সোহেল রানাকে নিয়ে অস্বস্তিতে সরকার

আপডেট : ২৭ এপ্রিল ২০১৩, ২২:৪৯
সাভারের রানা প্লাজার মালিক সোহেল রানাকে নিয়ে চরম অস্বস্তিতে পড়েছে সরকার। খোদ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ ঘটনায় অত্যন্ত অসন্তুষ্ট। ভবনটি ধসের পর সংবাদপত্র ও টেলিভিশনে রানাকে নিয়ে নেতিবাচক খবর প্রকাশ হতে থাকে। এসব খবরে রানাকে সাভার পৌর যুবলীগের সিনিয়র যুগ্ম আহবায়ক হিসেবে উল্লেখ করা হয়। এক পর্যায়ে প্রধানমন্ত্রী যুবলীগের কাছে রানার রাজনৈতিক পরিচয় জানতে চান। এরপর যুবলীগের পক্ষ থেকে সভার পৌর যুবলীগের ১০ সদস্যের একটি আহবায়ক কমিটির তালিকা পাঠানো হয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে। ওই তালিকায় রানার নাম না থাকায় তা নিয়ে প্রধানমন্ত্রী জাতীয় সংসদে বিবৃতি দেন। বিবৃতিতে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সোহেল রানা যুবলীগের কেউ নন। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর এই বিবৃতির পরেও রানাকে নিয়ে বিভিন্ন মিডিয়ায় রিপোর্ট প্রকাশিত হয়ে চলেছে। এসব রিপোর্টে স্থানীয় সংসদ সদস্যের সঙ্গে রানার সখ্য ও সাভার পৌর যুবলীগের সিনিয়র যুগ্ম আহবায়ক পরিচয় সম্বলিত বহু সচিত্র পোস্টার ও ব্যানার টাঙ্গানোর বিষয়টি উঠে এসেছে। এ অবস্থায় সরকারের উচ্চ পর্যায়ে চরম অস্বস্তিকর অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। সোহেল রানা দীর্ঘদিন যাবত্ যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে পোস্টার-ব্যানার ছাপানোসহ নানা কার্যক্রমে নিজেকে পৌর যুবলীগের সিনিয়র যুগ্ম আহবায়ক হিসেবে পরিচয় দিয়ে আসছিলেন। অথচ এক বছরেরও বেশি সময় আগে পৌর যুবলীগের যে আহবায়ক কমিটি গঠিত হয় তাতে রানার নাম নেই। সাভারে এই রানার নেতৃত্বেই পরিচালিত হচ্ছিল যুবলীগের আর একটি অননুমোদিত কমিটি। তবে অনুমোদিত আহবায়ক কমিটির নেতৃবৃন্দও রানার বিষয়ে ছিল সম্পূর্ণ নির্বিকার। এদিকে সোহেল রানা এবং সংশ্লিষ্ট গার্মেন্টস মালিকদের অবিলম্বে গ্রেফতার করতে প্রধানমন্ত্রী গত শুক্রবার নির্দেশ দেন। ইতিমধ্যে দুই গার্মেন্টস মালিক পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করেছেন। কিন্তু সোহেল রানাকে এখনো গ্রেফতার করতে পারেনি আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী। কেন্দ্রীয় যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক হারুনুর রশিদ গতকাল ইত্তেফাককে জানান, যুবলীগের সাথে সোহেল রানা কোন সম্পৃক্ততা নেই। এ সংগঠনের তিনি প্রাথমিক কোন সদস্যও নন। তার মত অপরাধীকে যুবলীগ প্রশ্রয় দেবে না। যেহেতু তিনি যুবলীগের কেউ নন- তাই তার বিরুদ্ধে কোন সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণের সুযোগ আমাদের নেই। তবে ধসে পড়া ভবনের মালিক হিসাবে যুবলীগ দেশের প্রচলিত আইনে তার সর্বোচ্চ শাস্তি চায়। যুবলীগের পদ ব্যবহার করে ব্যানার ও পোস্টার টাঙানোর ব্যাপারে হারুনুর রশিদ জানান, বিষয়টি কেউ তাদের নজরে আনেননি। আওয়ামী লীগের এক সিনিয়র নেতা জানিয়েছেন, একজন স্থানীয় নেতা সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রীর খুব বেশি জানা থাকার কথা নয়। তাকে চেনাজানারও বিশেষ কোন সুযোগ নেই। প্রধানমন্ত্রী অবশ্যই এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট এলাকার এমপি এবং দলীয় লোকজনের কাছে জানতে চাইবেন। তিনি সঠিক নিয়মে তাই-ই করেছেন। এদিকে রানা প্লাজার মালিক সোহেল রানা সম্পর্কে চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে আসছে। তিনি এর আগে সাভার পৌর ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক হিসাবে ১৯৯৮ সাল থেকে এক যুগেরও বেশি সময় পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। ২০১২ সালে ওই কমিটি বিলুপ্ত করা হয়। এরপর রানা নিজেকে যুবলীগে ঠাঁই করে নেয়ার জন্যে তত্পর হয়ে ওঠেন। আর এই উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য তিনি স্থানীয় এমপির সঙ্গে সখ্য গড়ে তোলেন। রানা ক্রমান্বয়ে ওই এমপির ‘দক্ষিণহস্ত’ বনে যান। গতকাল শনিবার পৌর যুবলীগের সম্মেলন হওয়ার কথা ছিলো। কিন্তু রানা প্লাজা ধসে ব্যাপক প্রাণহানির ঘটনায় ওই সম্মেলন স্থগিত করা হয়। রানার কোটিপতি হওয়ার পেছনে রয়েছে অপরের জমি দখল, খুন, অস্ত্র ও মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকান্ড। রানা প্লাজা ধসের পর থেকে বেরিয়ে আসতে থাকে তার কোটিপতি হওয়ার চাঞ্চল্যকর সব কাহিনী। সাভারের মুর্তিমান আতঙ্ক এই রানার পেছনে যেমন রাজনৈতিক শক্তি রয়েছে তেমনি রয়েছে প্রশাসনের এক শ্রেণির কর্মকর্তার আশীর্বাদ। এমন কোন অপরাধ নেই- যার সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা নেই। রানা প্লাজার বেসমেন্টে ছিলো তার টর্চারসেল। সেখানে বসেই রানা সাভার-আশুলিয়া এলাকার সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ও মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করতেন। জমি কেনা-বেচার নামে নিরপরাধ লোকদের ধরে এনে জোর করে তাদের কাছ থেকে জমির দলিল নেয়ার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এখানেই ছিলো তার এবং তার বাহিনীর সদস্যদের মনোরঞ্জনের স্থান। নিজের ভগ্নিপতি জাকির এবং রাজিব-সমর বাহিনীর ক্যাডার আব্দুল্ল¬াহকে হত্যাসহ জমি দখল, অস্ত্র, মাদকসহ মোট আটটি মামলার আসামি এই রানা। স্থানীয় সূত্র জানায়, রানা প্লাজার বেসমেন্টে রয়েছে একটি কার পার্কিং। সেখানেই ছিলো রানার টর্চারসেল এবং মনোরঞ্জনের ব্যবস্থা। আন্ডারগ্রাউন্ডে বেশ কিছু কক্ষই তৈরি করা হয়েছিলো এই অনৈতিক কর্মকাণ্ডের জন্য। ওই এলাকার অনেক মেয়েকে ধর্ষণ করা হয় এমন অভিযোগও রয়েছে। তাদের উপর চলতো অকথ্য নির্যাতন। কিন্তু তাদের কান্না কখনো চারদেয়ালের বাইরে যেতো না। স্থানীয় বাসিন্দারা বিষয়টি জেনেও প্রাণ ভয়ে টু-শব্দ করেননি। গার্মেন্টসগুলোর সুন্দরী তরুণীরা ছিলো তার মনোরঞ্জনের টার্গেট। এর প্রতিবাদও কেউ করতে পারতেন না। স্থানীয় আওয়ামী লীগের অনেক নেতাও তার অত্যাচারে অতিষ্ঠ ছিলেন। অবশ্য এখন তাদের কেউ কেউ মুখ খুলছেন। স্থানীয় সূত্র জানায়, ২০০৮ সালে নবাবগঞ্জের আব্দুল্ল¬াহ নামের এক যুবলীগ কর্মী রানা প্লাজার বেজমেন্টে খুন হন। ঘটনাস্থলে রানা নিজেও উপস্থিত ছিলেন। কিন্তু তার বিরুদ্ধে কোন মামলা হয়নি। মামলা হয়েছে তার সাঙ্গপাঙ্গদের বিরুদ্ধে। ওই আব্দুল্লাহ এক সময়ে রাজিব-সমরের ক্যাডার ছিলেন বলে জানা যায়। সোহেল রানা তার আপন বোন সুফিয়ার স্বামীকেও ছাড় দেননি। বোনকে বিয়ে করার অপরাধে ১৯৯৯ সালে জাকির খুন হন। এই খুনের পেছনে রানার হাত ছিলো বলে এলাকাবাসীর অভিযোগ। সোহেল রানার বাবা আবদুল খালেকের বাড়ি মানিকগঞ্জের সিঙ্গাইরের জয়মন্টপ গ্রামে। আশির দশকে খালেক সপরিবারে চলে আসেন সাভারে। কাজ নেন বাজার রোডের বাসিন্দা মো. ইয়াছিনের ঘানি ভাঙানো তেলের কারখানা মিয়া অয়েল মিলে। কারখানার তেল বিক্রি ও মালিক ইয়াছিনের ফুটফরমাশ খাটা শুরু করেন আবদুল খালেক। সেই থেকে তিনি সাভারে ‘কলু খালেক’ হিসেবেই পরিচিত। তার ছেলে সোহেল রানা লেখা-পড়া করতেন স্থানীয় অধর চন্দ্র হাইস্কুলে। সেখানে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করেন রানা। ১৯৯৬ সালের দিকে ছাত্রলীগ নেতা হিসাবে সোহেল রানা ক্ষমতার দাপট থাকায় তার বাবা সাভার বাসস্ট্যান্ড-সংলগ্ন রবীন্দ্রনাথ সরকার ওরফে পাগলার ৫২ শতক জায়গা দখল করে বসিয়ে দেন রানা অয়েল মিল। এনিয়ে রবীন্দ্রনাথ মামলা দায়ের করলেও সেই মামলা বেশিদূর এগোয়নি। রবীন্দ্রনাথ সরকারের ভাতিজা পিন্টু সাংবাদিকদের বলেছেন, তাদের জমিটি সোহেল রানা অস্ত্রের মুখে দখল করে নেন। ‘৯৮ সালে রানা সাভার ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক হন। রাজিব-সমর বাহিনীর অন্যতম ক্যাডার হিসেবে আত্মপ্রকাশ ঘটে তার। ক্ষমতায় পরিবর্তন আসলে সে বিপাকে পড়ে যায়। তখন স্থানীয় এক বিএনপি নেতার মেয়ে মিতুকে বিয়ে করেন সোহেল রানা। দখলী ওই জায়গায়ই সোহেল ২০০৬ সালে গড়ে তোলেন ছয়তলা রানা প্ল¬াজা। সংসদ সদস্য তালুকদার তৌহিদ জং মুরাদ এই ভবনটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন ২০১০ সালে। এভাবে রানা ক্ষমতার দাপটে বিপুল বিত্ত বৈভবের মালিক হন। সাভার বাসস্ট্যান্ডের ৩৩ শতাংশ জমির ওপরে রানা প্ল¬াজা (যেটি ধসে পড়েছে) এবং সাভার বাজারের পাশেই রয়েছে ১৬ কাঠার ওপর ৮ তলা ভবন। এই ভবনটিতেও ইতিমধ্যে ফাটল দেখা দিয়েছে। এর পাশেই রয়েছে ৬ তলা আরেকটি আলিশান ভবন। যার নাম রানা টাওয়ার। যেখানে তিনি তার পরিবার নিয়ে বসবাস করেন। এছাড়াও সাভার বাজারে ২২ শতাংশের ওপরে রয়েছে রানা অয়েল মিল নামের একটি প্রতিষ্ঠান। সাভার আকরাইন, কমলাপুর ও নামাপাড়ায় রয়েছে তার বেশ কয়েকটি হাউজিং প্রজেক্ট। মানিকগঞ্জের ধামরাইয়ে আর.কে ব্রিকস নামের একটি ইট ভাটা আছে তার। এছাড়া বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পরপরই রাতারাতি তিনি কোটি কোটি টাকার মালিক বনে যান। বর্তমানে তিনি কয়েকশ’ কোটি টাকার মালিক বলে স্থানীয় সূত্র জানায়। এর নেপথ্যে রয়েছে সরকারি খাস জমি ইজারার নামে দখল করে জালজালিয়াতির মাধ্যমে বিক্রি করা। এছাড়া সাভার টেম্পো স্ট্যান্ড, বাস স্ট্যান্ড, ট্রাক টার্মিনাল ও কাঁচাবাজারসহ বিভিন্ন স্থানে চাঁদাবাজির মাধ্যমে প্রতিমাসে তার আয় ছিল কমপক্ষে ২০ লাখ টাকা। তার আওতাভুক্ত এলাকাগুলোতে নতুন বাড়ি নির্মাণ করতে গেলেই ৫-১০ লাখ টাকা চাঁদা দিতে হতো। এই চাঁদার ভাগ পুলিশ প্রশাসন থেকে শুরু করে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাও পেয়ে আসছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। আর এ কারণেই স্থানীয় সংসদ সদস্যের খুব কাছের লোক ছিলেন এই রানা। এই সুবাদে চলতো রানার একচ্ছত্র আধিপত্য। অনুসন্ধানে জানা যায়, রানা একাধিক মামলার আসামি হয়েও ধরা-ছোঁয়ার বাইরে রয়ে গেছেন বরাবর। প্রশাসনের কর্তা-ব্যক্তিদের সঙ্গে তার এতো সখ্যের উত্সই হচ্ছে স্থানীয় সংসদ সদস্য। তবে এসব অভিযোগের ব্যাপারে সংসদ সদস্য মুরাদ জংয়ের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি।