১৯৭০’র দশকে পৃথিবীর দরিদ্রতম ২০টি দেশের তালিকায় থাকতো মালদ্বীপের নাম। সে জায়গায় তারা উঠে এসেছে নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশগুলোর কাতারে। এই উত্থান নিঃসন্দেহে বিস্ময়কর। তাদের উন্নয়নের গতি দেখে ধারণা করা হচ্ছিলো, খুব শীঘ্রই মধ্যম আয়ের দেশ বনে যাবে তারা। কিন্তু পর্যটকদের উপস্থিতি আশানুরূপ না হওয়ায় মালদ্বীপের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমে গেছে। তীব্রতর হয়েছে বাজেট ও বৈদেশিক বাণিজ্য ঘাটতি। সহসাই পর্যটকদের সংখ্যা খুব বেশি না বাড়ার আশংকা, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কার্যকর আর্থিক পদক্ষেপ বাস্তবায়নে পর্যাপ্ত রাজনৈতিক সমর্থনের অভাব, অর্থনৈতিক বহুমুখীকরণ এবং নতুন চাকরির সুযোগকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট জটিলতা দ্রুত ও ব্যাপক প্রবৃদ্ধির জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। আপাতত মনে হচ্ছে সহসা উত্তরণের কোনো সম্ভাবনাই নেই।
২০১২ সালে মালদ্বীপে মোট দেশজ উত্পাদন প্রবৃদ্ধি কমে দাঁড়ায় ৩ দশমিক ৪ শতাংশ। অথচ আগের বছর তা ছিলো ৭ শতাংশ। পর্যটন ও সংশ্লিষ্ট কর্মকাণ্ড বৃদ্ধির গতি শ্লথ হয়ে যাওয়ায় এক প্রকার হাহাকার চলছে দেশটির অর্থনীতিতে। এর সঙ্গে জড়িত তৃতীয় পর্যায়ভুক্ত অন্যান্য খাত যেমন পাইকারী ব্যবসা, খুচরা বাণিজ্য, পরিবহন ও যোগাযোগেও পড়েছে নেতিবাচক প্রভাব। পর্যটকদের সংখ্যা বৃদ্ধি ২০১১ সালে নেমে এসেছে ২ দশমকি ৯ শতাংশে। আগের বছর এ সংখ্যাটা ছিলো ১৭ দশমিক ৬ শতাংশ। ইউরোপ ও আমেরিকার মহামন্দা এবং বিশ্ব অর্থনীতির ধীরগতির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মালদ্বীপের রাজনৈতিক অস্থিরতা। ফলে যে হারে পর্যটক আশা করা হচ্ছিলো, সে হারে পর্যটক আসছে না মালদ্বীপে। আশার কথা, গত বছর চীন থেকে আসা পর্যটকদের সংখ্যা বৃদ্ধি পায় ১৫ দশমকি ৬ শতাংশ। কিন্তু অন্য এশীয় দেশগুলোর বেলায় তা মাত্র দেড় শতাংশ। আর ইউরোপীয় পর্যটকদের উপস্থিতি কমেছে ৩ দশমিক ৭ শতাংশ। ৫ বছর আগে মালদ্বীপের পর্যটন শিল্পে ইউরোপীয় বাজারের অংশীদারিত্ব ছিলো ৭০ শতাংশ । আর এখন তা নেমে এসেছে ৫৪ শতাংশে। পর্যটকদের খরচের ব্যাপারটিও আগের অবস্থানে নেই। গত বছর খরচ বৃদ্ধি পায় মাত্র শূন্য দশমিক ৩ শতাংশ । এক বছর আগে তা ছিলো ৯ শতাংশ।
প্রাক্কলন অনুসারে চলতি বছরে মালদ্বীপের জিডিপি প্রবৃদ্ধি হবে ৪ দশমিক ৩ শতাংশ। আগামী বছর তা বেড়ে দাঁড়াতে পারে সাড়ে ৫ শতাংশ। ধারণা করা হচ্ছে এর মধ্যে কেটে যাবে বিশ্ব অর্থনীতির কালো মেঘ। পাশাপাশি আসছে আগস্টে অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে অনেক সমস্যা দূর হয়ে যাওয়ার প্রত্যাশা করছে সংশ্লিষ্টরা। সবার বিশ্বাস, নতুন সরকার মধ্যবর্তী ম্যাক্রোইকোনোমিক পলিসি বাস্তবায়নে উদ্যোগী হবে। এর মাধ্যমে পর্যটন খাতে স্থানীয় বিনিয়োগ আরো বাড়বে।
দ্বীপরাষ্ট্র মালদ্বীপের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড স্বাভাবিকভাবেই সমুদ্রনির্ভর। প্রাচীনকাল থেকেই দেশটি মাছের শুঁটকির জন্য বিখ্যাত। এখনো লোকজনের জীবিকা নির্বাহের উল্লেখযোগ্য মাধ্যম হচ্ছে মাছ ধরা। তবে এখন তারচে’ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে পর্যটন। এ খাত থেকে প্রতি বছর গড়ে রাজস্ব আহরিত হয় ৬৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। মালদ্বীপের সমুদ্র সৈকতগুলো জগদ্বিখ্যাত। প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগের জন্য সারা বিশ্বের ভ্রমণ পিপাসুরা এখানে ছুটে আসে। মালদ্বীপের মোট দেশজ উত্পাদনে পর্যটন খাতের অবদান প্রায় ৩০ শতাংশ। সে জায়গায় মাছ, শুঁটকি ও প্রক্রিয়াজাত মাছের অবদান হলো দশ শতাংশ। মালদ্বীপে চাষযোগ্য জমির বড় অভাব। একে তো অধিকাংশ দ্বীপ আকারে খুব ক্ষুদ্র, অধিকন্তু মাটিতে রয়েছে নাইট্রোজেন ও পটাশিয়ামের বড্ড অভাব। যে কারণে মোট প্রয়োজনের মাত্র দশ শতাংশ খাদ্য উত্পাদনে সক্ষম তারা। বিদেশ থেকে তারা আমদানি করে মূলত চাল, গম, ময়দা, চিনি, দুগ্ধজাত সামগ্রী, মাংস ও ডিম।
মালদ্বীপের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত হওয়ার জন্য বিদ্যুতের ঘাটতি ও খনিজ সম্পদের অভাবকেও দায়ী করা হয়। ভারি শিল্প বলতে কিছুই নেই। কয়েকটি গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি টিকে রয়েছে কোনোমতে। তার ওপর ২০০৪ সালের সুনামি তাদের ক্ষতি করেছিলো দারুণভাবে। অন্যান্য দেশের তুলনায় লোক কম মারা গেলেও পর্যটন শিল্পের ক্ষতিটা একেবারে কম ছিলো না। বাজেটের বাধ্য-বাধকতা পূরণ করতে দেশটি বিশ্ব ব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল ও জাতিসংঘের উন্নয়ন কর্মসূচির দ্বারস্থ হয়েছে। আইএমএফ দেশটির জন্য ৭৯.৩ মিলিয়ন ডলার ঋণ বরাদ্দ করেছিলো। কিন্তু ক্রমবর্ধমান বাজেট ঘাটতি দেখে দুই কিস্তির পর বাকি ঋণ দেয়া বন্ধ করে দেয়।
ভর্তুকি, সরকারি কর্মচারীদের বেতন ও সামাজিক চাহিদা মেটাতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে মালদ্বীপ সরকার। রাজস্ব আহরণের পরিমাণ বৃদ্ধি করতে ২০১১ সালের জানুয়ারিতে পর্যটনের ওপর চালু করা নতুন পণ্য ও পরিসেবা কর (জিএসটি)। এখানেই শেষ নয়, নতুন ব্যবসা মুনাফা কর যুক্ত হয় ২০১২ সালে। তাতেও সমস্যা দূর হচ্ছে না। বাজেট ঘাটতি দিনে দিনে বাড়ছেই। ভূমিক্ষয় ও বৈশ্বিক উষ্ণতা নিয়েও তারা খুব চিন্তিত। দেশের ৮০ শতাংশ ভূমিরই সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে গড় উচ্চতা ১ মিটার কিংবা তারও কম।
মালদ্বীপের ১৯০০ দ্বীপের মধ্যে মাত্র ১৯৮টিতে বসতি রয়েছে। এর এক-তৃতীয়াংশেই অধিবাসীর সংখ্যা পাঁচশরও কম। অফিসিয়াল উপাত্ত বলে, মালদ্বীপের দরিদ্র লোকজনের সংখ্যা কমতির দিকে। কিন্তু কার্যত উত্তরাঞ্চলীয় দ্বীপগুলোতে দারিদ্র্য সমস্যা প্রকট। ওইসব অঞ্চলের প্রত্যেক পরিবারের অন্তত একজন সদস্য রাজধানী মালেতে কাজ করে। উন্নয়ন ঘটছে মূলত সেখানেই। এছাড়া অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নারীদের সংখ্যা খুবই সীমিত।
— বিজনেস টাইমস অনুসরণে
