অদ্ভুত আঁধার নেমেছে এক...

আপডেট : ২৮ এপ্রিল ২০১৩, ১৯:৩৮
সাভার এখন এক ট্রাজেডির নাম। ২৪ তারিখে সাভারের রানা প্লাজা ধসের ঘটনায় শত শত মানুষের প্রাণহানিতে সারা দেশ শোকাহত। এই ধরনের ঘটনায় প্রাণ হারায় খেটে খাওয়া গরীব-দুঃখী মানুষ। আর অপরাধীরা সবসময় পার পেয়ে যায়। সরকারের পক্ষ থেকে দেয়া হয় আশ্বাস, যার বাস্তব প্রতিফলন ঘটেনি এতো হাজার প্রাণের বলির পরও। মৃত্যুর মিছিল, দুস্থ খেটে খাওয়া মানুষের আহাজারিতে সাভারের বাতাস ভারি হয়ে উঠেছে। সেখানে লাশ শনাক্ত করতে এবং উদ্ধার কাজ করতে সাধারণ মানুষের ঢল নেমেছে। এই অবস্থায় সেখানে প্রতিনিয়তই অবতরণ হচ্ছে হূদয়র্স্পশী শোকগাথা। এরকম কিছু শোকগাথা নিয়ে সাভার থেকে ফিরে এই প্রতিবেদন লিখেছেন— আমীর মোহাম্মদ ও মেহেদী হাসান আমার বোনের লাশটা আইনা দাও... ‘আমার বোনের লাশটা আইনা দাও। সে মইরা গেলেও তার লাশ আমি চাই। আর কিচ্ছু চাই না।’—এভাবেই বুক চাপড়ে আহাজারি করছেন নিলুফা বেগম। বোনের ছবিযুক্ত পাসকার্ড বুকে ধরে বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন নিলুফা। কাঁদতে কাঁদতে তিনি বলেন, ‘আমার বোনের নাম হেলেমা। দেড় বছরের তার একটা বাচ্চাও আছে। তারে বারবার না করছিলাম, আইজ কাজে যাইস না। আমার কথা শুনলো না। এখন তারে আমি কই পাই?’ রানা প্লাজার চতুর্থ তলায় প্যান্টম গার্মেন্টসে কাজ করতেন হেলেমা। নিলুফার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সোমবার বিকালে ভবনে ফাটল ধরার পর তার বোনকে কাজে যেতে নিষেধ করেছিলেন নিলুফা। কিন্তু তার নিষেধ শুনেননি বোন হেলেমা। বড় বোনকে উল্টো বলেছিলেন, ‘কাজে না গেলে বেতন দিবো না। বসেরা মা-বাপ তুইলা গালাগালি করে।’ বলতে বলতে কেঁদে দিলেন নিলুফা। তিনি আরো বলেন, প্রতিদিন সে কাজে যায় সকাল ৮টার পরে। আইজ কাজে গেছে পৌনে ৭টার দিকে। আহারে, বোনরে..। আজরাইল তারে বুঝি টাইনা নিয়ে গেছে।’ নিলুফা আরও বলেন, ‘চার থেকে পাঁচদিন ধইরা উল্টাপাল্টা স্বপ্ন দেখতাছিলাম। মনে হইতাছিলো কিছু একটা ঘটবো। আইজ বুঝি আমার বোন আমার কাছ থেইকা হারাইয়া গেলোরে।’ নিলুফার বড় ভাইয়ের দুই সন্তান সোহাগ ও আলমগীরও কাজ করেন একই গার্মেন্টসে। ভবন ধসের পর থেকে তারাও নিখোঁজ। বোন আর ভাতিজার সন্ধানে এখন পাগলপ্রায় নিলুফা। এদিক- সেদিক ছুটে বেড়াচ্ছেন আর কেবল বলছেন, ‘আমার বোনের লাশটা আইনা দাও।’ --- ‘মা আমি তিন মাসের টাকা একত্রে নিয়ে বাড়ি আসবো’ ‘মা আমি তিন মাসের টাকা একত্রে নিয়ে বাড়ি আসবো’। চার মাস বাসায় ফেরা না হওয়া মায়ের কাছে কথাটি বলেছিলেন গার্মেন্টসকর্মী আকলিমা (১৮)। গতকাল শনিবার সাভারের অধর চন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয়ের দীর্ঘ লাইনের পাশে দাঁড়িয়ে কাঁদতে কাঁদতে এসব কথা বলেন সাভারের রানা প্লাজা ধসের ঘটনায় নিখোঁজ হওয়া গার্মেন্টস শ্রমিক আকলিমার বড়ভাই ফরিদ উদ্দিন। তিনি জানান, অভাবের সংসারে নানা ধরনে কষ্ট। এই কষ্ট লাঘবের জন্য আকলিমা গ্রাম থেকে কাজ করতে গত চার মাস আগে সাভারের এই গার্মেন্টসে আশে। প্রথম মাসের বেতন বাড়িতে মায়ের কাছে পাঠালেও তিন মাস বেতন না পাওয়ায় বাড়িতে কোনো টাকা পাঠায়নি। একারণে গত বুধবার সকালে আকলিমা তাকে মিস কল দেয়। তিনি কল ব্যাক করলেই সে বলে ভাইয়া ফোনটা মাকে দেন। তখন সে মাকে বলে, মা আমি তিন মাসের টাকা একত্রে নিয়ে আগামী মাসে বাড়িতে আসবো।’ এরপর ফোন রেখে দেয়। আধাঘণ্টা পরই ওর জীবনে কাল নেমে আসে। ফরিদ উদ্দিন কাঁদতে কাঁদতে বলেন, ‘বোনরে ট্যাকার দরকার নাই, ভাইয়ের বুকে আয়। মা তোর জন্য ভাত খাচ্ছে না।’ তিনি লাশের দীর্ঘ লাইন খুঁজেও পাননি তার প্রিয় বোন আকলিমাকে। হাতে বোনের ছবি নিয়ে বলেন, ‘বোনটারে কারখানায় কাজে দিতে চাইনি; কিন্তু পরিবারের অভাব অনটন দেখে সে নিজেই কাজ নিয়েছে। বাড়িতে একবার টাকাও পাঠিয়েছিল। কথাগুলো বলেই অনেকটা মূর্ছা যান ফরিদ। প্রিয় বোন আকলিমার কোনো সন্ধান না পেয়ে ফরিদের মা এখন শোকে মুহ্যমান। তিনি হাসপাতাল, অধর চন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয় ও সাভারের আশপাশের প্রায় সব ক্লিনিক খুঁজে বোনকে না পেয়ে স্কুল মাঠে লাশের অপেক্ষায়। ---- কিভাবে আমার কন্যার লাশ কাঁধে নিবো এই বয়সে আমি, কিভাবে আমার কন্যার লাশ কাঁধে নিবো। জীবনে আমি অনেক আত্মীয়-স্বজন,পাড়া-প্রতিবেশীর লাশ কাঁধে নিয়েছি। কিন্তু আমার কন্যার মনিরার লাশ আমি কাঁধে নিতে পারবো না। বৃদ্ধ পিতা জীবিত থাকতে কন্যার এ ধরনের মৃত্যু কোন পিতা সহ্য করতে পারে না। এভাবেই কান্নাজড়িত কণ্ঠে কথাগুলো বলে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া উপজেলার উত্তরপাড়া গ্রামের গগন হাওলাদার (৭০)। পরিবারের অবস্থা পরিবর্তন করতে শহরে আসে মনিরা। লাশ হয়ে আজ বাবার কাঁধে ফিরে যাবে। গত ২৪ এপ্রিল সাভারের রানা প্লাজা ট্রাজেডিতে গগন হাওলদারের মেয়ে মুনিরা (১৭) নিহত হয়। আট ভাই-বোনের মধ্যে মুনিরা ছিল সবার ছোট। সংসারের অভাবের কারণে গত দুই বছর আগে মুনিরা তার বড় বোন ফিরোজা বেগমের সঙ্গে রানা প্লাজার ৪ তলায় প্যান্টম এ্যাপারেল্স্ লি. গার্মেন্টসে চাকরি নেয়। ফিরোজা বেগম বর্তমানে ছুটিতে রয়েছে। মুনিরার ভাই এনায়েত হাওলাদার বলেন, রানা প্লাজা ধসে পড়ার পর মুনিরা গুরুতর আহত হয়। খবর পেয়ে আমি এনাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ছুটে যাই। বুধবার রাতে মুনিরা মারা যায়। এরপর মুনিরার লাশ অধরচন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে নিয়ে যাওয়া হয় । বৃহস্পতিবার মুনিরার লাশ গ্রামে নিয়ে যাওয়া হয়। ---- আমি ছাড়া ঐ জায়গা কেউ চিনে না... সেনাবাহিনীর একজন সিপাহী পাঁচজনকে উদ্ধার করে ভিতরে থাকা অবস্থায় প্রায় অচেতন হয়ে পড়েন। বের হয়ে আসছেন। এমন সময় তার হাত চেপে ধরে একজন মানুষ—‘ভাই আমাকে বাঁচান’। সিপাহীটি নিজেই পারছিলেন না শ্বাস নিতে। ‘আপু আমাকে মাফ করেন, আমার দম বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, একটু সময় দেন, আমি আবার আসতেসি’। সিপাহীটিকে সুস্থ করার সব পদক্ষেপ নিতে থাকেন ডাক্তার ও ইন্টার্নরা। অচেতন থেকেই প্রলাপ বকতে থাকে সে—‘আমি কথা দিয়ে আসছি ওই আপুকে, আমাকে ছাড়েন আপনারা’। তার অবস্থা বেগতিক থাকায় তাকে ডাক্তাররা অনেক বুঝিয়ে থামিয়ে রাখেন। একজন লোককে উদ্ধার করে আনতে না আনতেই সে স্ট্রেচারে লাফ দিয়ে পড়ে। বলে ওঠে, ‘আমি ছাড়া আরো দুইজন ওইখানে আটকা পড়ে আছে, জায়গাটা আমি ছাড়া কেউ চিনবো না, আমারে একবার যাইতে দেন আপা, তারা বাঁইচা আছে, আমি চিকন মানুষ, আমি পারুম ঢুকতে...