রাজধানীর বৃত্তাকার নৌপথে এক সময় সারিবদ্ধ পালতোলা নৌকা চলাচল করতো, মাঝিরা মনের সুখে ভাটিয়ালি গান গাইতো। ঢেউয়ের শো শো শব্দ অনেক দূর থেকে শোনা যেতো। চলন্ত পালতোলা নৌকার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ঝাঁকে ঝাঁকে পাখিরা উড়তো আর গান গাইতো। কিন্তু আজ আর সেই মনোরম দৃশ্য দৃষ্টিগোচর হয় না। রাজধানীর চারপাশে অবস্থিত তুরাগ, শীতলক্ষ্যা, বালু ও বুড়িগঙ্গা—এই ৪ নদীকে পরিবেশবিদরা আখ্যায়িত করেছেন নগরীর খোলা জানালা হিসেবে। খোলা জানালা দিয়ে নগরীতে হিমেল ও নির্মল বাতাস প্রবেশ করবে। নগরবাসীকে দীর্ঘদিন সুস্থভাবে বেঁচে থাকার জন্য জরুরি প্রয়োজন নির্মল বাতাস। কিন্তু সেই বাতাসের গতিপথ রোধ করে দাঁড়িয়েছে ভূমিদস্যুরা। ক্রমেই ভূমিদস্যুরা নদী দখল করে নিচ্ছে। তাদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সরকারি প্রতিষ্ঠানও নদী দখল করছে। নদী দখল প্রক্রিয়ায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়,স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়,বিদ্যুত্ মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় ও বিটিসিএল জড়িত রয়েছে। ভূমিদস্যুদের দখল করা জায়গায় সরকার রাস্তাঘাট করে দিচ্ছে। এছাড়া বিদ্যুত্,গ্যাস, টেলিফোন ও স্যুয়ারেজ লাইনের সংযোগ দিচ্ছে। সর্বোপরি দখল করা জায়গায় গড়ে তোলা বাড়িঘরের লোকজনকে সরকার সব ধরনের নাগরিক সুযোগ-সুবিধা দিচ্ছে। ফলে দখল প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে যা কিছুতেই রোধ করা যাচ্ছে না। টঙ্গি থেকে লালবাগের শহিদনগর পর্যন্ত বুড়িগঙ্গার শাখা নদীর পুরোটাই ইতিমধ্যে দখল হয়েছে। এখন শহিদনগর থেকে সোয়ারিঘাট পর্যন্ত নদী দখলের প্রক্রিয়া চলছে। এক শ্রেণির ভূমিদস্যু ২০০০ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদে পাস হওয়া ৩৬ নম্বর জলাধার সংরক্ষণ আইনের ২-এর [চ] ধারা উপেক্ষা করে দখল করে নিচ্ছে। জেলা প্রশাসন ও ভূমি অফিসের এক শ্রেণির দুর্নীতিবাজের সহযোগিতায় নদীর ভূমির মালিক এখন কয়েক শ’ প্রভাবশালী ব্যক্তি— কয়েক যুগ ধরে তারা নদীর জমিতে ঘরবাড়ি তুলে রীতিমতো বসবাস করছে ও জমি কেনাবেচা করে যাচ্ছে ।
নদী রক্ষায় কাগজে-কলমে জোর তত্পরতার কথা শোনা গেলেও বুড়িগঙ্গা নদী রক্ষা এবং নদীর সীমানা নির্ধারণ করে দিতে কার্যত কোনো প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগ নেই। নব্বই দশকে ঢাকা শহর রক্ষা বাঁধ নির্মিত হওয়ার পর বাঁধের ভেতরে অবস্থিত খাসজমি বেদখল হয়ে গেছে। বুড়িগঙ্গার অনেক জমি জলাশয়ে পরিণত হয়েছে। কিন্তু কর্তৃপক্ষের অবহেলার কারণে জেলা প্রশাসন ও ভূমি অফিসের দুর্নীতিবাজদের সহযোগিতায় জাল কাগজপত্র তৈরি করে ভূমিদস্যুরা তা দখল করে নেয়। গত শতকের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত বুড়িগঙ্গা দিয়ে স্বচ্ছ পানি প্রবাহিত হতো। ১৯১২ থেকে ১৯২৮ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের প্রথম ভূমি জরিপে (ক্যাডেস্ট্রল সার্ভে সিএস) এটা প্রবাহমান নদী হিসাবে চিহ্নিত। চল্লিশের দশকে বুড়িগঙ্গা দখল শুরু হয়। স্থানীয় বাসিন্দারা শুষ্ক মৌসুমে নদীগর্ভে ধান চাষ করে তাদের প্রাথমিক দখলদারিত্ব প্রতিষ্ঠা করে। এ সময় সিএস রেকর্ডে পরিবর্তন এনে বিভিন্ন দাগের দখলদার হিসাবে তাদের নাম বসিয়ে দিতে সক্ষম হয়। সিএস রেকর্ডের এ পরিবর্তনকে ভূমি বিভাগ পেটি সিএস বলে থাকে, এ কারণে ১৯৫৪ সালে এসএ (সার্ভে অব আর্টিকেল) রেকর্ড প্রণয়ণকালে সিএস রেকর্ডে অনেক পরিবর্তন ধরা পড়ে। পেটি সিএস-এ নিজেদের অবস্থান দেখিয়ে দখলদাররা সংশ্লিষ্ট দাগের জমি ঢাকা জেলা প্রশাসন থেকে ইজারা নেয় এবং এসএ রেকর্ডে তা লিপিবদ্ধ করে। ১৯৭২ সালের সংশোধিত দখল জরিপের রিভাইসড সার্ভে (আরএস) দখলদাররা নদীর জমি তাদের দখলে দেখায় এবং তাদের মালিকানা পাকাপোক্ত করে ফেলে। এর আগে ওপরে ইজারাপত্র দেখিয়ে অনেকে জমি বিক্রি করে দেয়। আশির দশক থেকে বুড়িগঙ্গা নদীর বুক ভরাট করে ঘরবাড়ি নির্মাণের হিড়িক পড়ে।
১৯৯৭ থেকে ২০০০ সালের মধ্যে মিটফোর্ড হাসপাতালের পেছন (দক্ষিণ) থেকে নবাবগঞ্জ, হাজারিবাগ, গাবতলী, মিরপুর হয়ে টঙ্গী ব্রিজ পর্যন্ত বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ নির্মাণ হয়। বাঁধটির ভেতরে বুড়িগঙ্গার বিশাল এলাকা পড়ে যায়। জালিয়াতরা বাঁধের ভেতরে পড়া নদীর জমি পুরোটাই গ্রাস করে। আশির দশকে তুরাগের ডান তীরে মরা বুড়িগঙ্গার প্রবেশমুখে সিকদার মেডিক্যাল হাসপাতাল নির্মিত হলে বুড়িগঙ্গার এ অংশটির অপমৃত্যু ঘটে। এর দেখাদেখি আশপাশের দখলদাররাও ঘরবাড়ি তুলে ফেলে। বিগত বছরগুলোর মধ্যে বুড়িগঙ্গা দখলের মহোত্সব চলে জোট সরকারের আমলে। এ সময়ে কতিপয় সাংসদসহ প্রভাবশালীরা গায়ের জোরে বুড়িগঙ্গা জবর দখল করে নেয়। বুড়িগঙ্গার কী পরিমাণ জমি বেহাত হয়েছে তার সঠিক হিসাব ঢাকা জেলা প্রশাসন থেকে পাওয়া যায়নি। অথচ নদী তথা সরকারের খাসজমি দেখভাল করার দায়িত্ব জেলা প্রশাসনের। একটি সূত্র আনুমানিক হিসাব দিয়ে বলেছে— লালবাগ, হাজারিবাগ ও কামরাঙ্গীরচর এলাকায় বেহাত হওয়া জমির পরিমাণ প্রায় ৩৫০ একর। এর মধ্যে ২৫০ একর জমি বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের বাইরে এবং ১০০ একর জমি বাঁধের ভেতরে। ঢাকা জেলা প্রশাসনের অধীন ধানমন্ডি সার্কেলের সহকারী ভূমি অফিস সূত্র জানায়, কামরাঙ্গীরচর মৌজার ৭২৯ নম্বর দাগের ২৪ দশমিক ৯৬ একরের মধ্যে ১৬ দশমিক ১৬ একর জমিকে খাসজমি হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। খাসজমি থেকে ৭ একর একটি সরকারি প্রতিষ্ঠান এবং ৫ একর একটি হাপাতালের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। কামরাঙ্গীরচরের লোহার ব্রিজ থেকে সদর ঘাট হয়ে ফতুল্লা পর্যন্ত দেখাশোনা করে বিআইডব্লিউটিএ ।
ঢাকা
