ঢাকায় প্রায় ৭৮ হাজার ঝুঁকিপূর্ণ ভবন। এর মধ্যে মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়েছে সাড়ে ৬ হাজার ভবন। এই ভবনগুলোর কোনো কোনোটি অতিরিক্ত লোড, ভূমিকম্প কিংবা মাটির দুর্বল বন্ধনের কারণে যেকোন মুহূর্তে ধসে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন ভবন প্রকৌশলীরা। তারা বলছেন দ্রুত এসব ভবনের ব্যাপারে সরকারি কঠোর পদক্ষেপ না নেয়া হলে আমাদের গুনতে হতে পারে আরো মানুষের লাশ। ঢাকা হয়ে উঠতে পারে মৃত্যুর উপত্যকা। অপরদিকে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাভার, আশুলিয়া, গাজীপুর, ঢাকার মিরপুর ও নারায়ণগঞ্জে মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়েছে ২৪৩টি পোশাক কারখানা। যেকোন মুহূর্তে এই কারখানাগুলো ধসে পড়তে পারে।
সম্প্রতি কমপ্রিহেনসিভ ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট প্রোগ্রামের (সিডিএমপি) এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঢাকায় প্রায় ৭৮ হাজার ঝুঁকিপূর্ণ ভবন। এর মধ্যে মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়েছে সাড়ে ৬ হাজার ভবন। এছাড়া পরিত্যক্ত ও নানা ধরনের ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে প্রায় ৫ হাজার সরকারি বাসভবন ও কার্যালয়। তাদের প্রতিবেদন ও তথ্যানুসন্ধানে দেখা গেছে, ঢাকা শহরের মাত্র ৩৫ ভাগ স্থাপনা শক্ত মাটিতে তৈরি। বাকি ৬৫ ভাগ স্থাপনাই বালু দিয়ে বিভিন্ন জলাশয় ভরাট করে নরম মাটিতে তৈরি করা হয়েছে। অধিকাংশ ভবনই বিল্ডিং কোড মেনে তৈরি করা হয়নি। এসব ভবন অতিরিক্ত লোডে ধসে পড়ার আশংকা রয়েছে। যদি ৭ মাত্রায় ভূমিকম্প হয় তাহলে ঢাকার এক তৃতীয়াংশ অথবা প্রায় ৭৮ হাজার ভবন মুহূর্তেই ধসে পড়তে পারে।
অপরদিকে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) দফায় দফায় প্রায় ৯ হাজার অবৈধ ভবনের তালিকা তৈরি করেছে। তালিকাভুক্ত ৯ হাজার ভবনের মধ্যে আবার সাড়ে ৩ হাজার ভবন নির্মাণাধীন। তালিকা প্রসঙ্গে রাজউকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, ২০০৪ সালের বিল্ডিং কোড না মেনে এসব ভবন তৈরি করা হয়েছে। ভবনগুলোতে যেকোন মুহূর্তে দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই অধিদপ্তরের ২০-২৩টি টিম সাভার, আশুলিয়া, গাজীপুর, ঢাকার মিরপুর ও নারায়ণগঞ্জে ৭৯৭টি গার্মেন্টস কারখানা পরিদর্শন করেছে। তাতে ধরা পড়েছে এর মধ্যে ২৪৩টি কারখানাই মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়েছে। এসব কারখানার বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে সরকারকে পরামর্শও দিয়েছে অধিদপ্তর। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের প্রতিবেদনটি সম্প্রতি স্বরাষ্ট্র ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আলী আহাম্মেদ খান স্বাক্ষরিত প্রতিবেদনে ঝুঁকিপূর্ণ ওইসব কারখানার বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়ার পরামর্শ রয়েছে।
এদিকে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অধীন কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন পরিদপ্তরের সমন্বয়ে ২৩টি বিশেষ টিম এ পর্যন্ত ঢাকায় এক হাজার ৮২৫ ও চট্টগ্রামে ১৬৬টি কারখানা পরিদর্শন করেছে। এর মধ্যে মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ ১০৭টি কারখানার বিরুদ্ধে শ্রম আদালতে মামলাও হয়েছে।
গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর মোহাম্মদপুরের সাত মসজিদ রোডে আল্লাহ করিম জামে মসজিদ মার্কেটের ওপরে একটি গার্মেন্টসে ফাটল দেখা দেয়ায় তা বন্ধ ঘোষণা করেছে কর্তৃপক্ষ। বৃহস্পতিবার বেলা ১১টার দিকে গার্মেন্টসটি বন্ধ ঘোষণ?া করা হয়। মোহাম্মদপুর থানার ওসি আজিজুল হক জানান, ভবনে ফাটলের খবর পেয়ে পুলিশের একটি দল গিয়ে ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত হয়ে কারখানাটি বন্ধ করে দেয়।
এদিকে আশুলিয়ার কুমকুমারী এলাকার একটি ছয়তলা ভবনেও ফাটল দেখা দিয়েছে। ওই ভবনে সকালে পোশাককর্মীরা কাজে যোগ দিয়ে ফাটল দেখে কর্তৃপক্ষকে জানালে কারখানাটি বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।
রানার অপর ভবনেও ফাটল
সাভার বাসস্ট্যান্ডে রানা প্লাজা ধসের একদিন না যেতেই একই মালিকের আরেকটি বাণিজ্যিক ও আবাসিক ভবনে ফাটল দেখা দিয়েছে। খবর পেয়ে সাভার থানা পুলিশ সাভার বাজার রোডের ওই টাওয়ারটি পরিদর্শন করেছে। ভবনের পূর্বদিকে নিচতলায় বড় আকারের ফাটল দেখা দিয়েছে। ফাটলের কারণে বেঁকে গেছে তিনতলার জানালার গ্রিল।
জানা গেছে, ৮ তলা ভবনটির নিচতলায় বাটা শো-রুম, দোতলায় এক্সিম ব্যাংক, তিনতলায় ডেল্টা লাইফ ইন্স্যুরেন্স ও উপরে আবাসিক ফ্ল্যাট রয়েছে। তবে আবাসিক ফ্ল্যাটগুলো এখনো ভাড়া হয়নি। এ ভবনের এক দোকানি জানান, সকাল পৌনে ৮টার দিকে তিনি এখানে এসে ফাটল দেখেছেন। নিচতলার সামনের দিকে বাটা শো-রুমের প্রধান পিলারটিতে দেখা গেছে বড় ফাটল। ফাটলের কারণে বাটা শো-রুমটি গত বুধবার থেকেই আতঙ্কে বন্ধ রাখা হয়েছে।
