সাভারের রানা প্লাজার ধ্বংসস্তূপের মধ্যে বেঁচে থাকা মানুষকে উদ্ধারে প্রাণান্ত চেষ্টা করছেন উদ্ধারকর্মীরা। বিশেষ করে গতকাল রবিবার সকালে ভারী যন্ত্র ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেয়ার সময় অনেক উদ্ধারকর্মী কেঁদে ফেলেন। সাধারণ উদ্ধারকর্মী আনিস ছল ছল চোখে বললেন, ‘স্যার, ৩ জন বেঁচে আছে। আমি তাদের সঙ্গে কথা বলেছি। তাদের অবস্থা আশঙ্কাজনক।’ এ কথা শোনার পর ভারী যন্ত্রের ব্যবহারের সিদ্ধান্ত বাতিল করে সবাই মিলে ওই তিন জনের উদ্ধারে নেমে পড়লেন।
এই তিন জনকে উদ্ধারের প্রক্রিয়াটি ছিল জটিলতম। জীবিত এ তিনজন ছিল উদ্ধারকর্মীদের অবস্থান থেকে ৭২ ফুট নিচে। তাদের মাথার ওপরে দেড় থেকে দুই ফুট ফাঁকা জায়গা। পাশে তিনটি শক্ত বিমের টুকরা। তাই নড়াচড়ার সুযোগ খুব একটা নেই। উদ্ধারকর্মীরা এই তিন শ্রমিককে জীবিত উদ্ধারে আপ্রাণ চেষ্টা শুরু করে। গত কয়েকদিনে তৈরি করা সুড়ঙ্গ দিয়ে নেমে পড়লেন একজন ফায়ারকর্মী, সাধারণ উদ্ধারকর্মী আনিস ও ফয়সাল। তারা টানা তিন ঘণ্টা কাজ করার পর নামলেন আরো দুইজন ফায়ারকর্মী। এবার পাঁচজনে মিলে চেষ্টা চালান। ধ্বংসস্তূপটি ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় উদ্ধারকাজ চালাতে হচ্ছে খুব সাবধানে। টানা ৬ ঘণ্টা পর জীবিত তিনজনের কাছে পৌঁছালেন। প্রথমে অক্সিজেন ও পরে সামান্য পানি ও জুস দিলেন আটকেপড়াদের। এরপর আপন স্বজনের মতো স্বযত্নে তাদের একজনকে ওঠিয়ে নিয়ে আসলেন। এরপর অপর জনকে ওঠান।
উদ্ধারকর্মী আনিস ইত্তেফাককে বলেন, টানা ১০০ ঘণ্টা আহত অবস্থায় আটকে থাকায় শ্রমিকদের শরীরে সামান্য শক্তিটুকুও নেই। বাঁচার শেষ আকুতির ধ্বনি খুবই অস্পষ্টভাবে শোনা যাচ্ছে। এ ধরনের যে কোনো শব্দ শুনতে পেলেই বুকে ভর দিয়ে সেখানে ছুটে যাচ্ছেন কেউ না কেউ। এভাবেই গতকাল রাত পর্যন্ত জীবিতদের উদ্ধারে চেষ্টা চলে।
এদিকে গত শনিবার রাতে ভবনের তৃতীয় তলায় একজন জীবিত আছেন বলে নিশ্চিত হন উদ্ধারকর্মীরা। তার সঙ্গে আরো চার থেকে পাঁচজন জীবিত মানুষ আটকে থাকতে পারেন বলে উদ্ধারকর্মীরা ধারণা করেন। তবে কারও কোনো সাড়া-শব্দ না পাওয়ায় সেখানে ঠিক কতজন জীবিত রয়েছেন—এ বিষয়ে উদ্ধারকর্মীরা নিশ্চিত হতে পারেননি। শনিবার রাত থেকে গতকাল বিকাল পাঁচটা পর্যন্ত জীবিত ওই ব্যক্তিকে উদ্ধারের চেষ্টা চলে। অবশেষে সন্ধ্যায় সেখান থেকে সাহানা নামক একজন গার্মেন্টস কর্মীকে জীবিত উদ্ধার করা হয়। ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আলী আহমেদ খান জানান, খোঁজ পাওয়ার পরই ধ্বংসস্তূপে আটকে থাকা জীবিত ওই ব্যক্তিকে খাবার ও পানি সরবরাহ করা হয়। এরপর চলে তার উদ্ধার প্রক্রিয়া।
গতকাল সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ১০ জনকে জীবিত ও ২৩ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাদের সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালসহ বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। সব মিলিয়ে মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩৭৭। জীবিত উদ্ধার হয়েছে ২৫১৭ জন। এদিকে গত পাঁচ দিন পর নিখোঁজের তালিকা আরো দীর্ঘ হয়েছে। গতকাল দুপুর পর্যন্ত ১২৫০ জন নিখোঁজ রয়েছেন। সেনাবাহিনীর নবম পদাতিক ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল হাসান সরওয়ার্দী বলেন, ধসে পড়া ভবনের নিচে চারজন ব্যক্তির উপস্থিতি জানতে পেরেছি। তাদের উদ্ধার করার জন্য মেশিনের সহায়তায় একটি টিম পাঠানোর প্রস্তুতি চলছে। ওই অপারেশন সফল হলেই ধ্বংসস্তূপ সরাতে ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা হবে।
বেলা ১১ টা ৫৮ মিনিটে ধসে পড়া ভবনের তৃতীয় তলা থেকে হাবীব নামে এক ব্যক্তিকে উদ্ধার করা হয়েছে। পরনে তার লাল গেঞ্জি ও মুখে দাড়ি ছিল। তার জীবিত উদ্ধারের পরপরই বরিশাল জেলার সাদেক নামে এক ব্যক্তির লাশ উদ্ধার করা হয়। উদ্ধারকর্মী মোস্তফা কামাল বলেন, ১০৩ ঘণ্টা পরও ধসে পড়া ভবনের পূর্ব পাশে পাঁচ ও ছয় তলার বাথরুমের কাছাকাছি অন্ততপক্ষে ১২-১৫ জনের আর্তনাদ শোনা গেছে।
উদ্ধারকর্মী চাঁদ বলেন, চাপা পড়া মানুষের আকুতি সহ্য করতে পারিনি। তারা পা ধরে বাঁচার আকুতি জানায়। এক পর্যায়ে জীবন বাঁচানোর জন্য বাধ্য হয়ে কারও পা, কারও হাত কেটে বের করেছি। তিনি বলেন, ঘটনার দিন ৫ম তলায় একজন মহিলার কোমরের ওপরে বীম পড়ে ছিল। তিনি আর্তচিত্কার করে বলছিলেন, বাবারে আমার চারটা সন্তান বেঁচে আছে। ওদের মানুষ করতে হবে। আমারে কেটে হলেও বের করো। চাঁদ বলেন, তখন মেশিন না থাকায় বের করতে পারিনি। খাবার দিয়ে এসেছি। পরে মেশিন নিয়ে গিয়ে দেখি, তিনি মারা গেছেন।
উদ্ধারকর্মী শাকিল বলেন, শনাক্ত হওয়া বেশিরভাগ মানুষের কাছে অক্সিজেনের পাশাপাশি স্যালাইনের পাইপ সরবরাহ করা হয়েছে। ওই পাইপ চুষে চুষে অনেক মানুষ মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করছেন। ধসে পড়া ভবনের তৃতীয় ও চতুর্থ তলায় তাদের অবস্থান। কয়েক ঘণ্টার মধ্যে তাদের বের করা সম্ভব না হলে বাঁচার আশা ছেড়ে দিতে হবে।
রাতে এক উদ্ধার কর্মকর্তা মাইকে ঘোষণা দিয়ে জানান, ভবনে আরও ১২ জনের উপস্থিতির তথ্য পাওয়া গেছে। এদের মধ্যে একজন জীবিত ও ১১ জন মারা গেছে। তাদের উদ্ধার করার পরপরই জীবিত উদ্ধার অভিযান সমাপ্ত করা হবে।
এদিকে ভবনের ভেতর থেকে জীবিত ও মৃত ব্যক্তিদের উদ্ধার করতে গিয়ে অন্ততপক্ষে ১০ জন অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। এদের মধ্যে উদ্ধারকর্মী শামীম হোসেন, দীপু, সোহেল পারভেজ রয়েছেন। তাদের হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে
ধ্বংসস্তূপে এখনো বহু লাশ
গতকাল সরেজমিনে রানা প্লাজার বিভিন্ন ফ্লোরে দেখা গেছে বহু লাশ। দুপুর আড়াইটার দিকে উদ্ধারকারীদের সাথে গিয়ে দেখা যায় ভবনটির সিঁড়িতে, ভেঙ্গে পড়া বীম ও টেবিলের নীচে ও শেলাই মেশিনের নিচে অন্তত অনেক লাশ চাপা পড়ে রয়েছে। এদের অধিকাংশ গলে গেছে এবং এগুলো উদ্ধারউপযোগী নয় বলে সেখানে কর্মরত সেনাসদস্য ও স্বেচ্ছাসেবীরা জানিয়েছেন। তারপরও বিভিন্নভাবে লাশগুলো উদ্ধার করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন তারা। পচন ধরা লাশ থেকে চারদিকে উত্কট গন্ধ ছড়িয়ে পড়ায় উদ্ধারকর্মীদের অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। কিন্তু এতেও দমে যাননি তারা। পালা করে তারা কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।
উদ্ধারকর্মী মোয়াজ্জেম হোসেন জানান, তিনিসহ তিনজন ভবনের পেছনের দিকে ৬ তলা থেকে সুড়ঙ্গ পথ দিয়ে অতিসাবধানতায় নিচের দিকে নামেন। সেখানে অসহনীয় দুর্গন্ধ। ভনভন করছে মাছি। কংক্রিটে ছোপ ছোপ রক্ত। শ্রমিকের ছেঁড়া কাপড় ঝুলছে। মাথার চুল, হাতের কবজি, পায়ের পাতা, হাতের আঙ্গুল বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। এসব বীভত্স দৃশ্য দেখতে দেখতে যেতে ২য় তলার একটি সুড়ঙ্গে গিয়ে লম্বা চুল দেখে চোখ আটকে যায়। চুল দেখেই বোঝা যায়, বীমের নিচে চ্যাপ্টা হয়ে পড়ে থাকা লাশটি একজন নারীর। তার শরীর দেখা যাচ্ছে না। শুধু মাথার ওপরি ভাগ বীমের বাইরে। সেখানে তিনটি বীমের নিচে চাপা পড়া ১৩ লাশের ১০টিই নারীর।
মোয়াজ্জেম আরো জানান, গত শনিবার দুপুরে ওই ১৩ লাশের সন্ধান পাওয়া যায়। কিন্তু লাশ পচে যাওয়ায় টান দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে মাংস খসে চলে আসে। ফলে উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
উদ্ধারকর্মী চঞ্চল বলেন, ভবন ধসের পর থেকেই আমি উদ্ধার কাজে নিয়োজিত। স্বেচ্ছায় কাজ করছি। গতকাল ছাদের সুড়ঙ্গ দিয়ে ৭ম তলা পর্যন্ত পৌঁছে দেখেছি সেখানে লাশ আর লাশ। অন্ততপক্ষে ১০ জনের মৃত দেহ দেখেছি। বেশিরভাগ লাশে পচন ধরেছে। চঞ্চল আরও বলেন, ‘আমার বাড়ি শরীয়তপুরে। সিঙ্গাপুরে যাওয়ার জন্য সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে ট্রেনিং নিচ্ছিলাম। ধসে পড়ার সময় কাছেই ছিলাম। বিবেকের তাড়নায় উদ্ধার কাজে যোগ দিয়েছি। এখন পর্যন্ত ৭-৮ জন জীবিত ও মৃত ব্যক্তিকে উদ্ধার করেছি।’
