রাজনৈতিক সহিংসতায় জিম্মি হয়ে পড়েছে প্রায় চার কোটি ছাত্রছাত্রীর শিক্ষাজীবন। রাজনৈতিক দল এমনকি সামাজিক ও ধর্মীয় সংগঠনগুলোর সহিংস কর্মসূচির কারণে তাদের পক্ষে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিরাপদে যাওয়াও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ছে। এ বছর এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার সময় হরতাল-হয়রানির শিকার হয়েছে পরীক্ষার্থীরা। হরতালের কারণে বেশ কয়েকটি পরীক্ষা পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে। এমনকি ছুটির দিন শুক্রবারেও পরীক্ষা নেওয়া হয়েছে। পরীক্ষা পিছিয়ে দেওয়ায় পরীক্ষার্থীদের পরীক্ষা প্রস্তুতিতে ব্যাঘাত ঘটেছে। মানসিক চাপের মুখেও পড়েছে তারা। এইচএসসি পরীক্ষার সময়ও হরতাল বিলাসীদের নির্দয় আচরণের শিকার হচ্ছে ১০ লাখ পরীক্ষার্থী। ইতোমধ্যে ইংরেজি দ্বিতীয়পত্র পরীক্ষা পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে। পরীক্ষা চলাকালে হরতাল হওয়ায় উত্কণ্ঠায় ভুগছে শিক্ষার্থীরা। আগামী মাসে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ক্যামব্রিজ ও এডক্সেলের সিলেবাসে পরিচালিত ‘এ’ লেভেল এবং ‘ও’ লেভেল পরীক্ষা। এ পরীক্ষা নিয়েও উত্কণ্ঠায় ভাসছে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা।
২০১৩ শিক্ষাবর্ষের প্রায় চার মাস পার হলেও স্কুলে ক্লাস হয়েছে মাত্র ২৫ থেকে ৩০ দিন। এভাবে হরতাল ও রাজনৈতিক সহিংসতার কবলে পড়ে ভেঙে পড়ছে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম। স্থবির হয়ে পড়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। দেশের সচেতন মানুষ, অভিভাবক, শিক্ষার্থী ও শিক্ষা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা পরীক্ষার সময়ে হরতাল না ডাকতে অনুরোধ জানালেও রাজনৈতিক দলগুলো তা আমলেই নিচ্ছে না। গত কয়েক মাস ধরে প্রায় প্রতি সপ্তাহেই একদিন, দু’দিন কিংবা টানা তিনদিনের হরতালের কবলে পড়ছে দেশ। হরতালের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে অপেক্ষাকৃত সচ্ছল অভিভাবকরা তাঁদের সন্তানদের কোচিং সেন্টার কিংবা প্রাইভেট টিউটরের কাছে পাঠাচ্ছেন। তবে বিপাকে পড়েছেন সাধারণ, নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত অভিভাবকরা। তাঁদের পক্ষে সন্তানদের কোচিং সেন্টার বা প্রাইভেট শিক্ষকদের কাছে পাঠানো দুঃসাধ্য হয়ে পড়ছে। তাঁরা এ থেকে পরিত্রাণের জন্য রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি হরতালের বিকল্প কর্মসূচি দেওয়ার অনুরোধ করেছেন।
ঘন ঘন হরতালের কারণে ক্লাস-পরীক্ষা পিছিয়ে গিয়ে তীব্র সেশনজটের কবলে পড়ছে লাখ লাখ শিক্ষার্থী। অনেক প্রতিষ্ঠান ছুটির দিনে ক্লাস নিয়ে ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় হরতাল অবশ্যই প্রতিবাদের অন্যতম অস্ত্র। হরতালের অধিকার অবশ্যই রাজনৈতিক দলসমূহের আছে। কিন্তু এতে জনগণের সুবিধা-অসুবিধার কথাও ভাবতে হবে। তবে রাজনীতিকদের উচিত দেশ ও জাতির স্বার্থে হরতালের বিকল্প খোঁজা।
রাজনৈতিক সহিংসতা ও সংঘর্ষমুখী কর্মসূচির কারণে চলতি বছর প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষা কার্যক্রম কমবেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সময়মতো সিলেবাস শেষ করা যাবে কিনা সংশয়ে ভুগছেন শিক্ষক এবং অভিভাবকরা। আজকের শিক্ষার্থীরা আগামী দিনের দেশ ও জাতির কর্ণধার। তাদের উপযুক্ত নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা আমাদের সবার কর্তব্য হওয়া উচিত। কিন্তু রাজনীতিকদের একাংশের ভুতুড়ে স্বভাব সবকিছুতে বাদ সাধছে। কল্পকথার ভূতের মতো পেছনে হাঁটা তাদের স্বভাবে পরিণত হয়েছে। দুনিয়ার সব দেশে রাজনৈতিক কর্মসূচি দেওয়া হয় দেশের উন্নতির জন্য। আর এ দেশে রাজনীতির উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখা কিংবা যে কোনো উপায়েই হোক ক্ষমতায় যাওয়া। দেশ ও জাতির কল্যাণের বদলে আত্মকল্যাণ সাম্প্রতিক সময়ের রাজনীতির উপজীব্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশের ভবিষ্যত্ প্রজন্ম তার প্রত্যক্ষ শিকার। মেধাহীন রাজনীতির কুশিলবদের কবল থেকে দেশের শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন রক্ষায় আজ প্রয়োজন গণমানুষের প্রতিরোধ।
ঢাকা
