চট্টগ্রামে হেফাজতে ইসলাম ও আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা’আত মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড়িয়েছে। শুক্রবার আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা’আত এর অন্যতম নেতা ও জমিয়তুল ফালাহ জাতীয় মসজিদের খতিব মাওলানা জালাল উদ্দিন আলকাদেরী হেফাজত সমর্থকদের দ্বারা লাঞ্ছিত হন। এ ঘটনার পর চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় শুক্রবার বিকালে উভয় সংগঠনের সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ ঘটে। নেতার লাঞ্ছনার প্রতিবাদে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা’আত নগরী ও জেলার বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভ প্রদর্শন ও এর তীব্র নিন্দা জানান। তাদের পক্ষ থেকে সপ্তাহব্যাপী প্রতিবাদ ও লালদিঘী ময়দানে সমাবেশ কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে। কর্মসূচির প্রধান দাবি হচ্ছে- যেখানে হেফাজত সেখানেই প্রতিরোধ।
হেফাজতে ইসলাম ও আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা’আত এর মূল সাংগঠনিক ভিত্তি চট্টগ্রামে হওয়ায় উভয় সংগঠনের দ্বন্দ্ব চট্টগ্রামেই বেশি। হেফাজতে ইসলাম ২০১০ সালে কওমী মাদ্রাসার ওলামা মাশায়েখদের নিয়ে হাটহাজারী দারুল উলুম মাদ্রাসার মহাপরিচালক আল্লামা শাহ আহমদ শফি প্রতিষ্ঠা করেন। মূলত আল্লাহ-রসুল এবং ইসলামের প্রচারণার জন্য হেফাজতে ইসলাম প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে বলে উদ্যোক্তাদের পক্ষ থেকে জানানো হয়। হেফাজতে ইসলাম থেকে বলা হচ্ছে, তাদের সমর্থনে বিভিন্ন ইসলামী রাজনৈতিক সংগঠন থাকলেও হেফাজতে ইসলাম কোন রাজনৈতিক সংগঠন নয়। অপরদিকে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা’আত দীর্ঘ দিনের একটি পুরনো সংগঠন। এ সংগঠনটি সুন্নী মতাদর্শকে ভিত্তি করেই মূলত সৃষ্টি। সমসাময়িক রাজনীতির ব্যাপারে তাদের নিজস্ব রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে। তবে হেফাজতে ইসলাম এবং আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা’আত- উভয় সংগঠনের ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গির অনেকগুলোর মধ্যেই মিল রয়েছে।
গত ৫ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় শাহবাগ চত্বরে গণজাগরণ মঞ্চ গঠনের পর কিছু ব্লগারের ব্লগে আল্লাহ রসুল সম্পর্কে অবমাননাকর বক্তব্য প্রকাশের অভিযোগে হেফাজতে ইসলাম এর তীব্র প্রতিবাদ জানায় এবং দেশের বিভিন্ন এলাকায় মিছিল-সমাবেশ করে। এ সময় ১২টি ইসলামী রাজনৈতিক সংগঠন হেফাজতের সাথে ঐকমত্য পোষণ করে সভা-সমাবেশ করে। হেফাজতে ইসলাম ওই সকল ব্লগারদের নাস্তিক আখ্যায়িত করে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড দাবি করে। ব্লগারদের কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে ইসলামী ঐক্যফ্রন্ট, ইসলামী ঐক্যজোট, ত্বরীকত ফেডারেশনসহ অপরাপর ইসলামী রাজনৈতিক ও ধর্মীয় সংগঠন এবং সেই সঙ্গে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা’আতও প্রতিবাদ জানিয়ে আসছে। তবে সুন্নী মতাদর্শভিত্তিক এ সকল ধর্মীয় সংগঠন ও ত্বরীকত ফেডারেশন একই সঙ্গে হেফাজতে ইসলামের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের বিরোধীতাও করে। এমনকি তারা জামায়াতে ইসলামের সাথে হেফাজতে ইসলামের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ আনে। আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা’আত এর অনেক নেতা হেফাজতে ইসলামের আমীর আল্লামা শাহ আহমদ শফী মুক্তিযুদ্ধে বিতর্কিত ভূমিকা রাখেন বলেও অভিযোগ করে।
গত ৬ এপ্রিল হেফাজতে ইসলাম ঢাকায় বিশাল সমাবেশ করে ১৩ দফা দাবি উত্থাপন করে। এর পাল্টা শো-ডাউন হিসেবে আহলে সুন্নাত গত ২০ এপ্রিল চট্টগ্রামের লালদীঘি ময়দানে বিশাল সমাবেশ করে। ওই সুন্নী মহাসমাবেশে তারা ১২ দফা দাবি উত্থাপন করে। হেফাজতে ইসলামের ১৩ দফা এবং আহলে সুন্নাতের ১২ দফা দাবির বেশ কয়েকটির ক্ষেত্রে ঐকমত্য লক্ষ্য করা যায়। এর মধ্যে রয়েছে সংবিধানে সর্বশক্তিমান আল্লাহ’র প্রতি বিশ্বাস ও আস্থা স্থাপনের বিষয়টি পুনঃ সংযোজন; আল্লাহ-রসুলের অবমাননাকারী ব্লগারদের সর্বোচ্চ শাস্তির ব্যাপারে সংসদে বিল পাস; নারী শিক্ষা ও পাঠ্যপুস্তকে ইসলাম বিরোধী যে কোন ধারা ও অনুচ্ছেদ বাতিল করা। আহলে সুন্নাতের ১২ দফায় ওহাবী, নাস্তিক, মওদুদীবাদ ও কাদিয়ানিদের নিষিদ্ধ করার দাবি জানানো হয়। তারা ওহাবী মাদ্রাসাসমূহ সরকারি মাদ্রাসার আওতামুক্ত করতে এবং হরতাল কর্মসূচি আইন করে বাতিল করার দাবি জানায়। অপরদিকে হেফাজতে ইসলাম ভাস্কর্যের নামে মূর্তি নির্মাণ বন্ধ, কাদিয়ানিদের নিষিদ্ধ করা, পার্বত্য চট্টগ্রামে খ্রিস্টান মিশনারী ও ওই ধরনের এনজিওদের কার্যক্রম বন্ধ করার দাবি জানানো হয়। উভয় সংগঠনের পাল্টাপাল্টি দাবি পেশ এবং শো-ডাউনের মধ্যদিয়ে চট্টগ্রামে এক উত্তেজনাকর পরিস্থিতি বিরাজ করছে। এমনকি আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা’আত হেফাজতে ইসলামের আমীর আল্লামা শাহ আহমদ শফিসহ হেফাজতের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে গ্রেফতারের দাবি জানায়।
এদিকে হেফাজতে ইসলামের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মাওলানা আজিজুল হক ইসলামাবাদী বলেন, গত ২৬ এপ্রিল চট্টগ্রাম জমিয়তুল ফালাহ জাতীয় মসজিদে খতীব মাওলানা জালাল উদ্দীন আল-কাদেরীর সাথে যে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেছে, তা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক। কিছু দুষ্কৃতকারী হেফাজতে ইসলামের শান্তিপূর্ণ ১৩ দফার আন্দোলনকে কলুষিত করার জন্য খতীব সাহেবের উপর হামলার চেষ্টা করেছিল। এ সময় হেফাজতে ইসলামের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা মুঈনুদ্দীন রুহী, কেন্দ্রীয় নেতা মাওলানা সালাহ উদ্দীন নানুপুরী, মাওলানা আলহাজ্ব মুজাম্মেল হক, মাওলানা আবু তাহের আরবী এবং তিনি নিজেসহ দুষ্কৃতকারীদের প্রতিহত করে খতীব সাহেবকে নিরাপত্তা দিয়ে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের অফিসে পৌঁছে দেন। তিনি আরো বলেন, একটি চিহ্নিত মহল গত কিছু দিন ধরে হেফাজতে ইসলামের বিরুদ্ধে উস্কানিমূলক বিভিন্ন অপতত্পরতা চালাচ্ছে। তারা সংঘর্ষে উস্কানি দিয়ে আমাদের শান্তিপূর্ণ অবস্থান থেকে বিচ্যুত করে আন্দোলন নস্যাত্ করতে চাইছে। আমরা তাদের উস্কানিকে আমলে না নিয়ে সর্বোচ্চ সংযম প্রদর্শন করে যাচ্ছি। মাওলানা আজিজুল হক ইসলামাবাদী এ ব্যাপারে প্রশাসনসহ সর্বস্তরের জনতার সহযোগিতা কামনা করেন।
