সাভার রানা প্লাজার ধ্বংসস্তূপের মধ্যে শুধু লাশ আর লাশ। কারো হাত, পা ও কারো মাথা দেখা যাচ্ছে ধ্বংসস্তূপে ঝুলছে। ইত্তেফাকের এ প্রতিনিধি গতকাল শুক্রবার সরেজমিনে রানা প্লাজার ধ্বংসস্তূপে গিয়ে এই মর্মস্পর্শী দৃশ্য দেখতে পান। এর মধ্যে অনেককে হাত ও পা কেটে উদ্ধার করা হয়। সেখান থেকে জীবিত অবস্থার উদ্ধার পাওয়া তিন কর্মী ভবনটি ধসে পড়ার মুহূর্তের ও সঙ্গে থাকা অনেক সহকর্মীর চোখের সামনে মারা যাওয়ার হূদয়বিদারক দৃশ্যের বর্ণনা দেন। এদের মধ্যে দুই পা কেটে গার্মেন্টস কর্মী পাখি (২৫), ডান পা কেটে শাহীনুর (২৪) ও বাম হাত কেটে কলেজ ছাত্রী লাবনীকে (২০) উদ্ধার করা হয়। তারা সাভার এনাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে চিকিত্সাধীন।
লাবনী কান্না বিজড়িত কণ্ঠে এ প্রতিনিধিকে জানান, ‘ভাইরে আমরা তো বেঁচে এসেছি। আমাদের অনেক সহকর্মী চোখের সামনে বিদ্যুত্ চমকানোর মত ধ্বংসস্তূপে পড়ে নিমিষে মারা গেলেন। তাদের স্বজনদের লাশ মিলবে কিনা জানি না। তবে আমাদের সন্তান, স্বামী ও পিতা পঙ্গু অবস্থায়ও আমাদের দেখে সান্তনা পাবেন যে আমরা বেঁচে আছি।’ এ কথা বলেই তিনি মুর্ছা যান।
খুলনার তেরখাদা উপজেলার ভবানীপুরের পাখিকে গত বৃহস্পিতবার অপরাহ্নে ৫ তলা ধ্বংসস্তূপ থেকে দুই পা কেটে উদ্ধার করা হয়। পঙ্গু হাসপাতালের অর্থোপেডিক সার্জন ডা. আব্দুল গনির নেতৃত্বে বিশেষজ্ঞ দলের নির্দেশনা মতে উদ্ধার কর্মীরা পাখিকে উদ্ধার করে এনাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। পাখি ৬ তলার গার্মেন্টসের কর্মী ছিলেন। তার স্বামী জাহাঙ্গীর আইসিউইর গেটের সামনে অসহায় অবস্থা বসে থাকতে দেখা গেল। পাখির দুই শিশু কন্যা ইয়াছমিন (৯) ও আদুরিকে (৬) সেখানে ‘আম্মু আম্মু’ বলে কাঁদছে। সাভার সবুজবাগ এলাকায় স্বামী সন্তান নিয়ে সুখের সংসার ছিল পাখির।
একই সময় ধ্বংসস্তূপ থেকে ডান পা কেটে উদ্ধার করা হয় গার্মেন্টস কর্মী শাহীনুরকে (২৪)। আরেক গার্মেন্টস কর্মী সোনিয়াকে (২০) উদ্ধার করা হয় ডান পা কেটে। তার বাড়ি গাইবান্ধা জেলায়। সাভারে স্বামী মিজানুর রহমানকে নিয়ে তার সংসার। ৫ তলার প্রাথমিক স্বাস্থ্য কেন্দ্রের নার্সিং কর্মী ও কলেজ ছাত্রী লাবনীকে (২৪) বাম হাত কেটে উদ্ধার করা হয় একই দিনে। একটি বেসরকারি নার্সিং প্রতিষ্ঠান থেকে লাবণী প্রশিক্ষন নিয়ে রানা প্লাজার ৫তলায় গার্মেন্টসের প্রাথমিক চিকিত্সা কেন্দ্রে চাকরি নেন, মাত্র ছয় মাস তার চাকরির বয়স। মাসিক বেতন সাড়ে ৮ হাজার টাকা। স্বামী আবু মুসাকে নিয়ে সাভার ব্যাংক কলোনীতে থাকেন। চাকরির পাশাপাশি খুলনার একটি মহিলা কলেজের অনার্স অর্থনীতির তৃতীয় বর্ষের ছাত্রী লাবনী। হাত হারিয়েছে এতে তার কোন দুঃখ নেই। তবে অনেক সহকর্মী তার সামনে লাশ হয়ে গেছে। এ দৃশ্য তাকে যন্ত্রণা দিচ্ছে বলে কাঁদতে কাঁদতে লাবনী জানান।
আরেক গার্মেন্টস কর্মী লাভলীকে (২৫) বাম হাত কেটে গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় উদ্ধার করা হয়। তার স্বামী আনোয়ারুল রিকশা চালক। ১ ছেলে ও ১ মেয়ে নিয়ে তাদের সংসার। সঙ্গে থাকা হারানো সহকর্মীদের স্মৃতি ভুলবো কিভাবে?- এ কথা বলে লাভলী চোখের পানিতে বুক ভাসান। তারা ঘটনার সময় একটি ঝাঁকুনি আর মরমর শব্দ শোনেন। মুহূর্তে চোখের পলকে ভবনটি ধসে পড়ে যায়। কিছু বুঝার আগেই বীম আর ইট-বালুর মধ্যে চাপা পড়ে যায় তারা। এসময় শুধু ‘বাঁচাও বাঁচাও’ বলে আওয়াজ শুনতে পেয়েছে সে। এর পর সব শেষ।
