একেকটি মানুষের সঙ্গে একেকটি পরিবারের মৃত্যু

আপডেট : ২৫ এপ্রিল ২০১৩, ২৩:০১
পরিবারের অভাব-অনটন থেকে মুক্তি, সন্তানদের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে মানুষগুলো এসেছিল ঢাকায় কাজের সন্ধানে। চাকরিও হয়। দুঃখ, কষ্ট, বঞ্চনাকে পাত্তা না দিয়ে মানুষগুলো নীরবে কাজ করতো। কারণ মাস শেষে যে বেতন পাওয়া যাবে তার ওপর নির্ভর করছে অনেকগুলো মানুষ। এই খেটে খাওয়া মানুষগুলোর সব সাধ, আকাঙ্ক্ষা, স্বপ্ন মিলিয়ে গেলো মুহূর্তের মধ্যেই। গত বুধবার সাভারে ধসে যাওয়া নয় তলাবিশিষ্ট রানা প্লাজার ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে কেবল একেকজন শ্রমিকেরই মৃত্যু হয়নি, মৃত্যু হয়েছে তার পরিবারটিরও। ধসে পড়ার সময় ওই ভবনের ৫টি গার্মেন্টসে কাজ করছিলো প্রায় তিন হাজার শ্রমিক। নিহত শ্রমিকদের অনেকেরই লাশ পৌঁছেছে গ্রামের বাড়িতে। লাশ পেয়ে স্বজনদের কান্না আর আহাজারিতে সৃষ্টি হয় এক হূদয়বিদারক দৃশ্যের। অনেকের লাশ গ্রামের বাড়িতে পৌঁছার অপেক্ষায়। আর যেসব শ্রমিক এখনো নিখোঁজ রয়েছে তাদের পরিবারের সদস্যরা উদ্বেগ-উত্কণ্ঠার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। তাদের স্বজনরা এখনো জানে না বেঁচে আছে না মরে গেছে তাদের প্রিয় মানুষটি। নিখোঁজ শ্রমিকদের সন্ধানে অনেকেই ছবি নিয়ে এখন ভিড় করছেন ধ্বংসস্তূপের কাছে, হাসপাতালগুলোতে। দিন রাত, ঘণ্টার পর ঘণ্টা খেয়ে না খেয়ে দাঁড়িয়ে থাকা স্বজনদের একটাই চাওয়া জীবিত ফিরে আসুক প্রিয় মানুষটি। রানা প্লাজায় দুর্ঘটনায় নিহত ও নিখোঁজ শ্রমিকদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে খবর পাঠিয়েছে আমাদের অফিস, প্রতিনিধি ও সংবাদদাতারা। গাইবান্ধা:গতকাল পর্যন্ত গাইবান্ধার নিহত ১১ জনের লাশ এসে পৌঁছেছে। আহত অবস্থায় ফিরে এসেছে অর্ধশতাধিক। এখনো জেলার শতাধিক নিখোঁজ রয়েছে। গতকাল বিকাল ৫টায় গাইবান্ধা জেলা প্রশাসক ড. কাজী আনোয়ারুল হক জানান, গাইবান্ধা সদর উপজেলার ৪ জন, সাদুল্লাপুর উপজেলার ৩ জন, সুন্দরগঞ্জের ১ জন ও সাঘাটা উপজেলায় ৩ জনের লাশ স্বজনরা পেয়েছেন। নিহতরা হলেন সাদুল্লাপুরের পূর্ব দামোদরপুর গ্রামের শাহজালাল মিয়ার মেয়ে রেবা খাতুন (১৫), জামুডাঙ্গা গ্রামের হজরত আলীর মেয়ে হাসিনা বেগম (১৮), উত্তর হাটবামুনী গ্রামের আ. কুদ্দুস মণ্ডলের ছেলে জামরুল মণ্ডল (২০), গাইবান্ধা সদরের রামনাথের ভিটা গ্রামের সোনা মিয়ার ছেলে মিন্টু মিয়া (১৯), ধানগড়া এলাকার জনি মিয়ার স্ত্রী সাজেদা বেগম (২৮), শাপলা মিল এলাকার মতিয়ার রহমানের স্ত্রী দুলালী বেগম (৩০), আনালের তাড়ি এলাকার মিলন চন্দ্র রায়ের স্ত্রী বিউটি রাণী (২২), সুন্দরগঞ্জ উপজেলা সদরের মোনতাজের স্ত্রী জুলেখা বেগম (৩৫), সাঘাটার মেছট চরপাড়া গ্রামের মিজারুল মিয়ার স্ত্রী মনি বেগম (২৪), ধনারুহা মুক্তিনগর গ্রামের আ. হালিম মিয়ার মেয়ে সাহেরা খাতুন (১৭) ও বাজিতনগরের হাবিজার মিয়ার ছেলে শিপন রাশেদ (২৫)। গাইবান্ধা জেলার নিখোঁজ এই শতাধিক ব্যক্তির অধিকাংশই নারী। রংপুর:মিঠাপুকুর উপজেলার নিহত আরজিনা বেগমের মা রাহেলা বেগম জানান, গত মঙ্গলবার আরজিনার সঙ্গে সর্বশেষ মোবাইল ফোনে তার কথা হয়। সে সময় আরজিনা তাকে জানিয়েছেন, সন্তানদের জন্য সে অনেক কষ্ট করছে। তাদের লেখাপড়া যেন বন্ধ না হয়। সেদিনই আলপনা ও বৃষ্টি তার মায়ের সাথে শেষ কথা বলেছে। এ সময় তারা তাদের মাকে গ্রামের বাড়ি ফিরে আসার জন্য বলেছিল। সংসারের অভাব দূর করতে এক বছর আগে স্বামী আলাউদ্দিনের সঙ্গে আরজিনা বেগম ঢাকায় যায়। ৬ মাস আগে তিনি সাভারের রানা প্লাজার একটি গার্মেন্টসে শ্রমিকের চাকরি নেয়। আলাউদ্দিন সাভারের একটি দর্জির দোকানে কাজ করতো। গতকাল দুপুরে আরজিনার লাশ দাফন করা হয়। এদিকে নিহত উপজেলার বড় হযরতপুর ইউনিয়নের কামারেরপাড়া গ্রামের মতিয়ারের স্ত্রী দুলালী বেগম (৩২), ময়েনপুর ইউনিয়নের ফুলচৌকি খামারপাড়া গ্রামের সুজন মিয়ার পুত্র বুলু মিয়া (২৮), খোড়াগাছ ইউনিয়নের মণ্ডলপাড়া গ্রামের বাদশা মিয়ার কন্যা লাইজু ওরফে রাবেয়া (২৪), ভাংনী ইউনিয়নের শেরপুর গ্রামের মৃত ইউসুফ আলীর পুত্র নেওয়াজ শরিফের (২৭), মকসিদুল ও শ্যামলী বেগমের লাশ গতকাল আত্মীয়-স্বজনরা নিয়ে দাফন করেছে। রংপুরের পীরগাছা উপজেলায় ১০ জন, মিঠাপুকুরে ৫০ জন, গঙ্গাচড়া উপজেলায় ১০ জন, তারাগঞ্জ উপজেলায় ৫ জন এবং কাউনিয়া উপজেলায় ৫ জনের সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না বলে এলাকার ইউপি চেয়ারম্যান ও পরিবার সূত্রে জানা গেছে। এ ব্যাপারে রংপুরের জেলা প্রশাসক ফরিদ আহাম্মদের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, রংপুরের প্রতিটি উপজেলায় খোঁজ-খবর নেয়া হচ্ছে। নিহতদের প্রতিটি পরিবারকে জেলা প্রশাসকের পক্ষ থেকে নগদ ১০ হাজার টাকা করে আর্থিক সহযোগিতা দেয়া হয়েছে। বড়াইগ্রাম (নাটোর):স্বামীর সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হয়ে যাওয়ার পর দোল নাহার বেগম (৩৮) তার একমাত্র সন্তান নাজমীকে নিয়ে পাড়ি জমান ঢাকায়। বিভিন্ন স্থানে ঘুরে চাকরি মেলে রানা প্লাজার গার্মেন্টসে। সেই দোল নাহার বেগমের এখনো কোন খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। বড়াইগ্রামের বাগডোব গ্রামের জালালউদ্দিনের মেয়ে আল্পনা (১৮) ও পার্শ্ববর্তী খাকসা গ্রামের মতিউর রহমানেরও (২৮) খোঁজ নেই। মতিউরের স্ত্রী জোহরা খাতুন জানান, মতিউর ও তিনি একই গার্মেন্টসে কাজ করতেন। ঘটনার সময় তিনি দৌঁড়ে বেরিয়ে আসতে পারলেও মতিউর বেরুতে পারেননি ভবন থেকে। আল্পনার আয়ে দাদা-দাদী, তিন বোন ও এক ভাইয়ের সংসার চলতো। কালিকাপুর বেড়পাড়ার মৃত শামসুল ইসলামের লাশ গতকাল বুঝে পেয়েছেন স্বজনরা। মির্জাপুর (টাঙ্গাইল):উপজেলার রবটিয়া, ওয়ার্শি, দেউলিপাড়া, মৈজদই, নাগপাড়া, কহেলা ও দেউলিয়া গ্রামের ১৮ জন নারী-পুরুষ এখনো নিখোঁজ রয়েছে। তারা কেমন আছে কোথায় আছে জানতে উদগ্রীব স্বজনরা। বাড়িগুলোতে এখন শুধুই কান্নার রোল। নিখোঁজ ব্যক্তিরা হলেন আবু হানিফ, লিমা, সাথী, নার্গিস, নাসরিন, লায়লা আক্তার, মেরি আক্তার, আকতার ভানু, বারেক মিয়া, লিপি বাদ্যকর, অপু ওরফে সোহেল রানা। এছাড়া মৈজদই, নাগরপাড়া ও কহেলা গ্রামে নিখোঁজ রয়েছে আরো ৬ জন। ওয়ার্শি ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের মেম্বার আতিকুর রহমান আতিক বলেন, রানা প্লাজার বিভিন্ন ইউনিটের গার্মেন্টসেই ৩০/৪০ জন কাজ করতো। এদের মধ্যে ৮/১০ জনকে জীবিত উদ্ধার করে সাভারের এনাম মেডিক্যাল কলেজসহ বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিত্সা দেয়া হচ্ছে। ২০/২৫ জন এখনো নিখোঁজ বলে তিনি জানিয়েছেন। পাংশা (রাজবাড়ী):উপজেলার প্রায় অর্ধশতাধিক মানুষ কাজ করতো রানা প্লাজায়। এদের মধ্যে দুজনের লাশ গতকাল সকালে পৌঁছেছে। বাকি মানুষগুলোর কী অবস্থা এখনো জানে না স্বজনরা। গতকাল উপজেলার কলিমহর ইউপির কলিমহর মণ্ডলপাড়া গ্রামের হারুন অর-রশিদ ও কালিকাপুর ইউপির পাড়াবেলগাছী গ্রামের রোজিনা খাতুনের লাশ বাড়িতে পৌঁছেছে। ভাণ্ডারিয়া (পিরোজপুর) : উপজেলার ১ নম্বর ভিটাবাড়িয়া ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের সুলতান খানকে (৫০) এখনও খুঁজে পাওয়া যায়নি। বাড়িতে তার স্ত্রী রহিমা বেগম (৪০), ছেলে বুলবুল এবং মেয়ে যুথী রয়েছে। দুর্ঘটনার খবর শোনার পর পরিবারের সদস্যরা নির্বাক। সুলতানসহ একই এলাকার ৪ জন কাজ করতো রানা প্লাজায়। এদের মধ্যে তিন জনকে আহত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে। কামাল হোসেনকে হাত-পা ভাঙা অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে। বর্তমানে সে এনাম হাসপাতালে চিকিত্সাধীন। মঞ্জু নামের একজন সামান্য আহত, সে বাসায় এবং পিরোজপুর সদর উপজেলার মো. শাহিন ঘটনার সময় লাফ দিয়ে পড়ে আহত হয়। ‘যদি হায়াত থাকে, ফিরে আসবো’ খুলনা অফিস : ‘আল্লাহ যদি হায়াত রাখে, তাহলে ফিরে আসবো। তুমি আমার কথা চিন্তা করো না, আমার সন্তানদের প্রতি লক্ষ্য রেখো।’ স্বামীর সঙ্গে এই ছিল রেলিমা ওরফে শিউলি বেগমের শেষ কথা। মারা যাওয়ার আধাঘণ্টা আগে স্বামী জাহাঙ্গীর হোসেনকে মোবাইল ফোনে এই কথা বলেন শিউলি বেগম। গতকাল খুলনার হরিণটানার বাড়িতে আনা হয়েছে শিউলির লাশ। এসময় নিহতের স্বামী, সন্তান, বৃদ্ধ পিতা ও স্বজনসহ প্রতিবেশীদের আহাজারিতে এলাকার পরিবেশ ভারি হয়ে ওঠে। শিউলি বটিয়াঘাটা উপজেলার জলমা ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের হরিণটানা এলাকার ইসমাইল শরীফের মেয়ে। সে ৭ ভাই ও ২ বোনের মধ্যে সবার বড়। নিহতের স্বজনরা জানান, শিউলি ‘নিউওয়েভ স্টাইল লিমিটেড’ এর প্রশাসনিক শাখায় চেকার কাম ক্লিনার পদে কর্মরত ছিল। সাড়ে ৬ হাজার টাকা বেতন পেত সে। গত চার বছর ধরে সে ওই প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ছিল। রিয়াজ (১৪) ও জুঁই (৭) নামে দু’টি সন্তান আছে তার। শিউলির লাশ টুটপাড়া কবরস্থানে দাফন করা হয়। জীবননগর : শ্রমিক ইয়াদুল ইসলামের (২৭) লাশ গতকাল উপজেলার কাশিপুর গ্রামে দাফন করা হয়েছে। আব্দুল মজিদের ছেলে ইয়াদুল মাত্র এক মাস আগে চাচাতো ভাইয়ের কথায় রানা প্লাজার তৃতীয় তলায় অবস্থিত গার্মেন্টেসে চাকরি নেয়। ফরিদপুর : নিহত শ্রমিক আনোয়ারার দাফন গতকাল তার নিজ গ্রাম ফরিদপুরের কানাইপুর ইউনিয়নের ছনপচা গ্রামে সম্পন্ন হয়েছে। স্বামী ফরিদ শেখের সঙ্গে আনোয়ারা (২৫) রানা প্লাজায় কাজ করতেন। ভবন ধসে স্ত্রীর মৃত্যুর পর তার স্বামী লাশ নিয়ে গতকাল ভোরে ফরিদপুরে আসেন। আয়নাল শেখের বড় সন্তান ছিলেন আনোয়ারা। তার অপর সন্তান বেলায়েত কয়েক বছর আগেই অসুস্থ হয়ে মারা যায়। তার তিন সন্তানের মধ্যে এক মাত্র এনায়েত (২০) এখন বেঁচে আছে। বাবা মাকে তাদের জীবদ্দশায় চোখের সামনে দুটি সন্তানের অকাল মৃত্যু দেখতে হলো। দরিদ্র এ পরিবারটির সদস্যরা দিনমজুর। আনোয়ারার বাবা আয়নাল ফরিদপুর শহরের রাজবাড়ী রাস্তার মোড়ে কুলির কাজ করেন। তার ছোট ভাই এনায়েত ভ্যানচালক। পরিবারের খরচ চালাতে বড় মেয়ে আনোয়ারা প্রতিমাসেই বাড়িতে টাকা পাঠাতো । বাবা আয়নাল শেখ জানালেন, তিন সন্তানের মধ্যে বড় ছেলে অসুখে আগেই মারা গেছে। এবার মেয়েটিও মারা গেল। গার্মেন্টস ও বিল্ডিং মালিকের শাস্তির দাবি জানান তিনি। যশোর অফিস গার্মেন্টস থেকে ছুটি নেয়ার জন্য বুধবার সাভারের রানা প্লাজার তৃতীয় তলায় গিয়েছিলেন জুয়েল রানা। কিন্তু গার্মেন্টস থেকে ছুটি মেলার আগে পৃথিবী থেকেই ছুটি মিলল তার। সৃষ্টিকর্তাই যেন ছুটি মঞ্জুর করলেন তার! জুয়েল রানার স্ত্রী নাজমীন আক্তার ৪ মাসের অন্ত:সত্ত্বা। যশোর শহরের বেজপাড়া আজিমাবাদ কলোনির শুকুর আলীর ছেলে জুয়েল রানা (২৫)। জুয়েল রানা তার স্ত্রী নাজমীন আক্তারকে নিয়ে থাকতেন সাভারের সি ব্লকের ছায়াবীথি এলাকায় খালার বাসায়। জুয়েল এবং তার স্ত্রী দু’জনই কাজ করতেন সাভারের রানা প্লাজার তৃতীয় তলার একটি গার্মেন্টসে। অসুস্থতার কারণে কয়েকদিন ছুটিতে ছিলেন নাজমীন। দুর্ঘটনার দিন তিনি গার্মেন্টসে না যাওয়ায় প্রাণে বেঁচে গেছেন। ঘটনার দিন সকালে জুয়েল নাজমীনকে বলেছিলেন, অফিসে গিয়ে ছুটি নিয়ে চলে আসবেন। আজ আর কাজ করবেন না। কিন্তু অফিস থেকে জুয়েলের ছুটি না হলেও পৃথিবীর কাছ থেকে চিরতরেই ছুটি মিলেছে তার। লাশ হয়ে ঘরে ফিরেছেন তিনি। গতকাল সকালে যশোরের বাড়িতে নিয়ে আসা হয়েছে জুয়েলের লাশ। বৃহস্পতিবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে যশোর শহরের বেজপাড়ার আজিমাবাদ কলোনিতে জুয়েল রানার বাড়ি গিয়ে দেখা গেছে হূদয়বিদারক দৃশ্য। স্বামীহারা নাজমীন আক্তার কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানান, ‘কেন তিনি স্বামীকে অফিসে যেতে দিলেন’। সাভার ট্র্যাজেডির আরেক শিকার যশোরের শার্শা উপজেলার খলিশাখালি চন্দ্রপুর গ্রামের শিল্পী খাতুনকে জীবিত উদ্ধার করা গেলেও তার বড়বোন ফেরদৌসীকে জীবিত পাওয়া যায়নি। গতকাল উদ্ধার হয়েছে তার নিথর দেহ। এখনও খোঁজ মেলেনি ওই পরিবারের অপর সদস্য মিলনের (৩০)। এখন তাকে জীবিত পাওয়ার জন্যই প্রার্থনা করছেন পরিবারের সদস্যরা। এই গ্রামের আব্দুল খালেকের মেয়ে ফেরদৌসী খাতুন ও শিল্পী খাতুন। বুধবার সাভার ট্র্যাজেডিতে এ তিনজনই নিখোঁজ হওয়ার পর বিকালে শিল্পী খাতুনকে (১৮) গুরুতর অবস্থায় উদ্ধার হয়। বৃহস্পতিবার সকালে পাওয়া গেছে শিল্পীর বড়বোন ফেরদৌসী খাতুনের (২৫) লাশ। এদের চাচতো ভাই মিলন এখনও নিখোঁজ। নিখোঁজ মিলনের পিতা শোকার্ত সাহেব আলী জানান, আমার আর কোনো চাওয়া নেই। এখন শুধু ছেলেটিকে বুকে ফিরে পেতে চাই। কোটালীপাড়া (গোপালগঞ্জ) : এই বৃদ্ধ বয়সে আমি কীভাবে আমার মেয়ের লাশ কাঁধে নিবো। জীবনে আমি অনেক আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশীর লাশ কাঁধে নিয়েছি। কিন্তু আমার মনিরার লাশ আমি কাঁধে নিতে পারবো না। কথাগুলো বলেই জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া উপজেলার উত্তরপাড়া গ্রামের গগন হাওলাদার (৭০)। আট ভাই-বোনের মধ্যে মুনিরা ছিল সবার ছোট। সংসারের অভাবের কারণে গত দুই বছর আগে মুনিরা তার বড় বোন ফিরোজা বেগমের সঙ্গে রানা প্লাজার ৪ তালায় ফ্যানটম এ্যাপারেলস্ লিঃ গার্মেন্টসে চাকরি নেয়। ফিরোজা বেগম বর্তমানে ছুটিতে রয়েছে। মাদারীপুর:নিখোঁজ মাকসুদা বেগম সাভারে তার এক বোনের বাসায় থেকে রানা প্লাজায় অবস্থিত একটি গার্মেন্টে সুপারভাইজার পদে চাকরি করতেন। তার আয়ের টাকা দিয়েই চলে আসছিল সংসার। একমাত্র ছেলে রাসেদ মোল্লা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া করছে। মেয়ে মিম স্থানীয় চরমুগরিয়া বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ৭ম শ্রেণিতে পড়ছে। গতকাল পর্যন্ত তার মৃতদেহ পাওয়া যায়নি। মাকসুদার স্বামী হাবিবুর রহমান সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়ে এখন পঙ্গু। তার শ্বশুড়বাড়ি মাদারীপুর উপজেলার খাগদিতে চলছে শোকের মাতম। গোদাগাড়ী (রাজশাহী): উপজেলার বাসুদেবপুর ইউনিয়নের কবুতরপাড়া গ্রামের দুরুল হোদার ছেলে লিটন আলী (২৩) বুধবার সকালে বড় ভাই সাভার সেনানিবাসে কর্মরত সেনা সদস্য আব্দুল কাদেরকে ফোন করে শুধু বলে ভাই আমি বিপদে পড়ে গেছি। এর পর থেকে লিটনের মোবাইল ফোনটি বন্ধ রয়েছে। গতকাল সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত লিটনের কোন সন্ধান পাওয়া যায়নি বলে তার পিতা দুরুল হোদা জানান। ছেলের সন্ধানে দুরুল হোদা ও তার চাচা মুক্তিযোদ্ধা ফজলুল হক ভাই আব্দুল কাদের সাভারে ঘটনাস্থলে গিয়ে লিটনের খোঁজ করছে। নালিতাবাড়ী:নিহত রাহিমা খাতুনের লাশ গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৬টায় নালিতাবাড়ী পৌরশহরের বাসায় এসে পৌঁছলে সেখানে সৃষ্টি হয় এক হূদয় বিদারক ঘটনার। কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে স্বজনরা। এ পাড়ার আরেক হতভাগ্য ব্যক্তি মুন্না মিয়া (৫০)। তার ছেলে ছালিম রানার (২৫) স্ত্রীর রাহিমা খাতুনের মরদেহ পেলেও এখনো সন্ধান পায়নি ছেলে ছালিম রানা, শাহআলম (২০) ও মেয়ে মনিরা খাতুনসহ ৩ জনের। ছেলের বউ রাহিমার খাতুনের লাশ পাঠিয়ে দিয়ে সে অপেক্ষায় আছে ২ ছেলে ও মেয়ের। তাদের ভাগ্যে কি ঘটেছে তা মুন্না মিয়া জানে না। নালিতাবাড়ী ব্যাপারিপাড়ার ৪০ থেকে ৪৫ জন লোক রানা প্লাজায় কাজ করে। আর নালিতাবাড়ীর শতাধিক লোক আছে ওই এলাকায়। এই এলাকার এখনো বেশির ভাগ লোকের সন্ধ্যান পায়নি স্বজনেরা। পুরো এলাকায় চলছে শোকের মাতম। কাউখালী (পিরোজপুর):চার সদস্যের পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিলেন গার্মেন্টস শ্রমিক নজরুল ইসলাম বাপ্পী (১৮)। অসুস্থ বৃদ্ধ বাবা, মা ও ছোট বোনকে নিয়ে তাদের অভাবের সংসার। বাধ্য হয়ে নজরুলকে গার্মেন্টেসে চাকরি নিতে হয়। বুধবার আকস্মিক ওই ভবনে ধসে নামে শতশত শ্রমিকের সাথে নজরুলও চাপা পড়ে নিহত হয়। গতকাল দুপুর ১২টায় পিরোজপুরের কাউখালীর সয়না রঘুনাথপুর ইউনিয়নের পূর্ব বেতকা গ্রামে তার লাশ পৌঁছলে পরিবারে শুরু হয় শোকের মাতম। উপজেলার ১নং সয়নারঘুনাথপুর ইউনিয়নের জনগণ জানান, এই ইউনিয়নের অনেক নারী-পুরুষ রানা প্লাজায় চাকরি করতেন। ভবন ধসের পর থেকে ১০/১২ জন নিখোঁজ রয়েছে। তাদের মোবাইল ফোন বন্ধ রয়েছে। নিখোঁজের পরিবারগুলো চরম উত্কণ্ঠার মধ্যে সময় পার করছেন।