স্কুল পালানো সেই ছেলেটি

আপডেট : ২৭ এপ্রিল ২০১৩, ২২:১২
ছেলেটা লেখাপড়ায় একেবারেই ভালো না। স্কুল পালিয়ে ক্রিকেট খেলতে খেলতে এসএসসি পরীক্ষাতেও ফেল করে বসল। বাবা ছেলেটার একটু পক্ষে। কিন্তু মা আর সহ্য করলেন না। কড়া আইন করে দিলেন, আজ থেকে ক্রিকেট-ট্রিকেট একেবারে বন্ধ! কিন্তু মায়ের কথা শুনলেও তো চলছে না। খুলনাতে বড় একটা ম্যাচে খেলার জন্য ডাক এসেছে। এবার একটা ঝুঁকি নিয়েই ফেললো। ভোর রাতে বাবার পকেট থেকে ২০০ টাকা চুরি করে ক্রিকেট ব্যাগটা লুকিয়ে ছেলেটা আবার পালালো। সাতক্ষীরা থেকে খুলনা; সারাটা পথ সঙ্গী হয়ে রইল ভয়—বাবা, মা যদি টের পেয়ে যান! ম্যাচ শেষে সেই ভয় যেন ভুলেই গেল ছেলেটি। দল জেতানো বোলিং করে আনন্দে-উচ্ছ্বাসে লাফ দিয়ে যেন আকাশ স্পর্শ করতে চাইল। কাল হারারে স্পোর্টিং ক্লাবে ‘সেই ছেলেটি’ আরেকবার আকাশ স্পর্শ করার জন্য আনন্দে লাফ দিয়ে উঠল। তবে এবার আর তার সঙ্গী ভয় নয়। এবার তার সঙ্গী সারা বাংলাদেশ। এবার তার আনন্দে সেই বাবা-মা এবং পুরো বাংলাদেশও লাফ দিয়ে ওঠে। কারণ তিনি আর সেদিনের সেই স্কুল পালানো ছেলেটি নন; তিনি এখন বাংলাদেশের নতুন তারকা—রবিউল ইসলাম; পেসার শিপলু! বাংলাদেশের ঘরোয়া ক্রিকেটে রবিউল অনেকদিন ধরেই পরিচিত এক নাম। নিয়মিত উইকেট নিতে পারা, পেসার হয়েও অক্লান্ত বল করে যেতে পারার জন্য ঘরোয়া ক্রিকেটে তার দারুণ কদর। কিন্তু সাতক্ষীরার রবিউল জাতীয় দলে নিজেকে মেলে ধরতে পারছিলেন না; সুযোগও পাচ্ছিলেন না। লর্ডসে উইকেটশূন্য অভিষেকের পর তিন বছরে কলম্বো টেস্ট পর্যন্ত ৪ টেস্টে সংগ্রহ ছিল সাকুল্যে ৮ উইকেট। মনে হচ্ছিল, ঘরোয়া ক্রিকেটের সেই পরিশ্রমী-সফল রবিউলকে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে আর পাওয়া যাবে না। কিন্তু রবিউল ফিরে এলেন। প্রথম হারারে টেস্টের প্রথম ইনিংসেই ৩ উইকেট নিয়ে ইঙ্গিত দিলেন ফেরার। এরপর দ্বিতীয় ইনিংসে প্রতিপক্ষের প্রথম ৬টি উইকেটই তুলে নিয়ে জাত চেনালেন। আর গতকাল টানা দ্বিতীয় টেস্ট ইনিংসে নিজের ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় ৫ উইকেট নিয়ে বুঝিয়ে দিলেন, এবার থাকতেই এসেছেন। বুঝিয়ে দিলেন, লর্ডসে সেদিন শূন্য হাতে মাঠ ছেড়ে বেরুনো ছেলেটি বদলে গেছে। রবিউলের এই বদলটা খুব ভালো বুঝতে পারেন তার সাবেক প্রথম শ্রেণীর দলের অধিনায়ক ও বর্তমান জাতীয় দলের নির্বাচক হাবিবুল বাশার। হাবিবুলের অধীনে অনেকদিন ক্রিকেট খেলেছেন রবিউল। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই বলছিলেন, ‘শিপলুকে (রবিউল) আমরা বলতাম, ক্লান্তিহীন বোলার। একজন পেসার যে সারাদিন বল করার জন্য এতো উত্সাহী থাকতে পারে, সেটা না দেখলে বুঝবেন না। অধিনায়ক হিসেবে এরকম একজনকে দলে পাওয়াটা বিরাট ব্যাপার ছিল। ওর সুইংটা শুরু থেকেই ছিল। সমস্যা ছিল রানআপে। রানআপের জন্যই আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে খুব ভালো করতে পারছিল না। রানআপটা বদলানোর সঙ্গে সঙ্গে দেখেন বদলে যাওয়া এক রবিউলকে পাচ্ছি আমরা। তবে একটা কথা বলি, রবিউলের আসল ব্যাপারটা কিন্তু বদলায়নি।’ আসল ব্যাপার? সেটা আবার কী! সদাহাস্যময় হাবিবুল বাশার বললেন, ‘ওর মতো সহজ-সরল ক্রিকেটার হয় না। এই দ্যাখেন, নিজের ছোটবেলার সব কিরকম সবাইকে বলে দিচ্ছে! ওর ভেতর অহংকার বলে কিছু নেই। পরিস্থিতি যেমনই হোক, যতো সাফল্যই পাক—শিশুদের মতো হাসি সবসময় ওর মুখে।’ তাই থাক। শিশুদের মতো হাসি হেসে একদিকে দর্শকদের মন জয় করে নিন। আর বল হাতে এভাবেই ‘শিশু’ বানিয়ে ফেলুন সব প্রতিপক্ষের ব্যাটসম্যানদের। তাহলে অন্তত পেস বোলিং নিয়ে হাহাকার থেকে একটু মুক্তি মেলে বাংলাদেশের।