ভবিষ্যতের জন্য কিছু তরুণ মেধার সন্ধান দিয়ে গতকাল রবিবার শেষ হয়ে গেল অষ্টম বাংলাদেশ গেমস। নিভে গেল ১১ বছর পর আয়োজিত বাংলাদেশের অলিম্পিক খ্যাত আসরটির। ২০ এপ্রিল শুরু হওয়া এই আসরে চ্যাম্পিয়ন হলো বাংলাদেশ আনসার। রানার্স আপ বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। তৃতীয় স্থান পায় বিজেএমসি। আনসার এর আগে ২০০২ সালে সপ্তম বাংলাদেশ গেমসে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল।
আনসার ১১১টি স্বর্ণসহ সর্বমোট ২৩৯টি পদক পেয়ে টানা চারবার চ্যাম্পিয়ন হলো।
১৯৯২ সালের গেমসে ৫০টি, ৯৬ সালে ৭০, ২০০২ সালে ৬৫টি পদক জয় করে তারা। এবারের গেমসে ৩১টি ইভেন্টের মধ্যে ২৩টিতে লড়াই করে আনসার। এর মধ্যে কেবল শ্যুটিং, কাবাডি এবং ব্যাডমিন্টনে স্বর্ণ পায়নি তারা। গেমসে নতুন অন্তর্ভুক্ত হওয়া উশুতে ২২টি এবং ফেন্সিংয়ে ১২টি স্বর্ণ পেয়েছে আনসার। গলফেও পদক পেয়েছে আনসার।
দলটির স্বর্ণ পাওয়া ইভেন্টগুলো হলো তায়কোয়ানডো (৭), শরীর গঠন ৬), টিটি (৬), জিমন্যাষ্টিকস (৬), জুডো (৫), হ্যান্ডবল (১), সাঁতার (১), অ্যাথলেটিকস (১), ফেন্সিং (১২), দাবা (২), সাইক্লিং (১২), উশু (২০), ভারোত্তোলন (৮), কুস্তি (৫), কারাতে (৪), ভলিবল (১), বক্সিং (৬), আরচ্যারি (৬), নৌকাবাইচ (১), গলফ (১)।
গতকাল দুপুর থেকেই মিলন মেলা ভেঙ্গে যাওয়ার আলামত মিলছিল। দুপুরেই চলে যাওয়ার জন্য ব্যাগ গোছান রাজধানীর বাইরের ক্রীড়াবিদরা। ঢাকা ছেড়ে যাওয়ার জন্য গেমসের সমাপনী অনুষ্ঠানে যোগ দেননি অনেকেই। গেমসের শেষ দিন মানে এমনিতেই ভাঙ্গা হাট। অষ্টম বাংলাদেশ গেমসেও তাই হয়েছে। সমাপনী অনুষ্ঠানে গেমসের কিছু উল্লেখযোগ্য দৃশ্য বড় পর্দায় দেখানো হয়। মার্চপাষ্ট, গেমস পতাকা নেমে যাওয়া, মশাল নেভানো ছাড়া তেমন কোনো আনুষ্ঠানিকতা ছিল না।
সাভার ট্র্যাজেডির কারণে আতশবাজি পোড়ানো হয়নি কাল। একই কারণে বিউগলে বেজে ওঠা সুর ছিল আরো করুণ। প্রধান অতিথি অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত স্টেডিয়ামে উপস্থিত হওয়ার পর নিহতদের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা দিয়ে অনুষ্ঠান শুরু হয় সন্ধ্যা সাতটায়। পর্দায় ভেসে উঠে আমরা শোকাহত। নীরবতার সময়টা উপস্থিতদের ব্যাপক নাড়া দেয়।
গেল নয় দিন গেমস নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন ক্রীড়াবিদরা। গেমসে পুরনো অভিজ্ঞদের সাথে লড়াই হয়েছে নতুনদের। উঠে এসেছেন নতুন মুখ। পিছিয়ে গেছেন পুরনোরা। ২২ কোটি টাকার গেমস হলেও ক্রীড়াবিদরা কিছু পাননি বলেই চলে। প্রাপ্তির মধ্যে নতুন ক্রীড়াবিদদের সন্ধান লাভ। দীর্ঘদিন পর আয়োজিত হলেও গেমসটি জানান দিল এদেশে প্রতিভার অভাব নেই। তৃণমূল পর্যায়ে রয়েছে হাজার হাজার প্রতিভা। প্রয়োজন শুধু তুলে এনে পরিচর্যা করার।
বাছাইয়ে হেরে অতলে চলে গেছেন এক সময়ে শ্যুটিংয়ের সোনালী মুখ আসিফ হোসেন। পিছিয়ে গেছেন আব্দুল্লা হেল বাকি। উঠে এসেছেন মাত্র এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছেন শ্যুটার রাব্বি হাসান । ১০ মিটার এয়ার রাইফেলে স্বর্ণ জিতে জানিয়ে দিয়েছেন তিনি আসছেন, দরকার শুধু পরিচর্যার। মেয়েদের মধ্যে সৈয়দা সাদিয়া সুলতানা একেবারে নতুন মুখ না হলেও তিনি এবার আসনচ্যুত করেছেন শারমিন আক্তার রত্নাকে।
ব্যাডমিন্টনে নবম শ্রেণির ছাত্র আয়মান ইবনে জামান এককে স্বর্ণ জয় করেছেন। হটিয়ে দিয়েছেন কোর্ট দাপানো শাটলারদের। আয়মানের খেলায় আনন্দ পেয়েছেন উডেন ফ্লোরে আসা শত শত দর্শক। তিনি সাবেক জাতীয় চ্যাম্পিয়ন মোস্তফা মোহাম্মদ জাবেদকে হারিয়ে দিয়েছেন। টেনিসে ঈষিতা আফরোজ। মাত্রই এসএসসি পরীক্ষা দেয়া মেয়েটি এককের স্বর্ণ জিতে জানিয়েছেন তার দিকে নজর দিতে হবে।
অ্যাথলেটিকসে ২০০ মিটার স্প্রিন্টে এসেছেন জাকিয়া সুলতানা সুবর্ণা। বিউটির মতো সেরা সিপ্রন্টারকে হটিয়ে দিয়েছেন এইচএসসি পরীক্ষার্থী জাকিয়া। তিনি চান উন্নত প্রশিক্ষণ নিয়ে আরো বড় আসরে নাম লেখাতে। পুরুষদের ২০০ মিটারের আরেক অ্যাথলেট আবু রায়হান। তিনিও এবার নতুন মুখের ভিড়ে উঁচু স্থানে দাঁড়িয়ে। ১০০ মিটার স্প্রিন্টে নতুন মুখ পেয়েছে বাংলাদেশ গেমস। তারুণ্যের প্রতীক মেজবাহ আহমেদ হটিয়ে দিয়েছেন লন্ডন অলিম্পিকে অংশ নেয়া সিপ্রন্টার মোহন খানকে। দৃঢ় প্রত্যয়ে জানিয়েছেন হারিয়ে যেতে আসেননি। সাইক্লিংয়ে সোনা জয় করেছেন রিকশা চালকের ছেলে আজিজুর রহমান। আর্চারিতে নজর কেড়েছে তরুণী নন্দিনী স্বপ্না। টেবিল টেনিসে নতুন এক জুটি সবার নজর কেড়েছে বাবা জাহাঙ্গীর এবং রোকাইয়া আলম তুবরিনা।
এএসএ গেমস বক্সিংয়ে স্বর্ণ জয়ী জুয়েল আহমেদ ও আব্দুর রহিম, ১০০ মিটার স্প্রিন্টে বিউটির ব্যর্থতার মধ্যেও টিকে গেছেন ভারোত্তোলনে হামিদুল ইসলাম; মেয়েদের সাইক্লিংয়ের রানী আকাশী সুলতানা। এছাড়া গেমস থেকে এবার বিদায় নিয়েছেন সাঁতারু কারার সামেদুল, কাবাডির মালেকা পারভিন, তারকা শ্যুটার সাবরিনা সুলতানা। গেমসে এবার মারামারি হয়েছে। কাবাডি কোর্টে, খো খো মাঠে কয়েকটি খেলায় মারামারি হয়। তারপরও অনেক না পাওয়ার মধ্যেও ক্রীড়াবিদদের ক’টা দিন ভালোই কেটেছে। বাড়ি ফেরার আগে তাই তারা জানতে চেয়েছিলেন আবার কবে হবে নবম বাংলাদেশ গেমস।
