ভারতের পশ্চিমবঙ্গসহ পূর্ব ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন রাজ্যে বে-আইনীভাবে আমানত সংগ্রহকারী চিট ফান্ড (আর্থিক প্রতারণা) গ্রুপ নামে পরিচিত সারদা রিয়েলটি ইন্ডিয়া লিমিটেডের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ অব্যাহত রয়েছে। অল্প সময়ে অস্বাভাবিক হারে লাভ দেয়ার কথা বলে লাখ লাখ লোকের কাছ থেকে কোটি কোটি রুপি নেয়ার পর সারদা গ্রুপের চেয়ারম্যানসহ শীর্ষ কর্মকর্তারা সম্প্রতি গা ঢাকা দেয়। এর আগে কোম্পানির বহু চেক ব্যাংক থেকে প্রত্যাখ্যাত হয়। গ্রুপের পত্রিকা বেঙ্গল পোস্টসহ ১০টি গণমাধ্যম বন্ধ করে দেয়া হলে বেকার হয়ে পড়ে হাজারের মতো সংবাদকর্মী। এরপর থেকেই সারদা চিট ফান্ডের প্রতারণায় চরম হতাশ হয়ে পড়ে আমানতকারী ও এজেন্টরা। তবে তাদের বাইরে চরম বিপাকে পড়েছে পশ্চিমবঙ্গের মমতার তৃণমূল কংগ্রেস সরকারও। যদিও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলছেন, এ কোম্পানির অবৈধ ও অনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্পর্কে তাদের ধারণা ছিলো না।
সারদা গ্রুপের চেয়ারম্যান সুদীপ্ত সেন ৬ এপ্রিল ভারতের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থাকে (সিবিআই) ১৮ পাতার একটি চিঠি লেখেন। এই চিঠি লেখার চারদিন পর কলকাতা থেকে পালিয়ে যান তিনি। এই চিঠিতে সুদীপ্ত সেন তৃণমূলের দুই সংসদ সদস্য সাংবাদিক কুনাল ঘোষ এবং সংবাদ প্রতিদিন-এর সম্পাদক সঞ্জয় বসুর নাম উল্লেখ করে বলেছেন, তারা সারদা গ্রুপের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের অর্থ নিয়েছেন। তারা ১০টি সংবাদপত্র এবং টিভি চ্যানেল কিনতেও বাধ্য করেছে। কুনাল প্রতি মাসে ১৫ লাখ রুপি করে বেতন নিয়েছেন। শুধু তাই না কীভাবে সারদা গ্রুপের সঙ্গে তৃণমূলের সম্পর্ক গড়ে উঠেছিলো তার বিস্তারিত বর্ণনা চিঠিতে দেয়া হয়েছে। আছে কংগ্রেস রাজনীতিকদের সঙ্গে সম্পর্কের কথাও। এ তথ্য ফাঁসের পর গত সপ্তাহে সারদায় বিনিয়োগকারী ও এর এজেন্টরা মুখ্যমন্ত্রীর বাসভবনের সামনে বিক্ষোভ করে। এছাড়া পশ্চিবঙ্গের বিভিন্ন এলাকায় সারদা গ্রুপের প্রতিষ্ঠানে ভাঙচুর করে।
সারদা গ্রুপের কাছ থেকে আর্থিক সুবিধা নিয়েছেন এরকম ২২ জনের নাম রয়েছে চিঠিতে। এর মধ্যে কমপক্ষে পাঁচজন রাজনীতিক রয়েছেন। সুদীপ্ত সেন তার চিঠিতে লেখেন, শুধু তৃণমূলের নেতাদের মোটা অঙ্কের টাকা দেননি বরং আসামে কংগ্রেসের একজন জ্যেষ্ঠ মন্ত্রীর স্ত্রীকেও অর্থ দিয়েছেন। তৃণমূল সরকারের একটি ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ী লবি সারদাকে সিঙ্গুরের কাছে একটি অলাভজনক মোটর সাইকেল নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ নিতে বাধ্য করেছে। এ ঘটনা সারদা গ্রুপের আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ বাড়িয়েছে। সারদা গ্রুপের বিরুদ্ধে এজেন্ট ও আমানতকারীদের আন্দোলন অব্যাহত রয়েছে। কংগ্রেস সমর্থকেরা সারদার বিরুদ্ধে বিধাননগর আদালতের সামনে বিক্ষোভ করেছে। কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতির সমন্বয়ে গঠিত একটি ডিভিশন বেঞ্চে সারদা গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে দায়ের করা দুইটি জনস্বার্থ মামলার শুনানি হয়েছে।
ভারতে কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে এমন চিট ফান্ডের মধ্যে সারদা গ্রুপ অন্যতম। এদের আমানতকারীর সংখ্যাও অনেক। পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ বারাসাতে লোকসংখ্যা ৪০ হাজার। এ এলাকায় একটি বাড়ি খুঁজে পাওয়া কঠিন হবে যার সদস্যরা সারদায় বিনিয়োগ করেনি। এ এলাকায় সারদা গ্রুপের দুই হাজার ৫৭৯ জন এজেন্ট রয়েছেন। সারদার কারণে মফস্বল এলাকায় হঠাত্ করেই অনেকের ভাগ্য ফিরেছিলো। রাস্তার পাশের মেকানিক তাগস হালদারের মাসে ৩ হাজার টাকা আয় করতে কষ্ট হতো; কিন্তু সারদার এজেন্ট হিসেবে মাসে ৫০ হাজার রুপি আয় করবে এটা সে চিন্তাও করেনি। সারদা বড় কিছু করার স্বপ্ন দেখানোয় ভারত অধিকারী তার মুদি দোকানে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছিলো। তারা একটি ভারতীয় গণমাধ্যমকে বলেন, এত দ্রুত স্বপ্ন ভাঙবে এটা কখনো ভাবেননি। মহাদেব মণ্ডল নামে একজন বলেন, এখন তো আমরা বাড়িতেও ফিরতে পারছি না। এখন গেলে আমনতকারীরা আমাদের পিটিয়ে মারবে। বিএসসি রেজাল্ট প্রকাশের আগেই চিট ফান্ডের এজেন্ট হয়েছিলেন তিনি। সারদার এই প্রতারণার ঢেউ পশ্চিমবঙ্গ ছাপিয়ে আসামেও পৌঁছে গেছে। সারদা রিয়েলটি ইন্ডিয়া লিমিটেড ও এর সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে সেখানেও ব্যাপক বিক্ষোভ হচ্ছে।
সারদা গ্রুপের সঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেস দলের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক কয়েকদিন আগেও ছিলো। তার সংবাদ ব্যবসার প্রধান ছিলেন তৃণমূল কংগ্রেসের সংসদ সদস্য কুনাল ঘোষ। যদিও মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তার দলের সাথে সারদা গ্রুপের যোগাযোগের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, কোন প্রতিষ্ঠান কী ব্যবসা করছে এটা আগে বোঝা যায়নি। এজন্য তিনি নিজেও সারদা গ্রুপের বেশ কিছু অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলেন।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অভিযোগ, এ ধরনের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো বাম সরকারের আমলেই ব্যবসা শুরু করেছিল। বাম ঘেষা অনেক গণমাধ্যম ‘চিট ফান্ড’ নামে পরিচিত বিভিন্ন সংস্থার বিজ্ঞাপন নিয়ে থাকে। সারদা গ্রুপের অর্থ আত্মসাতের বিষয়ে তদন্ত করার জন্য একটি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন কমিশন গঠন করা হয়েছে। একইসাথে তদন্ত করছে ভারতের শেয়ার বাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা সেবি এবং গুরুতর আর্থিক অপরাধ তদন্ত সংস্থা।
ইতিমধ্যে পশ্চিমবঙ্গ সরকার সারদা গ্রুপের ৩৫টি ব্যাংক হিসাব জব্দ করেছে। এছাড়া কোম্পানির ৩৬টি গাড়ি, অফিস, শত শত জমির কাগজপত্রও জব্দ করা হয়েছে। এছাড়া সোমবার থেকে ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীদের নিবন্ধনের জন্য পশ্চিমবঙ্গ সরকারের মাধ্যমে একটি জুডিশিয়াল কমিশন কাজ করবে।
সারদার কারণে বিপন্ন দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত আমানতকারীদের জন্য পাঁচশ কোটি টাকার ত্রাণ তহবিল গঠন করছেন মমতা। যদিও মমতার এ সিদ্ধান্তের সমালোচনাও হচ্ছে। দৈনিক আনন্দবাজারের এক সম্পাদকীয়তে বলা হয়েছে, মুখ্যমন্ত্রী জনরোষ থেকে নিজেকে এবং দলকে বাঁচাবার চেষ্টা করছেন, নাকি এর পিছনে কোনো সুপ্ত অপরাধবোধ থেকে এ কাজ করছেন— এমন প্রশ্ন উঠা অস্বাভাবিক নয়। রাজ্যের আমানতকারী এবং এজেন্টরা সমস্বরে বলছেন, সরকার এবং শাসক দলের নায়ক-নায়িকাদের দেখে তারা সারদার উপর আস্থা এনেছিলেন। তাদের এই ঘোষণার তাত্?পর্য মুখ্যমন্ত্রীর না বুঝার কারণ নেই; কিন্তু যে কারণেই এই বিশেষ ত্রাণের আয়োজন করা হোক না কেন এটি অনৈতিক এবং বিপজ্জনক। এছাড়া সরকারি কোষাগার থেকে অর্থাত্ জনসাধারণের অর্থ থেকে এই তহবিল হলে তা করদাতাদের প্রতি ঘোর অন্যায় করা হবে।
