দীর্ঘদিন ধরে শেয়ারবাজারের চলমান মন্দা পরিস্থিতিতে বর্তমানে বড় চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে লেনদেন ধস। রাজনৈতিক অস্থিরতা ও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থাহীনতার কারণে শেয়ারবাজারের লেনদেনে বড় ধরনের ধস নেমেছে। লেনদেন মাত্রাতিরিক্তভাবে কমে যাওয়ায় একদিকে বিনিয়োগকারীরা আশাহত হচ্ছেন অন্যদিকে শেয়ারবাজার সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো হুমকির মধ্যে পড়ে গেছে। এ অবস্থায় ডিমিউচুয়ালাইজেশন বাস্তবায়ন হলে স্টক এক্সচেঞ্জ বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
স্টক এক্সচেঞ্জের কর্মকর্তারা বলছেন, ডিমিউচুয়ালাইজেশন হলে স্টক এক্সচেঞ্জ হবে একটি কোম্পানি। তখন স্টক এক্সচেঞ্জকেই নিজের খরচ সামলাতে হবে। বর্তমানে স্টক এক্সচেঞ্জের খরচ সামলানোর জন্য দৈনিক অন্তত সাড়ে তিনশ’ কোটি টাকার লেনদেন প্রয়োজন। যা গত কয়েক মাস ধরেই হচ্ছে না। বর্তমানে গড় লেনদেন দুইশ’ কোটি টাকারও নিচে নেমে এসেছে। এ অবস্থায় ডিমিউচুয়ালাইজেশন বাস্তবায়ন হলে স্টক এক্সচেঞ্জকে ক্ষতির মুখে পড়তে হবে। এ প্রসঙ্গে জানতে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) সাবেক চেয়ারম্যান ফারুক আহমেদ সিদ্দিকীর সঙ্গে ফোনে কথা বললে তিনি ইত্তেফাককে বলেন, তারল্য সঙ্কট ও আস্থাহীনতায় অনেকদিন ধরেই শেয়ারবাজারে লেনদেন ব্যাপকভাবে কমে গেছে। নতুন করে যুক্ত হয়েছে রাজনৈতিক অস্থিরতা। এ ধরনের লেনদেন থাকা অবস্থায় ডিমিউচুয়ালাইজেশন বাস্তবায়ন হলে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে। ফারুক আহমেদ সিদ্দিকী আরও বলেন, আইন পাস হলেও ডিমিউচুয়ালাইজেশন বাস্তবায়নে কিছু সময় লাগবে, এই সময়ের মধ্যে স্টক এক্সচেঞ্জকে ব্রেক ইভেন পয়েন্টে আসা দরকার।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গত বছরের ২৩ অক্টোবর থেকে গত ২৩ এপ্রিল পর্যন্ত ছয় মাসে (১২০ কার্যদিবসে) লেনদেন হয়েছে ৩০ হাজার ৩৮৭ কোটি টাকা। অথচ ২০১০-এর নভেম্বর মাসের প্রথম ১২ কার্যদিবসেই লেনদেন হয়েছিল ২৯ হাজার ৩৪০ কোটি টাকা। লেনদেন কমে যাওয়ায় বাজার সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো বেশ চাপের মুখে পড়ে গেছে। লেনদেন কমে যাওয়ার কারণ হিসেবে বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, এমনিতেই বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থার অভাব রয়েছে। তার উপর সামপ্রতিক সময়ে রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে আস্থাহীনতা তীব্র হয়ে উঠেছে। বিনিয়োগকারীরা বাজারে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী হচ্ছেন না। ফলে লেনদেনে ধস নেমে এসেছে। লেনদেন কমে যাওয়ার কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে আইডিএলসি’র প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মনিরুজ্জামান বলেন, বেশিরভাগ বিনিয়োগকারীই লসের (রিয়ালাইজড ও আনরিয়ালাইজড) মধ্যে রয়েছে, ফলে তারা ট্রেডিংয়ে আসতে পারছে না। তাছাড়া মার্জিন লোনের কারণে কিছু কিছু প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীও বিনিয়োগ করতে পারছে না। ফলে বাজারে লেনদেন কম হচ্ছে। তারল্য সঙ্কট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বর্তমানে কলমানি রেট কমই আছে, এতে বুঝা যাচ্ছে তারল্য সঙ্কট খুব বেশি নেই। তবে ব্যাংকগুলো বিনিয়োগের আস্থা পাচ্ছে না। বিধায় তারাও বিনিয়োগে আসছে না।
সূত্র বলছে, দেশের শিল্প প্রতিষ্ঠান ও কোম্পানি লাভজনক না হলে এর প্রভাব পড়ে শেয়ারবাজারে। যেহেতু দীর্ঘদিন ধরে দেশে গ্যাস-বিদ্যুত্সহ অবকাঠামোগত সমস্যা রয়েছে তাই কোম্পানিগুলো ভালো মুনাফা করতে পারছে না। এতে কোম্পানিগুলোর লভ্যাংশের পরিমাণ কমে গেছে। কাঙ্ক্ষিত লভ্যাংশ না আসায়ও অনেক বিনিয়োগকারী শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ থেকে বিরত রয়েছেন। যা বাজারের মোট লেনদেনের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
এদিকে ডিমিউচুয়ালাইজেশনকে অর্থমন্ত্রী শেয়ারবাজারের ওষুধ হিসেবে আখ্যা দিলেও বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাজারের সূচক ওঠানামার সাথে ডিমিউচুয়ালাইজেশনের কোনো সম্পর্ক নেই। এটি স্টক এক্সচেঞ্জের মালিকানার সাথে সম্পর্কিত। এর মাধ্যমে স্টক এক্সচেঞ্জ কোম্পানিতে রূপান্তরিত হবে। ব্রোকারেজ হাউসগুলো চলবে স্টক এক্সচেঞ্জের তত্ত্বাবধানে। স্টক এক্সচেঞ্জ যে মুনাফা বা লস করবে তা স্টক এক্সচেঞ্জগুলোর মধ্যে ভাগ করে দেয়া হবে। এতে শেয়ারবাজারের সূচক বা দরের উপর প্রভাব পড়ার কোনো সুযোগ নেই।
