প্রাণোচ্ছল অধরচন্দ্র স্কুল প্রাণহীনের প্রতীক এখন!

আপডেট : ২৭ এপ্রিল ২০১৩, ২২:৫২
এতোদিন সাভারের অধরচন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয় শিক্ষাকেন্দ্রই ছিলো। ভবনের দেয়ালে কান পাতলে কিশোর-কিশোরীর কোলাহল শোনা যেত। কয়েকদিন আগের সেই প্রাণোচ্ছল ভবন, সেই কোলাহলপূর্ণ মাঠ আছে। কিন্তু ভবনের বারান্দায় লেগে আছে শত শত প্রাণহীন মানুষের রক্ত। আর কান পাতলে শোনা যাচ্ছে স্বজনহারাদের বুকফাটা কান্না। রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির লাশ খোঁজার স্থান এখন অধরচন্দ্র বিদ্যালয়। লাশ আসছে, লাশ যাচ্ছে, কিন্তু কমছে না আশায় বুক বাধা মানুষগুলোর সংখ্যা। এখনো স্বজনকে ফিরে পাওয়ার অপেক্ষায় হাজারো মানুষ। তাদের কষ্টকর অপেক্ষার সাক্ষী এখন অধরচন্দ্র বিদ্যালয়। স্কুলের দেয়াল ঘেঁষে গেট দিয়ে ঢুকতে গেলে চোখে পড়বে শত শত মানুষের ছবি। অচেনা, অজানা সব মানুষের মুখ। শুধু স্কুলের দেয়ালে বা গেটে নয়, এখানে ভিড় করা বেশিরভাগ মানুষের হাতে, পকেটেও ছবি। দেখা যায় এক যুবক ছবি হাতে ঘুরছে। জিজ্ঞাসা করতেই বলল -‘এটা আমার বোনের ছবি। নাম সীমা। পাঁচ মাস আগে বিয়ে হইছে। রানা প্লাজার ছয় তলায় গার্মেন্টসে কাজ করতো সে। চারদিন ধরে খুঁজেছি। ভবনের সামনে, হাসপাতালে, সবখানে খুেঁজছি। কিন্তু লাভ হয়নি।’ গত বুধবার ভবনটি ধসে পড়ার পর প্রায় সাড়ে তিনশ’ কর্মীর লাশ এ স্কুলে আনার পর স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। ভবনের সামনে বসে থেকে, হাসপাতালে ঘুরে শেষে স্বজনরা আসছে অধরচন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে। হাজারে হাজারে আসা পরিশ্রান্ত, চিন্তিত আর শোকে মুহ্যমান মানুষের আশ্রয়স্থলও এখন অধরচন্দ্র স্কুল। গতকাল সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত ১৬টি লাশ আসে এই স্কুলে। লাইনে দাঁড়িয়ে হারানো স্বজনকে খুঁজে বের করার প্রাণান্ত চেষ্টা করছেন স্বজনরা। কেউ পাচ্ছেন আবার কেউ পাচ্ছেন না। তারপরও তাদের অপেক্ষা। নাটোর থেকে আসা মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘পাঁচ মাস আগে সীমার বিয়ে হয়। ওর স্বামী অন্য গার্মেন্টসে কাজ করে। রানা প্লাজায় গার্মেন্টসে সীমার সাথে তার ফুফুশাশুড়ী সুর্যু বেগমও কাজ করতেন। ঘটনার দিন সুর্যু বেগমের ঠিক দুই জনের পেছনে দাঁড়িয়ে কাজ করছিলেন সীমা। ধ্বংস স্তূপের ভেতর থেকে সুর্যু বেগমকে উদ্ধার করা হয়েছে। তার আঘাত ততটা গুরুতর না। কিন্তু সীমাকে উদ্ধার করা যায়নি। ভবন ভেঙ্গে যাওয়ার পর সুর্যু বেগম তাকে দেখেননি। বোন রেবেকা আক্তারকে খুঁজতে ফরিদপুর থেকে এসেছেন ভাই নজরুল ইসলাম। তিনি বলেন, বোনকে জীবিত ফেরত পাবো এমন আশা ছেড়ে দিয়েছি। কিন্তু লাশ পাওয়া গেলে দৌড়ে দেখতে যাই। না মিললে একটু স্বস্তি লাগে। তিনি বলেন, বোনকে জীবিত না পেলেও লাশটা অন্তত চাই। ওর দাফন করতে পারাটাও হবে বড় পাওয়া। রানা প্লাজার চতুর্থ তলায় সুপারভাইজার হিসেবে কাজ করছিলেন আলী আকবর। আট জনের সংসারে তিনি একমাত্র উপার্জনকারী। কোনো সন্ধান না পাওয়ায় অধরচন্দ্রের মাঠে এসে দাঁড়িয়ে আছেন তার ভাই মিরাজ। তিনি জানান, দুর্ঘটনার পর আকবরের মোবাইল ফোনে কল করা হয়। একবার ফোন বেজেছিলো। তারপর আর বাজেনি। পারভিন আক্তার নামে একজন কাজ করতেন তিন তলায়। ঘটনার পর তার সাথে কাজ করা আরেকজনের সন্ধান মিললেও তাকে পাওয়া যায়নি। তাকে খুঁজতে বোন পারুল ঘুরছেন স্কুল মাঠে। বোনকে জীবিত না পেলেও যেন লাশটা পাওয়া যায়। অধরচন্দ্র মাঠে স্বজনের খোঁজে আসা মানুষের ভিড় বাড়ছে। বাড়ছে কফিনের সংখ্যাও। চারদিন পর অনেক লাশে পচন ধরেছে। স্বজনকে এ অবস্থায় চেনা সেটাও বড় কষ্টের। উত্কট গন্ধে কাছে যাওয়া কঠিন। কিন্তু কোনো কিছুই যেন বাধা নয় এসব মানুষের জন্য।