সাভারের ছাত্রনেতাদের ক্যাডার হিসেবেই রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রবেশ করেন আলোচিত রানা প্লাজার মালিক সোহেল রানা। যদিও কাগজে কলমে এই ভবন তার পিতা আবদুল খালেকের নামে। তবে সাভারের সবাই জানেন জমি দখল থেকে শুরু করে ভবন নির্মাণ— সবই করেছেন রানা। নেতাদের ক্যাডার থাকার সময় তার পরিচয় ছিল এলাকার ছিচকে সন্ত্রাসী হিসেবে। এখন বেশ কয়েকটি ভবন আর বহু সম্পত্তির মালিক এই সোহেল রানা। তার কারণেই জীবন দিতে হয়েছে শত শত শ্রমিককে।
সোহেল রানার বাবার নাম আবদুল খালেক। তিনি হত-দরিদ্র বাবার সন্তান। দুঃখ-কষ্টে বড় হয়েছেন সাভারের পার্শ্ববর্তী সিঙ্গাইর উপজেলার জয়মন্টপে। এক সময় জীবিকার সন্ধানে পরিবারসহ সাভারে পাড়ি জমান। খালেকের রোষানলে পড়া সাভারের ব্যবসায়ী রবীন্দ্রনাথ সরকারসহ অনেক ব্যবসায়ী জানান, সাভারে আসার পর খালেক কাজ নেন তেলের মিলে। ধীরে ধীরে মিলের মালিকের আস্থাভাজন হয়ে ওঠেন। ওই সময় মিলের মালিক ইয়াসিন ও আহসান হাবিব বিশ্বাস করে তাকে বিভিন্ন কাজ দিতেন। বিশেষ করে তেল, খৈল বিক্রি ও মাপজোখের দায়িত্ব তাকে দেয়া হয়। এ সময় সুযোগ বুঝে মাঝে মধ্যে খৈল নিয়ে বাইরে বিক্রি করত। যে কারণে তার পরিচিতি ছিল কলু খালেক হিসাবে। স্থানীয় প্রবীণরা তাকে এখনো এ নামেই চিনেন। এক সময় কৌশলে হাতিয়ে নেয় বড় অংকের টাকা। আর তাতেই ভাগ্য ফিরে আব্দুল খালেকের। টাকা হাতে পেয়ে খালেক তেল মিলের মালিকের বিশ্বাস ভঙ্গ করে এক পর্যায়ে কেটে পড়ে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ছেলে সোহেল রানার নামে নিজেই গড়ে তোলেন রানা অয়েল মিল নামে একটি তেল তৈরির কারখানা। এ কারখানাই বদলে দেয় খালেক ও তার ছেলের ভাগ্য। পর্যায়ক্রমে ব্যবসা বড় হতে থাকে। ছেলে রানা স্থানীয় ছাত্রলীগের ছত্রছায়ায় সন্ত্রাসী বাহিনী গড়ে তোলে। টাকা ও ক্ষমতার প্রভাবে বাবা ও ছেলে মিলে একের পর এক দখল করে বিভিন্ন এলাকার বিরোধ আছে এমন সব জমি। স্থানীয় সূত্রে আরো জানা যায়, সাভারের বাজার বাসস্ট্যান্ড, বাজার রোডসহ বিভিন্ন স্থানে তাদের রয়েছে মার্কেট, গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি ও বাড়ি। এছাড়া ধামরাই এলাকায় রয়েছে ব্রিক ফিল্ডসহ একাধিক স্থাপনা। সব মিলিয়ে জীবিকার সন্ধানে শূন্য হাতে সাভারে আসা আব্দুল খালেক ও তার ছেলে সোহেল রানা এখন শতশত কোটি টাকার মালিক। তার এ উত্থানকে স্থানীয় অনেকে মনে করেন অলৌকিক ব্যাপার হিসেবে। সাভারের বাজার রোডের বাসিন্দা আব্দুর রহিম ইত্তেফাককে বলেন, মিয়া অয়েল মিলের কর্মচারী আব্দুল খালেক কিভাবে এত টাকার মালিক হলেন তা আমাদের অবাক করে দেয়। কোনভাবেই বিশ্বাস করতে পারি না, এই খালেক কি সেই খালেক?
এলাকার মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সাভার থানা ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও বর্তমানে পৌর যুবলীগের যুগ্ম-আহ্বায়ক সোহেল রানার উত্থান ঘটে এলাকার সন্ত্রাসী হিসেবে। ছোট বেলা থেকেই নেশাগ্রস্ত বেপরোয়া স্বাভাবের রানা নেপথ্যে মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করত। এ সুবাধে শত শত বখে যাওয়া তরুণ তার ভক্ত ও বাহিনীর সদস্য ছিল। এ মাদকাসক্তদের দিয়েই রানা বিভিন্ন মহলে নিজের আধিপত্য ও প্রভাব খাটাত নির্বিঘ্নে। ২০০৮ সালে রানা প্লাজার ভেতরে গুলিতে নিহত হয় রানার প্রতিপক্ষ যুবলীগ নেতা আব্দুল্লাহ। তাকে মদের আসরে দাওয়াত দিয়ে গুলি করে হত্যা করা হয়; কিন্তু এ মামলাটি টাকার জোরে অন্য খাতে প্রবাহিত করা হয়। সাভারের আরেক সন্ত্রাসী ছাত্রদলের নেতা ভিপি হেলালের বডিগার্ড জাকিরকে অপহরণ করে ১৯৯৯ সালে নৃশংসভাবে হত্যা করে তার লাশ ঢাকা-আরিচা মহসড়কে ফেলে রাখা হয়। কথিত রয়েছে, জাকির সোহেল রানার বোনকে প্রেম করে বিয়ে করেছিল। এ বিয়ে রানা ও তার পরিবার কোনভাবে মেনে নিতে পারছিল না। ফলশ্রুতিতে তাকে কৌশলে হত্যা করা হয়। এভাবেই সন্ত্রাসী সোহেল রানা আজকের বড় ব্যবসায়ী আর যুবলীগ নেতা।
