ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকে গতকাল বৃহস্পতিবার সকালেও অস্পষ্ট কণ্ঠে দুই নারী বাঁচানোর আকুতি জানাচ্ছিলেন। সেই আকুতি আকুল করে তুলেছিল উদ্ধারকারীদের। কিন্তু উপায় ছিল না এত নিচে নেমে তাদের উদ্ধার করার। হয়ত তারা বেঁচে নেই, হয়তবা এখনও বেঁচে আছেন? এভাবেই সময় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ধ্বংসস্তূপের ভেতরে আটকে থাকা মানুষদের বেঁচে থাকার সম্ভাবনাও ক্ষীণ হয়ে পড়ছে। তবে গতকাল মধ্যরাতে ধ্বংসস্তূপের ভেতর বিপুলসংখ্যক জীবিত মানুষের সন্ধান পেয়েছেন উদ্ধারকারীরা। তাদের উদ্ধারের সর্বাত্মক চেষ্টা চলছে। আজ হয়ত কারো আকুতি আর উদ্ধারকারীদের কানে ভেসে আসবে না। তারপরও উদ্ধারকারীরা বলছেন, আজ শুক্রবার সারাদিনই চলবে উদ্ধার অভিযান। কিন্তু ভেতরে কতজন আটকে আছেন, তার কোন ধারণা কারোর কাছেই নেই। ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক আলী আহমেদ খান জানান, গত বুধবার সকালে ‘রানা প্লাজা’ যখন ধসে পড়ে, তখন ভেতরে পাঁচটি পোশাক কারখানায় তিন হাজারের বেশি মানুষ ছিলেন। তবে ভেতরে এখনো কতজন আছে তা তিনি বলতে পারেননি।
ডেকে এনে এত মানুষ হত্যা কোনভাবেই মেনে নিতে পারছেন না সারাদেশের মানুষ। তারা ক্ষোভে শোকে স্তব্ধ। জাতির কাঁধে এখন লাশের বোঝা। জাতি কিভাবে বইবে সে বোঝা? গতকাল বৃহস্পতিবার গভীর রাত পর্যন্ত ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকে ২৬৫টি মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এসব মৃতদেহ নিয়ে রাখা হচ্ছে সাভার অধর চন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে। স্বজনরা আসছেন, মৃতদেহ শনাক্ত করে নিয়ে যাচ্ছেন। পচন ধরার কারণে বুধবার রাতে উদ্ধার করা লাশের মধ্যে ১৮টি লাশ গতকাল দুপুরে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়েছে। এছাড়া ২২৩টি লাশ জেলা প্রশাসন স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করেছে। লাশ হস্তান্তরের দায়িত্বে থাকা সাভার থানার এসআই আলম সরদার জানান, ভোর থেকেই ‘নিখোঁজ’ স্বজনদের খোঁজে ধসে পড়া রানা প্লাজার সামনে ভিড় করেন বহু মানুষ। উদ্ধার অভিযানের নেতৃত্বে থাকা সেনাবাহিনীর নবম পদাতিক ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল চৌধুরী হাসান সোহরাওয়ার্দী বলেন, যারা আটকে পড়েছেন তাদের উদ্ধারে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থাই নেয়া হচ্ছে। সেনাবাহিনীর প্রশিক্ষিত ১১ শ’র বেশি সদস্য এই উদ্ধার অভিযানে অংশ নিচ্ছেন।
বিদ্যালয়ের মাঠে লাশ আর লাশ
ধ্বংসস্তূপ থেকে উদ্ধার করা লাশের পাশাপাশি বিভিন্ন হাসপাতাল থেকে লাশ নেয়া হচ্ছে অধর চন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে। এখানেই তালিকাভূক্ত করে স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হচ্ছে। উদ্ধারকর্মীরা বললেন, অনেক লাশ পচতে শুরু করেছে। বাতাসেও ভেসে আসছে লাশের গন্ধ। আর এতেই স্বজনরা আরও আতঙ্কিত হয়ে পড়ছেন। ধীরে ধীরে তাদের মনে স্বজনদের ফিরে পাওয়ার আশা ক্ষীণ হয়ে আসছে। শোক থেকে চাপা ক্ষোভ তৈরি হচ্ছে। অধর চন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে স্বজনের খোঁজে আসা হাজারো মানুষের বুক ফাঁটা কান্নায় ভারী হয়ে উঠেছে বাতাস।
চাপা পড়া ও নিখোঁজ ব্যক্তিদের ঘরে ঘরে এখন শুধু কান্নার রোল। ভবন ধসের পর দুই দিন পেরিয়ে গেলেও প্রিয়জনদের সন্ধান না পাওয়ায় সাভারের রেডিও কলোনি ভাটপাড়া, মজিদপুর, রাজাসন, সোবহানবাগ, আড়াপাড়া, বক্তারপুর, উত্তর পাড়াসহ বিভিন্ন এলাকার ঘরে ঘরে বিলাপ ও আর্তনাদ। একমাত্র ছেলেকে না পেয়ে বিলাপ করছিলেন মা সোনেকা বেগম। বলছিলেন, যাওয়ার সময় ছেলে আমার বললো, মাসের কয়টা দিন বাকি আছে। না গেলে বেতন দেবে না। মা চিন্তা করো না, সন্ধ্যার আগেই ফিরে আসবো। বুধবার সকালে কথাগুলো বলেই আমার ছেলে নাজমুল (১৭) চলে গেল। আর ফিরল না। ও আমার একমাত্র ছেলে। চাকরি করতো ওই ভবনের ষষ্ঠ তলায়। দুর্ঘটনার দিন সকাল সাড়ে ৭টার দিকে সাভারের রেডিও কলোনি ভাটপাড়ার বাসা থেকে বের হয়েছিল। গতকাল দুপুর পর্যন্ত তার সন্ধান মেলেনি।
বুকে ছবি নিয়ে স্বজনের খোঁজে
মা ছেলের ছবি বুকে চেপে বিভিন্ন হাসপাতাল ও ক্লিনিক ঘুরে ফিরছেন। না পেয়ে ধসে পড়া ধ্বংসস্তূপের চারপাশে পাগলের মতো খুঁজছেন। যাকে সামনে পাচ্ছেন তাকেই তার ছেলের কথা জিজ্ঞেস করছেন। শুধু নাজমুল নয়, ধসে পড়া ভবনের তলায় তলায় এখনও চাপা পড়ে আছেন বহু নারী, পুরুষ, কিশোর-কিশোরী। কান্নাজড়িত কণ্ঠে মোনেকা বেগম বলেন, এই মাসেই তার ছেলে রানা প্লাজার গার্মেন্টেসে চাকরি নিয়েছিল। বেশি বেতনের আশায় সে আগের চাকরি ছেড়ে দিয়েছিল। এখন তার সবই গেল। তার বাড়ি সিরাজগঞ্জ জেলার উল্লাপাড়া এলাকায়। ছবি নিয়ে ভাগ্নেকে খুঁজছেন মামা নূর আলম সিদ্দিকী। তার ভাগ্নের নাম রফিকুল ইসলাম (৩৪)। কোয়ালিটি ম্যানেজার। ভবন ধসের মাত্র দু’দিন আগে ২২ এপ্রিল তিনি ওই ভবনের গার্মেন্টেসে যোগদান করেন।
উদ্ধারকাজে অসন্তোষ
এদিকে উদ্ধার কাজ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন নিখোঁজ ব্যক্তিদের স্বজনরা। উদ্ধার পদ্ধতিতে আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার না করায় মৃত্যু ঝুকি বাড়িয়ে দিয়েছে বলে জানান তারা। ৫ম তলায় আটকে পড়া নাহিদার স্বজনরা জানান, নাহিদা সকাল পর্যন্ত বেঁচে ছিলেন। পরে দুপুরের পর তার মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়। চতুর্থ তলায় চাপা পড়েছেন কোয়ালিটি বিভাগের দীন ইসলাম। দীন ইসলামের ভাই কবীর হোসেন বলেন, তার ভাই এখনও বেঁচে আছেন। পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ হচ্ছে। কিন্তু কেউ তাকে উদ্ধার করতে পারছে না। তার বাড়ি মানিকগঞ্জ জেলার সাটুরিয়া থানার বালিয়া গ্রামে। নিখোঁজ সোহাগের মা জোসনা বেগম বলেন, তার ছেলেকে কেউ উদ্ধার করছে না। সে জীবিত না মৃত কিছুই জানে না। সোহাগ চতুর্থ তলার কোয়ালিটি সেকশনে কাজ করতে গিয়ে চাপা পড়েছেন।
ভবন ধসের ঘটনায় দুই মামলা
ভবন ধসের ঘটনায় বুধবার রাতে সাভার মডেল থানায় দুটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। পুলিশ বাদী হয়ে দায়েরকৃত মামলায় রানা প্লাজার মালিক আব্দুল খালেক ও তার পুত্র সোহেল রানা এবং ৩টি গার্মেন্টস মালিককে আসামি করা হয়েছে। এছাড়া রাজউকের দায়েরকৃত অপর মামলায় ওই ৫ জনকে আসামি করা হয়েছে। তবে তাদেরকে ধরতে আইন প্রয়োগকারী বাহিনীর কোন তত্পরতা নেই বলে জানা গেছে। গতকাল অবশ্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসামিদের গ্রেফতারের নির্দেশ দিয়েছেন।
সাভারের ঘটনা তদন্তে চার কমিটি
সাভারের রানা প্লাজা ধসের ঘটনায় এ পর্যন্ত চারটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে সরকার। কমিটিগুলোকে আগামী সাত ও ১৫ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও ঢাকা জেলা প্রশাসন তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মাইন উদ্দিন খন্দকারকে কমিটির আহ্বায়ক করা হয়েছে। কমিটিকে আগামী সাত দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। গতকাল দুপুরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ড. মহীউদ্দীন খান আলমগীর নিজ দফতরে সাংবাদিকদের এ কথা জানান। এর আগে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ও পাঁচ সদস্যের আরেকটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। কমিটিকে আগামী সাত দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। এ কমিটির প্রধান হয়েছেন শ্রম পরিদর্শক আবু সাইদ খোরশিদুল আলম।
ঢাকার জেলা প্রশাসক শেখ ইউসুফ হারুন জানান, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মনোজ কুমার রায়কে প্রধান করে সাত সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে আগামী ১৫ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। এ কমিটিতে সাভার থানা নির্বাহী কর্মকর্তা কবির হোসেন সরদারকে রাখা হলে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠায় তাকে এ কমিটি থেকে বাদ দেয়া হয়েছে। বাণিজ্য সচিব মাহবুব আহমেদ জানান, রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর মহাপরিচালক-২ কে প্রধান করে চার সদস্যের আরেকটি কমিটি হয়েছে। ভবন ধসের কারণ অনুসন্ধানে এবং এ ধরনের ঘটনা এড়াতে সুপারিশ চাওয়া হয়েছে ওই কমিটির কাছে।
জীবিতদের উদ্ধারে আজ পর্যন্ত অভিযান
রানা প্লাজার ভবনে আজ শুক্রবারও উদ্ধার অভিযান চলবে বলে জানিয়েছেন ৯ম পদাতিক ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল হাসান সোহরাওয়ার্দী। তিনি বলেন, জীবিতদের সন্ধানে আরও একদিন উদ্ধার তত্পরতা চালানো হবে। কারণ ৭২ ঘণ্টা পর্যন্ত এ রকম দুর্ঘটনায় একজন মানুষ বেঁচে থাকতে পারেন।
মানবতার সেবায় সবাই
ধ্বংসস্তূপের সামনে উদ্ধারকর্মীরা পানি, রশি, অক্সিজেন, সিলিন্ডার, এয়ার ফ্রেশনার, হ্যামার, কাটার, প্লাস, হাত পাখা, স্প্রে, মলম চেয়ে প্ল্যাকার্ড ধরে রেখেছেন। রানা প্লাজার বিপরীতে মুনসুর মার্কেটের দোতলায় বসে মাইকে উদ্ধার কাজের দিক নির্দেশনা দেন এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক, জাতীয় সংদের হুইপ মির্জা আজম ও স্থানীয় সংসদ সদস্য মুরাদ জং।
রানা টাওয়ারে ফাটল
সাভার বাজার রোডে বি-৭১ নম্বর হোল্ডিং-এ অবস্থিত ৮ তলা বিশিষ্ট রানা টাওয়ার। গতকাল সকালে ওই ভবনের নিচতলার ডানপাশের একটি পিলারে ফাটলের খবর রটে। এরপরই নিচতলার বাটা শোরুম, দোতলার এক্সিম ব্যাংক বন্ধ ঘোষণা করা হয়। ভবনের অন্য ফ্লোরের লোকজনকে নিচে নামিয়ে এনে মেইন গেট তালা দেয়া হয়। ওই মার্কেটটির পিছনেই ৬ তলা বিশিষ্ট রানাদের বাসা। ওই বাসায় গতকাল একজন গৃহপরিচারিকা ছাড়া কাউকে দেখা যায়নি।
রানার ফাঁসির দাবিতে বিক্ষোভ-মিছিল
এদিকে ভবন মালিক সোহেল রানা ও তার পিতা আবদুল খালেকের ফাঁসির দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল করেছেন স্থানীয় বিভিন্ন গার্মেন্টেসের শ্রমিক ও স্থানীয় বাসিন্দারা।
ধ্বংসস্তূপের ভেতরে আগুন অতঃপর নিয়ন্ত্রণে
সাভারের ধসে পড়া রানা প্লাজা থেকে হতাহত মানুষদের উদ্ধার করতে গিয়ে গতকাল রাত সাড়ে ১০টার দিকে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। পরে ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা চেষ্টা চালিয়ে রাত সাড়ে ১১টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। এ আগুনে কি পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে বা কোন হতাহতের ঘটনা ঘটেছে কিনা এ ব্যাপারে কোন তথ্য জানা যায়নি। ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা জানান, সাভারের ধসে পড়া রানা প্লাজার ৬ষ্ঠ তলায় উদ্ধার অভিযানের সময় রাত ১০টা ৩৫ মিনিটে জেনারেটরে পেট্টোল ভরতে গিয়ে আগুনের সূত্রপাত হয়। দ্রুত ফায়ার সার্ভিসের তিনটি ইউনিট ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে আগুন নেভানোর কাজ শুরু করে। পরে রাত ১১টা ২০ মিনিটে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে।
