সাভারের রানা প্লাজা ধসে নিহতদের অনেকের লাশ হস্তান্তরের পর স্বজনরা লাশ নিয়ে গেছেন গ্রামের বাড়িতে। শোকবিধূর পরিবেশে জানাজা শেষে তাদের দাফন সম্পন্ন হয়। অনেকের লাশের সন্ধান এখনও মেলেনি। স্বজনরা তাদের খোঁজে পাগলপ্রায়।
বরগুনা (দক্ষিণ) প্রতিনিধি জানান, সাভারের রানা প্লাজা ধসের ঘটনায় বরগুনায় এ পর্যন্ত ৭ পোশাক শ্রমিক নিহতের খবর পাওয়া গেছে। নিহতদের মধ্যে তিনজনের লাশ গ্রামের বাড়িতে দাফন করা হয়েছে। বাকিদের লাশ নিয়ে আসা হচ্ছে বলে স্বজনরা জানিয়েছেন। এসব শ্রমিকের পরিবারে চলছে শোকের মাতম। এদিকে ঘটনার তিনদিন পেরুলেও বরগুনার অনেক শ্রমিকের সন্ধান মেলেনি। এর মধ্যে এগার জনের নাম পরিচয় জানা সম্ভব হয়েছে।
সাভারে ভবন ধসে নিহতরা হলেন- বরগুনা সদর উপজেলার কালিরতবক গ্রামের সিদ্দিকুর রহমান নান্না, পাথরঘাটা উপজেলার আমড়াতলা গ্রামের ইলিয়াছ, তার খালা হাসি আক্তার বিলকিস, নাজমুল ইসলাম, কাঠালতলী ইউনিয়নের নয়ন, বামনা উপজেলার চেচাচং গ্রামের বেলায়েত হোসেন বেল্লাল, একই গ্রামের নাসির ও বেতাগী উপজেলার মোকামিয়া গ্রামের নান্না হাওলাদার। গতকাল তাদের লাশ নিজ নিজ পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে। এখনও নিখোঁজ রয়েছেন বরগুনা সদর উপজেলার ডালভাঙা গ্রামের সিহেনা আক্তার কাজল, বেতাগী উপজেলার আয়লা চান্দখালী গ্রামের আবদুল আজিজ মিয়ার ছেলে সোহাগ, কিসমত ভোলানাথপুর গ্রামের কুটি মোল্লার ছেলে আল-আমিন মোল্লা, পাথরঘাটা উপজেলার সফিলপুর গ্রামের বিউটি বেগম, কালীপুর গ্রামের মোনাব্বার হোসেনের ছেলে আল-আমিনসহ প্রায় এগারো জন।
মানববন্ধন
সাভারে রানা প্লাজা ধসে নিহত ও আহত শ্রমিকদের আর্থিক ক্ষতিপূরণ, ভবন ও গার্মেন্টস মালিকসহ দোষীদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনার দাবিতে বরগুনায় মানববন্ধন করেছে শ্রমিকরা। বেলা ১১টার দিকে বরগুনা প্রেসক্লাবের সামনে মোটর সাইকেল চালক সমবায় সমিতির আয়োজনে এ মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়।
জয়পুরহাট প্রতিনিধি জানান, সাভার ট্রাজেডিতে নিহতদের মধ্যে ৪ জনের বাড়ি জয়পুরহাটে। ইতিমধ্যেই এদের দাফন কাজ সম্পন্ন হয়েছে। তাদের বাড়িতে চলছে এখন শোকের মাতম। সাভারের রানা প্লাজার একটি গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতে কাজ করতেন জয়পুরহাটের আক্কেলপুর পৌর এলাকার পূর্ব রাজকান্দার আজিজুল ইসলামের একমাত্র উপার্জনক্ষম ছেলে আব্দুর রাজ্জাক। গত বুধবার রানা প্লাজা ধসে পড়ে নিহত এই যুবকের লাশ বৃহস্পতিবার তার গ্রামের বাড়িতে আনা হয় এবং স্থানীয় কবরস্থানে দাফন করা হয়।
এছাড়াও জেলার গুলশান মোড়ের ঝরনা আক্তার কাঞ্চন (২৫), পাঁচবিবি উপজেলার বুদইল গ্রামের মুলদা বেগম (৩৪) এবং একই উপজেলার সুলতানপুর গ্রামের আরমান হোসেনের (৩২) লাশ দাফন করা হয়েছে।
মঠবাড়িয়া সংবাদদাতা জানান, সাভার ট্রাজেডির নির্মম শিকার গার্মেন্টস কর্মী নিহত রুমা আক্তারের (১৮) লাশ গত বৃহস্পতিবার বিকালে তার গ্রামের বাড়িতে এসে পৌঁছায়। রাতে জানাজা শেষে উপজেলার খায়েরঘটিচোরা গ্রামে তাকে দাফন করা হয়। এর আগে নিহত রুমার লাশ একনজর দেখার জন্য শত শত গ্রামবাসী সেখানে ভিড় জমায়। এসময় তার স্বজন ও এলাকাবাসীর আহাজারিতে বাতাস ভারি হয়ে ওঠে। নিহত রুমা খায়েরঘটিচোরা গ্রামের কাঠমিস্ত্রি ফারুখ মিয়ার কনিষ্ঠ কন্যা। এছাড়া সাভারে ভবন ধসে নিহত অন্য গার্মেন্টস কর্মী কালমেঘা গ্রামের ফারুক মুসল্লির পুত্র নয়ন মুসল্লির (২৪) লাশ জানাজা শেষে গতকাল শুক্রবার রাতে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়।
গাইবান্ধা প্রতিনিধি জানান, ঢাকার সাভারের বহুতল ভবন ধসের ঘটনায় গতকাল শুক্রবার আরো ২ শ্রমিকের লাশ গাইবান্ধায় এসে পৌঁছেছে। নিহতরা হলেন- সাদুল্লাপুর উপজেলার দামোরপুর ইউনিয়নের জামুডাঙ্গা (মোল্লারপাড়া) গ্রামের আবদুর রশিদের স্ত্রী শেফালি বেগম (৩৩) ও বনগ্রাম ইউনিয়নের বদলাগাড়ী গ্রামের প্রমোদ বর্মণের মেয়ে শান্তনা রাণী বর্মণ (১৮)। গতকাল বিকাল ৫টা পর্যন্ত মোট ১৩ জন শ্রমিক গাইবান্ধায় লাশ হয়ে ফিরে এলো। আহত অবস্থায় এসেছেন অর্ধশতাধিক। এছাড়া এখনও শতাধিক নিখোঁজ রয়েছেন।
সোনাতলা (বগুড়া) সংবাদদাতা জানান, ২৪ এপ্রিল সাভার ট্র্যাজেডিতে নিহত সোনাতলার এক শ্রমিকের লাশ শুক্রবার সকালে তার গ্রামের বাড়িতে এসে পৌঁছেছে। নিহত সম্পা বেগম (১৬) উপজেলার মধুপুর ইউনিয়নের ছাতিয়ানতলা গ্রামের দিনমজুর মো. সাকাওয়াত হোসেনের মেয়ে। শুক্রবার বেলা ১২টায় তার লাশ দাফন করা হয়। সম্পা গত ৫ বছর ধরে রানা প্লাজার গার্মেন্টসে কর্মরত ছিলেন।
সারিয়াকান্দি (বগুড়া ) সংবাদদাতা জানান, সাভারের রানা প্লাজা ধসে বগুড়ার সারিয়াকান্দির ১ জন নিহত ও ৩ জন নিখোঁজ হয়েছে। নিহত মুনজুর বেগমের (২৮) লাশ গত বৃহস্পতিবার রাতে উপজেলার কামালপুর ইউনিয়নের কড়িতলা গ্রামে দাফন করা হয়েছে। তিনি ওই গ্রামের সামছুল হকের স্ত্রী। নিখোঁজ তিনজন হলেন কর্নিবাড়ী ইউনিয়নের তালতলা গ্রামের হাবিবুর রহমানের মেয়ে রুমি আকতার (১৮) , একই ইউনিয়নের নারাপালা গ্রামের পিয়ার মোল্লার পুত্র আতাউর রহমান (২৭), ভেলাবাড়ী ইউনিয়নের বাশহাটা গ্রামের জয়নালের পুত্র মামুনুর রশীদ (২৮) ।
ভাতিজির মৃত্যুর খবর শুনে
হূদরোগে চাচার মৃত্যু
বড়াইগ্রাম (নাটোর) সংবাদদাতা জানান, সাভারের ভবন ধসের ঘটনায় নিহত বড়াইগ্রামের গার্মেন্টস শ্রমিক দোলনাহারের মৃত্যু সংবাদ শুনে হূদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে তার চাচা আব্দুর রহিম (৪৮) মারা গেছেন। গতকাল শুক্রবার দুপুরে এ মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
জানা গেছে, উপজেলার মাঝগাঁওয়ের তয়েজউদ্দিনের মেয়ে দোলনাহার বেগম (৪৫) সাভারের রানা প্লাজার ৪র্থ তলায় গার্মেন্টসে কাজ করতেন। বুধবারের ভবন ধসের পর থেকে তার কোন সংবাদ পাওয়া যাচ্ছিল না। পরদিন তার পিতা ও ভাই তার খোঁজে সাভার যান। বহু খোঁজাখুঁজি করেও তার লাশের সন্ধান পাননি তারা। গতকাল শুক্রবার দুপুরে দোলনাহারের পিতা তার ছোট ভাই আব্দুর রহিমকে (৪৮) মোবাইলে মেয়ের মৃত্যু ও লাশ না পাওয়ার খবর জানান। এ খবর শুনে তিনি হূদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরে তাকে দ্রুত স্থানীয় বনপাড়া পাটোয়ারী জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিত্সক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। এদিকে, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় বড়াইগ্রাম সদর ইউনিয়নের চন্ডিপুরে সাভার ট্রাজেডির আরেক নির্মম শিকার আলেয়া বেগমের (৪৫) লাশ দাফন করা হয়েছে। নিহত আলেয়া চন্ডিপুর গ্রামের মসলেমউদ্দিনের স্ত্রী।
