বিশ্বের বিভিন্ন দেশ আর বিভিন্ন ভাষার মানুষের মধ্যে যত ধরনের পানীয় পানের চল রয়েছে তার মধ্যে নিঃসন্দেহে সবচেয়ে জনপ্রিয় পানীয়গুলোর একটি হলো চা। বর্তমানে বিশ্বের প্রায় সবদেশের মানুষেরাই কম-বেশি চা পান করে থাকেন বা চায়ের স্বাদের সাথে পরিচিত। তবে এই চায়ের উত্পত্তি ঠিক কবে কোথা থেকে হয়েছিল তা নিয়ে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না। যদিও বিভিন্ন ঘটনার সূত্র ধরে অনেকেই চায়ের উত্পত্তিস্থল হিসেবে চীনের কথা বলে থাকেন। মজার বিষয় হলো, চায়ের উত্পত্তি নিয়ে চীনে বেশ কিছু মজার উপাখ্যানও প্রচলিত আছে। এর মধ্যে একটি হলো বৌদ্ধ ধর্ম উপাসক বোধিস্বত্ত্বের একদিন ধ্যানে বসে এতই ঘুম পাচ্ছিল যে, ধ্যানে একাগ্রতা আসছিল না। তখন তিনি হঠাত্ দাঁড়িয়ে দু’চোখের পাতা কেটে মাটিতে ফেলে দেন। মাটিতে পড়া চোখের পাতা থেকে গাছ জন্মে আর এই গাছই হলো চা গাছ। আরেকটি প্রচলিত গল্প হলো চীনের এক রাজার গরম পানি খাওয়ার অভ্যাস ছিল। একদিন শিকারে যেয়ে সহকারীর কাছে গরম পানি চেয়ে খাওয়ার সময় তিনি তাতে ভিন্ন স্বাদ পান। পরে তিনি দেখতে পান যে গরম পানির পেয়ালায় একটি পাতা পড়ে আছে এবং এই পাতাটিই ছিল চা গাছের পাতা। অন্যদিকে এসব গল্প-উপাখ্যানের বাইরে চৈনিক ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায় চীনা দার্শনিক জগদ্বিখ্যাত কনফুশিয়াসের সময় খ্রিস্টপূর্ব ৫৫০ শতাব্দীতে চা ব্যপক ভাবে ব্যবহার শুরু হয়। ৭৯৩ খ্রিস্টাব্দে চীনে চায়ের ওপর কর আরোপ করা হয়। নবম শতাব্দীতে চীন থেকে চা জাপানে পৌঁছলেও জাপানিজরা ১২০৬ খ্রিস্টাব্দে এর চাষ শুরু করেন। যদিও চীনারা দাবি করেন যে, খ্রিস্টপূর্ব ৫০০০ বছর আগে সম্রাট সিন নাং এর সময়ই চায়ের প্রচলন হয়। ১৬০০ শতাব্দীতে চা ডাচদের মাধ্যমে ইউরোপ যায়। যদিও এ সম্পর্কে কিছু মতভেদও রয়েছে। তবে এটি প্রায় নিশ্চিত করেই বলা যায় যে ১৭০০ শতাব্দীতে চা ইংল্যান্ডে পৌঁছায়। লন্ডনে ১৬৫৯ খ্রিস্টাব্দে সর্বপ্রথম চায়ের দোকান হয়। ১৬৬৪ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি তখনকার ব্রিটিশ সম্রাট দ্বিতীয় চার্লসকে ২ পাউন্ড ২ আউন্স চা উপহার দেন। তাদের হাত ধরেই উপমহাদেশে জনপ্রিয়তা ও পরিচিত গড়ে ওঠে চায়ের। অন্যদিকে ১৬৭৭ সালে কোম্পানি বাণিজ্যিক ভিত্তিতে চীন থেকে চা রফতানি করতে থাকে। তখন চায়ের জন্য বিশ্বের অধিকাংশ দেশকেই চীনের উপর নির্ভর করতে হতো। যদিও কালক্রমে তা ছড়িয়ে পড়ে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া সহ বিশ্বের অনেক দেশেই। বর্তমানে পানীয় হিসেবে গোটা বিশ্বে জনপ্রিয় হলেও চা এর ইতিহাস নিয়ে যারা কাজ করেন তাদের অনেকের মতে প্রথম প্রথম একটি ওষুধ হিসেবেই চীনারা চায়ের কদর করত যা পরবর্তীতে নিয়মিত পানীয় হিসেবেও সমীহ লাভ করে।
