় টুর্নামেন্ট হলে সেই সময়টাতে কোনো এক্সক্লুসিভ অনুষ্ঠান তারা সম্প্রচার করে না। এমনকি বলিউড বা টালিউড থেকেও কেউই বড় বাজেটের ছবি রিলিজ দেয় না। কিন্তু এবারে ঘটছে উল্টো। এবারের আইপিএল মৌসুমে বেশ কিছু কমবাজেটের ছবি রিলিজ দিয়েও সেগুলো ব্যবসায়িকভাবে অভাবনীয় সফলতা পেয়েছে। অর্থাত্ কলকাতাতে আইপিএল জ্বর বেশ কমছে। এমনকি কলকাতার বেশ কয়েকটি বাংলা পত্রিকা আইপিএলের সমালোচনায় মুখর। নাচানাচি সর্বস্ব এই ক্রিকেটকে তারা ক্রিকেটের মানহানী বলেই উল্লেখ করছেন। শাহরুখের সমালোচনা করেছেন সকলে। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ঈষত্ জনপ্রিয় আমেরিকান গায়ক পিটবুলকে নিয়েও চলছে ঠাট্টা-তামাশা! আর আইপিএল-এর সাথে টেক্কা দিতে তাই একমাত্র ‘মীরাক্কেল’কেই বেছে নিয়েছে জি বাংলা। তবে এবারে কলকাতায় আইপিএলও যেমন জমছে না, তেমনি এবারের টিআরপি যুদ্ধে মীরাক্কেলও যেন অনেকটা পিছিয়ে। বেশ ক’জন নির্মাতা ও কলাকুশলীরাও বললেন, ‘সেট আর অন্যান্য সবকিছুতে বৈচিত্র্য না থাকায় এটা ঘটেছে।’ এ ছাড়া ‘মীরাক্কেল ৬’ ছিল এই সিরিজের অনুষ্ঠানের চূড়ান্ত জনপ্রিয় সিক্যুয়েল। তাই সাফল্যের চূড়ান্ত সীমা ছুঁয়ে যাওয়ার কারণে সেখান থেকে যেন বাধ্য হয়েই নামতে হয়েছে এবার তাদের। মীরাক্কেলের বেশ কয়েকজন পুরোনো প্রতিযোগীই বললেন (নাম প্রকাশে অনিচ্ছা শর্তে), ‘এবারের মীরাক্কেলের প্রতিযোগীরাও খুব একটা জমাতে পারছে না শোটাকে। বারে বারে তাই সিক্সের প্রতিযোগীদের নিয়েই বরং সিরিজটা জমাতে হচ্ছে। কলকাতা শহর থেকে বেশ দূরে দমদমের সিটি সেন্টার পেরিয়ে ডিআরআর স্টুডিওটা একেবারে অজপাঁড়াগা। সেখানে বিশাল মাপের দুটি স্টুডিও মাসের পর মাস দখল করে রেখেছে একটি মীরাক্কেলের জন্য। অন্যটাতে চলছে ‘ড্যান্স বাংলা ড্যান্স’-এর শুটিং। অথচ প্রতিদিনও শুটিং হয় না। এখানে সেট একবার বসে গেলে সেই সিরিজ বন্ধ না হওয়া অবধি আর ভাঙা হয় না। আমাদের দেশে যার একেবারেই প্রচলন নেই। আমাদের এখানে নিয়মিত যেকোনো শোতে শুটিং শেষ হলেই সেই সেটটা ভেঙে ফেলা হয়। এত ব্যয়সাপেক্ষ প্রজেক্ট তৈরির যৌক্তিকতা প্রসঙ্গে জানতে চাওয়া হলে মীরাক্কেলের পরিচালক শুভঙ্কর চট্টোপাধ্যায় বললেন, ‘দেখুন প্রোডাকশনের সকলকেই মাসব্যাপী বুকিং না দিলে তো আপনি একসাথে কাউকে পাবেন না। আর সেটা যদি না করা হয় তাহলে একেক পর্বের মেকআপ আর্টিস্ট থেকে শুরু করে ক্যামেরাম্যান পর্যন্ত একেক পর্বের জন্য টেকনিশিয়ান নিতে হবে একেক জনকে। ফলে আমার অনুষ্ঠানের মানের বারোটা তখনই বেজে যাবে। আর এভাবে কাজ করলে এখানে আমরা প্রথমে পরিবার ভুক্ত হয়ে কাজ করতে পারি।’ জানা গেল এই মাস বা কোন কোন ক্ষেত্রে বছরব্যাপী শুটিংয়ের জন্যই শহর থেকে প্রায় শ’ মাইল দূরে এই ধরনের স্টুডিওর চাহিদা এখানে বেড়েই চলেছে। টিভি সিরিয়ালগুলোও চলছে একইভাবে। অর্থাত্ মাসব্যাপী থাকার জন্যও সকলে বাক্স-পেটরা নিয়ে চলে আসছে সেটে। টেকনিশিয়ান থেকে শুরু করে কলাকুশলীরা সকলে। জি বাংলার ‘দিদি নাম্বার ওয়ান’-এর সেটে আগুন লাগার কারণে তাদের ফিক্সড সেট থেকে সরিয়ে টালিগঞ্জের সেটে ভাড়া করা হয়েছে কয়েকদিনের জন্য। মীরাক্কেলে বাংলাদেশ থেকে আসা এবারের প্রতিযোগী পাবনার জামিল হোসেনকে প্রশ্ন করালম, কেমন লাগছে এবারের প্রতিযোগিতায় এসে? তার সহাস্য জবাব, ‘খুবই ভালো লাগছে। তবে এবারে আমরা দলের দিক দিয়ে ভারী নই। এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে মাত্র দুজনই টিকে আছি। গতবার যেমন অনেকেই ছিলেন। তাই খানিকটা সঙ্গীহীন লাগে মাঝে মাঝে।’ জানা গেল জামিল পাবনায় একটি প্রাইভেট কোম্পানিতে চাকরি করেন। কিন্তু মীরাক্কেলের বদৌলতে বেতনসহ তাকে ছুটি দেওয়া হয়েছে আনলিমিটেড। শহর কলকাতা থেকে সেই দূরদ্বীপের মীরাক্কেল সেটে এসে দেখি এদিনের অতিথি বিচারক থিয়েটারের কিংবদন্তি অভিনেতা মনোজ মিত্র এবং সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। অর্থাত্ প্রতিদিন দুটি পর্বের শুটিং হচ্ছে। এর বেশিও নয়, আবার কমও নয়। এর ঠিক আগের দিন অতিথি হিসেবে এসেছিলেন আমদের রুনা লায়লা। কথা হলো মীরাক্কেল সঞ্চালক মীর আফসার আলীর সাথে। তিনিও বললেন, ‘আমি তো মনে-প্রাণে চাই দুই বাংলার চ্যানেলগুলো দেখানো হোক। এটা সকলের চাওয়া। তবে এই চাওয়াগুলো একদিন অনেকগুলো বারুদ হয়ে ব্লাস্ট হবে। সেদিন আর কেউ আটকাতে পারবে না। আমি ঢাকার এক ঘণ্টার নাটকগুলোর ভীষণ ভক্ত। অনেকগুলো নাটক ডিভিডিতে দেখেছি। কারণ কলকাতায় তো একটা নাটক পুরোটা দেখতে হলে সারা বছর ধরে রিমোট নিয়ে বসে থাকতে হবে। হাহাহা।’ স্বভাবসুলভ হাস্যরসেই সারাক্ষণ সঞ্চালনায় ব্যস্ত থাকেন মীর তার সেটে। তবে প্রতিযোগীরা এমনকি মীর নিজেও একাধিকবার নিজের শটগুলো কেটে কেটে তবেই ওকে করাচ্ছেন। সকাল থেকে বাইরের সারাবেলা তখন সন্ধ্যার আমন্ত্রণে ডুবতে বসেছে। কলকাতায় চ্যানেলগুলোর এই পরিভ্রমণ শেষে তবুও সেই আক্ষেপই যেন বারবার দাগ কেটে যায়। আমাদের চ্যানেলগুলো কবে এপার বাংলায় দেখা যাবে? সেই দীর্ঘদিনের প্রশ্ন যেন রয়েই যায় মনের কোণে।